গল্প লেখার নিয়ম — প্রবন্ধ

গল্প লেখার নিয়ম — প্রবন্ধ

গল্প লেখার নিয়ম — প্রবন্ধ। গল্প আমাদের জীবনে বিনোদনের অনন্য নাম। আজ আমরা গল্প লেখার নিয়ম নিয়ে আলোচনা করব। যাতে করে আপনিও সহজ, সুন্দর ও আকর্ষণীয় উপায়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো গল্প পাঠককে উপহার দিতে পারেন।

সেই প্রাচীনকাল থেকেই গল্পের উৎপত্তি ঘটে। তখন গুহায় বসে মানুষ একে-অপরকে গল্প বলতো। আনন্দ পেতো ও শিক্ষা নিতো। এমনি করে গল্পের প্রচলন শুরু হয় এবং বিশেষ বিশেষ শব্দশৈলী ও বাক্যের প্রয়াসে গল্প আরও প্রাণোচ্ছলতা লাভ করে।

আজ আমরা জানবো কীভাবে গল্প লিখতে হয়। চলুন, শুরু করা যাক।

গল্প লেখার নিয়ম — প্রবন্ধ

আমাদের জীবনে গল্পের প্রয়োজন আছে। আনন্দ উপভোগ ছাড়াও গল্প আমাদের জীবনে শিক্ষণীয় মাত্রাও যোগ করে। প্রতিনিয়ত গল্প তৈরি হয়, তৈরি হয় নতুন পাঠক সমাজ।

গল্পের চাদরে পাঠক হৃদয় হয়ে ওঠে উদ্বেলিত। পৃথিবী বহুদূর এগিয়ে গেলেও গল্পের চাহিদা কমেনি। এমনি করে গল্পের এই চাহিদা রয়ে যাবে চিরকাল। গল্প লেখার নিয়ম অনুযায়ী আজ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করব।

মনে মনে গল্পের কাঠামো সাজান

গল্প লিখতে হলে সবার আগে গল্পের কাঠামো সাজাতে হবে। গল্পের কাঠামো সঠিকভাবে সাজালে গল্প সুন্দর ও মার্জিত হয়। পাঠক গল্প পড়তে আগ্রহী হয়। তাই গল্প লেখার আগে —

  1. গল্পের ক্যাটাগরি বা ধরন বিশ্লেষণ করুন
  2. গল্পের কাহিনি নির্বাচন করুন
  3. খাতায় খসড়া লিখুন
  4. অপ্রয়োজনীয় অংশ কাটুন

গল্পের এই চার অংশ দিয়ে আপনি সহজেই বিশ্লেষণ অনুযায়ী গল্প লিখতে পারবেন। মনে রাখবেন গল্প পড়ার সময় পাঠকের অনুভূতি বুঝতে হবে। পাঠক যাতে গল্প পড়তে বসে প্রথমেই আগ্রহ বোধ করে — এমন একটি বিশেষ লাইন দিয়ে লেখা শুরু করুন।

» আরও পড়ুন: প্রেমের মতো — ভালোবাসার গল্প

গল্পের ক্যাটাগরি বা ধরন বিশ্লেষণ করুন

একটি গল্প বিভিন্ন ক্যাটাগরির হতে পারে। যেমন, প্রেমের গল্প, থ্রিলার গল্প, শিক্ষণীয় গল্প, ছোট গল্প, ভূতের গল্প ইত্যাদি। আপনাকে এর মধ্য থেকে যেকোনো একটি ধরন বেছে নিতে হবে।

কেন যেকোনো একটি ধরন বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ?

দেখুন, গল্পের ভিত হচ্ছে গল্পের ধরন। গল্প লেখার নিয়ম অনুযায়ী একটা গল্পের ধরন আপনি যদি শুরুতেই প্রকাশ করতে না পারেন তবে পাঠক গল্পটি কী নিয়ে তা বুঝতে না পেরে বিরক্ত ও বিভ্রান্ত হবে।

গল্পের ধরনকে যত স্পেসিফিক করা হবে গল্প তত স্পষ্ট ও সুন্দর হবে। প্রেমের গল্পে তাই থ্রিলার গল্পের ছাপ থাকবে না। অনুরূপভাবে থ্রিলার গল্পেও প্রেমের গল্পের ছাপ থাকবে না।

গল্পে প্রেম দিয়ে শুরু করে মাঝপথে যদি থ্রিলার বা সাসপেন্স অনুযায়ী ক্লাইম্যাক্স আনেন তবে পাঠক সেই গল্প থেকে আগ্রহ হারাবে। সেইসাথে গল্পও প্রাণ পাবে না।

তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। প্রসঙ্গত আপনি যদি প্রেমের গল্পে ক্লাইম্যাক্স আনেন তাহলে পাঠক আপনার লেখার সচেতনতা বুঝতে পারবে। কিন্তু অপ্রাসঙ্গিকভাবে গল্পের ধরন বদলানো অনুচিত।

গল্পের কাহিনি নির্বাচন করুন

গল্প লেখার শুরুতে একটি বিশেষ লাইন রাখুন, যা দেখে পাঠক গল্পের কাহিনি অনুমান করতে পারবে। গল্পে কাহিনি নির্বাচন করতে কিছু বিশেষ প্রক্রিয়া প্রয়োজন। যেমন —

  • গল্পে প্রাঞ্জলতা বজায় রাখুন, যাতে পাঠক সহজেই বুঝতে পারে
  • গল্পে পাঠকের জন্য গল্পের চরিত্র, পটভূমি, আবেগ ও যুক্তি তৈরি করুন

গল্প লেখায় সবসময় পাঠকের চিন্তা বুঝবার চেষ্টা করুন। পাঠক কেন আপনার লেখা পড়বে সেটা বুঝলে আপনি সহজেই লিখতে পারবেন। আর মানুষ তাদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা রিলেট করতে পছন্দ করে। তাই গল্পে বাস্তবতা বজায় রাখুন।

গল্পে কল্পনা থাকা জরুরি। তবে সেই কল্পনা অতিরঞ্জিত করবেন না। কারণ অতিরঞ্জিত লেখা মানুষকে বিভ্রান্ত করে। মানুষ সাবলীল লেখায় বেশিরভাগ সময় পছন্দ করে। গল্প লেখার নিয়ম অনুসরণ করতে গিয়ে তাই লেখাকে সাবলীল রাখা জরুরি।

» আরও পড়ুন: তোমায় পাইনি ছুঁতে — মুক্তগদ্য

খাতায় খসড়া লিখুন

প্রথম চেষ্টাতেই গল্প লেখা প্রায় সময় সম্ভব না। গল্প লিখতে আপনাকে মনের স্বাধীনতা ব্যবহার করতেই হবে। গল্প লেখার নিয়ম হলো — মনে মনে এমন অনেক ভাবনা আসবে, যা লেখনীর ভাষায় তুলে ধরলে গল্পের দেখা মিলে যায়। আপনার কাজ হবে মনের ভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়া।

মনের ভাবনা খাতায় লেখার পর সচেতনভাবে লেখার মাঝে লেখার ধরন, চরিত্র ও কাহিনি তৈরি করুন। এটা হচ্ছে মনের স্বাধীনতাকে স্বকীয়তায় রূপ দেওয়া।

খাতায় এভাবে খসড়া লিখে গল্পের সারাংশ তৈরি করুন। তারপর আস্তে আস্তে সেই সারাংশ বিশ্লেষণ করুন সংলাপ, চরিত্রের গঠন ও আবেগ দিয়ে।

অপ্রয়োজনীয় অংশ কাটুন

লেখার শুরুতে আপনার মনের সবরকম স্বাধীনতা ব্যবহার করবেন। যাতে করে গল্পে আবেগ ফুটে ওঠে। তবে গল্প লেখার নিয়ম অনুযায়ী লেখার শেষে অপ্রয়োজনীয় অনেক অংশ দেখতে পাবেন যা গল্পের সাথে রিলেটেড না। ওগুলো কেটে দিন এবং তার পরিবর্তে প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণকে শক্তিশালী করুন।

গল্প লিখতে গিয়ে বারবার কাটাকাটি করাটাও একটা প্যাশন। যে যত বেশি লেখা কাটাকুটি করবে, তার লেখা ততই সুন্দর হবে।

তাই আপনাকে গল্পের মধ্যে ডুব দিতে হলে বেশি বেশি গল্প কাস্টমাইজ করতে হবে।

» আরও পড়ুন: গাজরের হালুয়া — ছোট গল্প

অন্যদের লেখা পড়ুন

গল্প লেখার নিয়ম হলো গল্প পড়া। একটা ভালো গল্প লিখতে হলে পড়ার বিকল্প নেই। তাই বেশি বেশি পড়া জরুরি। একজন লেখক কোন দৃষ্টিকোণ থেকে লিখছেন এবং তার লেখা পাঠকেরা কেন গ্রহণ করছেন — এটা বিশ্লেষণ করতে পারলেই আপনিও লেখক হতে পারবেন।

গল্পে মানুষ প্রায়শই নিজেকে খোঁজে। একজন লেখক তাই সচেতনভাবেই তার লেখায় মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, আচরণ ও আবেগ তুলে ধরেন।

গল্প লেখায় বিশেষ পারদর্শীতার জন্য সব ধরনের গল্প আপনাকে পড়তে হবে। যদি যেকোনো একজন লেখকের লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখেন তবে আপনার লেখায় সেই লেখকের ছাপ পাওয়া যাবে। যা আপনার নিজস্বতার প্রকাশ ঘটাবে না।

তবে নিয়মিত সবার লেখা পড়ে তারপর নিজে লিখলে সেই লেখায় একটা নিজস্ব ছাপ স্পষ্ট হবে। কারণ একজনের লেখা পড়ে তার মতো করে লিখলে সেটা হবে অনুকরণ। কিন্তু সবার লেখা পড়লে নিজের মতো করে লেখার চেষ্টা তৈরি হবে, আর তা হলো বিশ্লেষণ।

অল্প কথায় অধিক অর্থ তুলে ধরুন

গল্পের প্রয়োজনে বহু ধরনের অর্থ তুলে ধরার প্রয়োজন হয়। তবে সেইসব অর্থই পাঠকের মনে দাগ কাটে, যা অল্প কথায় বলা হয় এবং একইসাথে সহজ ও অর্থপূর্ণ।

যেমন, আপনি অধিক কথায় লিখলেন —

“অনেকদিন ধরে এই শহরে আছি। আমাকে তবু এখানকার কেউ পাত্তা দেয় না। আমি মন খারাপ করি। তাতে কারও কিছু যায় আসে না। কারণ আমি বেকার যুবক।”

একই কথা যদি আপনি সংক্ষেপে প্রাঞ্জলতার সাথে লিখেন —

“বহুদিন ধরে এই শহরে থেকে একটা জিনিস বুঝেছি, আমার মতো বেকার যুবকদের সমাজে মূল্য নেই।”

এখানে দ্বিতীয় লাইনটাতে পাঠক যা বোঝার অল্প সময়ে অল্প শব্দে বুঝতে পারবে, যেখানে প্রথম লাইনে তাদের অধিক পড়ার প্রয়োজন ছিল। তাই দ্বিতীয় লাইনের কৌশলেই আমাদের গল্প লেখার চেষ্টা করা উচিত।

গল্পে লেখনশৈলী তৈরি করুন

দেখুন, গল্প কমবেশি সবাই বলতে পারে। কিন্তু লেখক সে-ই যে কিনা গল্প গুছিয়ে লিখতে পারে। গল্প লেখার নিয়ম অনুযায়ী যার লেখায় সাহিত্য অনুরাগীদের মনে দাগ কাটে, সে-ই লেখক।

তাই গল্প সবাই লিখলেও লেখকরা লেখনশৈলী দিয়েই পাঠককে মূগ্ধ করতে ব্যস্ত থাকে। লেখনশৈলী দ্বারা একজন লেখকের —

  • ব্র‍্যান্ডিং ইমেজ তৈরি হয়
  • পাঠকদের মনে লেখার ছাপ থেকে যায়

গল্প লেখকেরা তাই লেখনশৈলী নিয়ে অনেক বেশি সচেতন।

» আরও পড়ুন: পারাপার — বই রিভিউ

উপসংহার

একটা ভালো গল্প অল্প কথায় অধিক অর্থ প্রকাশ করে। যে অর্থের মাঝে গল্পের চরিত্র, সংবেদনশীল আবেগ, সচেতন অনুভূতি ও পরিবেশ তৈরি হয়।

গল্প লিখতে যারা সিদ্ধহস্ত তারা সবসময় গল্প লেখার নিয়ম অনুযায়ী নিজস্ব লেখার ধরন ব্যবহার করেন। যাতে করে পাঠকেরা আরও সুন্দরভাবে লেখককে বুঝতে পারে। তার তৈরি লেখনশৈলীর আবেগের সাথে যুক্ত হতে পারে।

তাই গল্প লিখতে হলে সুনির্দিষ্ট নিয়মগুলো মেনে চলা উচিত।


প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও প্রবন্ধ পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top