শূন্যতায় খুঁজি তোমায় — নতুন রোমান্টিক গল্প

শূন্যতায় খুঁজি তোমায় — নতুন রোমান্টিক গল্প

শূন্যতায় খুঁজি তোমায় — রোমান্টিক গল্প। ‘শূন্যতায় খুঁজি তোমায়’ গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। এটি একটি রোমান্টিক জনরার প্রেমের গল্প।

নীল একজন টিনএজ বয়েসী ছেলে। এই প্রেমের গল্প অনুযায়ী সে হচ্ছে গল্পের প্রধান চরিত্র। নীল যাকে ভালোবাসে, সেই মেয়েটি একসময় অন্য জায়গায় আবাসস্থল বদলায়।

তাতে কি ভালোবাসা কমে যাবে? নাকি নীল অপেক্ষা করবে নতুন ভালোবাসার? এই গল্পটি সাধারণ গল্পের আদলে লেখা হলেও কিছু চমক রাখবার চেষ্টা করেছি। চমকগুলো প্রাধান্য পেলে খুশি হবো! চলুন পড়া যাক, বাপ্পী মাহমুদের লেখা— শূন্যতায় খুঁজি তোমায় — নতুন রোমান্টিক গল্প।

শূন্যতায় খুঁজি তোমায় | বাপ্পী মাহমুদ

এক.

আমি যখন প্রথম সাইকেল চালানো শিখি, তখনকার একটা স্মৃতি আমি কোনোদিনও ভুলব না।

সেসময় সাইকেল চালানো শিখছিলাম একটা মস্ত খেলার মাঠে। তখন আমার বয়স পনেরো বছর। মাঠে একই সময় আরেকটি মেয়েও সাইকেল চালানো শিখছিল। আর কী আশ্চর্য, তার সাথেই তখন আমার একটা ঝামেলা লেগে গেল।

আমাকে সাইকেল চালানো শেখাচ্ছিলেন আমার কাজিন ফারদিন ভাইয়া। তিনি বললেন, “সামনে তাকিয়ে সাইকেল চালাও। আশেপাশে তাকিও না।”

আমিও তাই করলাম।

প্যাডেল দিতে দিতে অনেকক্ষণ সামনে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ কী মনে হতেই পেছন তাকালাম। আর দেখি ফারদিন ভাইয়া সাইকেল ধরে নেয়। আমি তৎক্ষণাৎ পড়ে যাই। আর আমার পাশে ছিল মেয়েটি, তাকে নিয়েই পড়ে গেলাম।

আমাদের একসাথে পড়তে দেখে মাঠের উপস্থিত সবাই হেসে ফেলল। এই হাসি দেখেই মেয়েটি আমায় বলল, “গাধা একটা!”

এটা বলে সে আমায় আর কিছু বলবার সুযোগ দিলো না, চলে গেল। আর আমি মনে মনে বললাম, “তুমি দেখতে অনেক কিউট!”

দুই.

এরপর কেটে গেছে বেশ কয়েকটা দিন, আমি নতুন সাইকেল কিনলাম। প্রচুর সাইকেলিং করতে থাকলাম। কিন্তু ওই মাঠে গিয়ে আর মেয়েটির দেখা পেলাম না। তাই বলে কি হাল ছেড়ে দেবো?

উহু, আমি এমন নই।

যাকে আমার ভালো লাগে তাকে আমি সবসময় মনে রাখি। মেয়েটার মিষ্টি কিউট চেহারা আমার মনে ছিল। কিন্তু তাকে খুঁজবার জায়গা একটাই — খেলার মাঠ। একদিন বিকেলে ওই মাঠে বসে আছি। মনে মনে মেয়েটাকে খুঁজছি, তখনই কেউ একজন বলল, “বাহ! সাইকেলটা তো খুবই সুন্দর! একটু দিতে পারবে?”

আমি বিরক্ত চোখে তাকালাম৷ দেখি, সমবয়সী একটা ছেলে। আমি বললাম, “না।”

ছেলেটা কিঞ্চিৎ হতাশ হলো। বলল, “দেবে না যখন থাক। তবে এত কঠিন চোখে তাকিয়ে আছো কেন?”

এসময় আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, আর তখনই মেয়েটা সেখানে হাজির। ছেলেটি তার পূর্ব পরিচিত। তাকে মেয়েটি বলল, “তুমি এখানে কী করছো রবিন ভাইয়া?”

রবিন নামের ছেলেটি মুখ গোমড়া করে বলল, “কিছু না।”

বলেই চলে গেল। মেয়েটি আমার দিকে তাকায়। বলে, “ব্যাপারটা কী বলুন তো?”

আমি সেই প্রসঙ্গে না গিয়ে বলি, “তুমি কি আমায় চিনতে পারছো?”

তিন.

মেয়েটি অবাক হয়ে বলল, “তুমি!”

আমি হকচকিয়ে গেলাম। কারণ মেয়েটার চোখে বিরক্তি আর রাগ। সে বলল, “তুমি আমায় সাইকেল থেকে ফেলে দিয়েছিলে, আমার এখনো মনে আছে।”

“এভাবে বলো না,” আমি অনুনয় করলাম, “দেখো আমি খুব ভদ্র ছেলে। ইচ্ছে করে এমনটা করিনি।”

“তাই?” মেয়েটির কণ্ঠে অবিশ্বাস, “আমি মোটেও বিশ্বাস করি না।”

“বিশ্বাস করো প্লিজ! তোমার বিশ্বাসের ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে..।”

“মানে?”

আমি কী বলবো ভেবে পাই না।

মেয়েটিকে যে আমার ভালো লেগেছে — এটা কি আর বলা যায়? সে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। হঠাৎ ওর ঠোঁটের কোণে হাসি এলো। বলল, “তুমি খুব ভালো ফ্লার্ট করতে জানো।”

“ফ্লার্ট নয়,” আমি দ্রুত বলি, “আসলে.. আমার বন্ধুরা প্রায়ই বলে যে, আমার কথা বলার স্টাইলে যেকোনো মেয়েই আমার প্রেমে পড়বে।”

মেয়েটি ভুরু কুঁচকে তাকালো। আর আমার মনে হলো আমি একটু বেশিই বলে ফেলছি। অতঃপর চুপ করে গেলাম।

“নাম কী তোমার?”

আমি তার প্রশ্নে এত অবাক হলাম যে, আনন্দে উত্তর দিতে ভুলে যাই।

মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করে, “হ্যালো? স্ট্যাচু হয়ে গেলে নাকি? নাম ভুলে গেছো?”

আমি মনে মনে বলি, “প্রেমে পড়লে মানুষ নিজেকে ভুলে যায়।”

কিন্তু মুখে বললাম, “আমি নীল, নীল আহসান।”

মেয়েটি হাসিমুখে তাকায়। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “আমি তন্দ্রা।”

আমি তখনো বিশ্বাস করতে পারি না সে সত্যিই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

অতঃপর অবিশ্বাসের সাথে তার হাতটি ধরলাম। সে হেসে ফেলল। বলল, “তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে!”

আর আমি টের পেলাম জীবনের প্রথম প্রেমের গল্প এখান থেকেই শুরু হতে চলেছে।

চার.

এরপর কেটে গেছে দুই বছর।

মেয়েটির সাথে প্রায়ই খেলার মাঠে দেখা হতো। আমি ভাবতাম আজ বলবো তাকে মনের যত কথা। বাসায় যতক্ষণ থাকতাম সারাক্ষণ ওর কথায় মনে পড়তো। কল্পনায় কত কিছু ভাবতাম। অথচ দেখা হলে কথা বের হতো না মুখ দিয়ে।

একদিন ভাবলাম, আজ মনের কথা বলবই।

যা থাকে থাকুক কপালে! কিন্তু ওইদিনই তন্দ্রার মন খারাপ ছিল। সে বলল, “তোমার সাথে আর দেখা হবে না।”

“কেন?” আমি অবাক, একইসাথে আহত, “কী হয়েছে?”

তন্দ্রা আরও মন খারাপ করলো। আর যা বলল তা অনেক বেশি আঘাত করলো আমায়। ওর বাবার সরকারি চাকরি অনুযায়ী অন্য জায়গায় বদলি হয়েছে। ওদেরকে এখন সিলেট শিফট হতে হবে।

তন্দ্রা বলল, “তোমায় খুব মিস করব।”

আমি কথা বলতে গিয়ে দেখি কান্না চলে আসছে। তাই কিছু না বলে অন্যদিকে তাকালাম। তন্দ্রা আমার কষ্ট বুঝল। বলল, “এই পাগল, এত কষ্ট পেয়ে কী হবে? আচ্ছা, তোমার সাথে আমার ফেসবুকে যোগাযোগ থাকবে!”

“ফেসবুক?”

আমি অবাক হই।

কারণ তখন আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ছিল না। কিন্তু তন্দ্রাকে সেটা বললাম না। সে তার আইডির নাম জানিয়ে গেল — অ্যাঞ্জেল তন্দ্রা। আমি সেদিনই ফেসবুক খোলার জন্য উন্মুখ হলাম।

আমাদের পাড়ায় একটা মেয়ের ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট ছিল। ওর নাম ফারিয়া। আমার সাথে তেমন কথা হয় না, তবু ওকে ধরলাম। সংকোচ ভুলে বললাম ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলবার কথা।

» আরও পড়ুন: তখন শেষ বিকেল — গভীর ভালোবাসার গল্প

পাঁচ.

ফারিয়া রাজি হলো।

আমি লক্ষ্য করলাম, ফারিয়া খুব আগ্রহের সাথে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিচ্ছে। আমার অ্যাকাউন্ট নাম সে-ই সাজেস্ট করলো — প্রিন্স নীল। আমার নামটা খুব পছন্দ হলো।

ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আমি সেদিনই তন্দ্রার আইডি খুঁজি। আর পেয়েও যাই। ওর প্রোফাইল পিকচারে নিজের ছবি থাকায় চিনতে অসুবিধা হয়নি। ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠানোর প্রায় সাথে সাথেই রিকুয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করে নিলো। আর ইনবক্সে লিখলো, “কী রোমিও, আমাকে মনে আছে তাহলে?”

আমি লিখলাম, “আমার পড়াশোনা ছাড়া সবই মনে থাকে।”

সে হাসলো। তা বুঝলাম ইমোটিকন দেখে। আমিও হাসলাম — খুশির হাসি।

এদিকে একদিন একটা অদ্ভুত আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট এলো — নাম ‘অচেনা অপ্সরা’। আমি রিকুয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করলাম। লিখলাম, “কে আপনি? কেমন নাম এটা?”

সে রিপ্লাই দিলো না। শুধু মেসেজ সিন করলো। আমিও আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।

ছয়.

কেটে গেল আরও এক বছর।

আমার প্রতি তন্দ্রার মনোভাব বদলাতে শুরু করেছে, সে আর আগের মত আমায় মনে রাখেনি। আমি মেসেজ দিলে সিন করে। কিন্তু রিপ্লাই দেয় মাঝে মধ্যে।

এই দুঃখ নিয়ে ফেসবুকে মন খারাপের যত পোস্ট দিই।

কখনো দুঃখের কবিতা, কখনো মন খারাপের গল্প হয়ে তা আমার টাইমলাইনে জমা হতে থাকে। আর সেইসব পোস্টে নিয়মিত কমেন্ট করতে থাকে অচেনা অপ্সরা নামের আইডিটি।

একদিন এরকম আবেগঘন পোস্টে সে লিখল, “আমি তোমার জায়গায় হলে কাউকে এতটা গুরুত্ব দিতাম না। হাল ছেড়ে অন্য কাউকে ভালোবাসতাম।”

এটা দেখে আমার খুব রাগ হলো। রিপ্লাইয়ে লিখলাম, “তাহলে তুমি ভালোবাসাকে চিনে নিতে ব্যর্থ!”

মেয়েটি আর রিপ্লাই করল না।

সাত.

সময় বয়ে যাচ্ছিল, তন্দ্রার মনোভাব আরও কমছিল। আমি আচ্ছন্নের মতো ওর মেসেজের অপেক্ষায় থাকি। মেসেজ আসে না। আসে কেবল — দুঃখ, কষ্ট আর শূন্যতা।

একদিন কী মনে হতেই অচেনা অপ্সরাকে নিজের কষ্টগুলো লিখে জানাই। জানি, সে রিপ্লাই করবে না। তবু তন্দ্রাকে নিয়ে অনেক কিছু লিখি।

অপ্সরা একদিন আমায় রিপ্লাই করল, “এত কষ্ট নিয়ে একজনের জন্য মন খারাপ করে কী হবে? হাল ছেড়ে দাও!”

“তুমি কোনোদিন কাউকে ভালোবাসোনি। তাই এত নির্মম কথা বলছো।”

আমার কথায় সে হাসির ইমোটিকন দেয়।

আমি আর মেসেজ করি না। ওদিকে তন্দ্রার একটা ছেলের সাথে ভাব হয়েছে। একে-অপরের প্রোফাইলে প্রায়ই কমেন্ট করে। এমনি করে সময় গড়াচ্ছিল। আর আমার অনুমানকে সত্য প্রমাণ করে দুজনে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দিলো ফেসবুকে।

সেদিন এতটাই মন খারাপ হয় যে, তন্দ্রাকে ব্লক করে দিই। আর অচেনা অপ্সরা? তাকে সবকিছু বললে সে জানায়, “তুমি চাইলে যে তোমায় ভালোবাসে তাকে সুযোগ দিতে পারো।”

আমি লিখলাম, “আমায় কেউ ভালোবাসে না!”

“তাই?”

“হ্যা,” আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, “সত্যিই বলছি..!”

মেয়েটি আর রিপ্লাই করে না৷

এরপর আমি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডিএক্টিভ করে দিই।

সেদিনের পর ফারিয়ার সাথে হঠাৎ দেখা। সে বলল, “তুমি কি আমায় ব্লক করে দিয়েছো? খুঁজে পাচ্ছি না!”

আমি অবাক হয়ে বলি, “তুমি যে আমার ফ্রেন্ডলিস্টে আছো, তাই তো জানি না।”

ফারিয়া হঠাৎ ইতস্তত হয়ে পড়ে, যেন সে মিথ্যা বলে ধরা পড়েছে।

আমি কিছুই বুঝলাম না। তখন সে-ই বলল, “অচেনা অপ্সরা আমার আইডি।”

আমি এতই অবাক হলাম যে, মুখে তৎক্ষণাৎ কোনো কথা এলো না। আর ফারিয়াও চলে গেল। আমি তার চলে যাওয়া দেখতে থাকি। নীরবে।

আট.

এরপর অনেক ভেবেছি।

একসময় ফেসবুকে ফিরেও আসি। এসেই খোঁজ করি অপ্সরার। অপ্সরা ওরফে ফারিয়াকে মেসেজ দিই, “ভালোবাসো?”

সে লিখে, “অনেক!”

“এতদিন বলোনি কেন?”

“গাধা,” সে রাগের ইমোটিকন দেয়, “মেয়েরা কখনো আগে প্রপোজ করে?”

আমি তবু অবুঝ, লিখি, “তুমি কেন এতদিন নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলে?”

“লুকিয়ে রাখিনি। শুধু তুমিই খুঁজে পেতে দেরি করেছো!”

সেদিন আমরা দেখা করলাম। সেই খেলার মাঠে। কমে আসা শেষ বিকেলের আলোয় ওর মুখটা লালচে দেখাচ্ছিল। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, ওর গাল স্পর্শ করার।

*****

গল্প: শূন্যতায় খুঁজি তোমায়

লেখা: বাপ্পী মাহমুদ 

প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top