সন্দেহ— কষ্টের গল্প

সন্দেহ— কষ্টের গল্প

সন্দেহ— কষ্টের গল্প। গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। এই গল্পে বাস্তব জীবনের কষ্টের গল্প তুলে ধরা হয়েছে, যা পাঠককে নাড়া দিবে বলে লেখকের বিশ্বাস। চলুন, গল্পটা শুরু করা যাক।

সন্দেহ | বাপ্পী মাহমুদ

এক.

আমার চিন্তাভাবনা খুব স্বার্থপরের মতো। জীবনে যারাই আমাকে ভালোবেসেছে, তাদেরকেই আমি সন্দেহ করেছি। খুব যখন ছোট ছিলাম তখনকার কথা বলি। সেই সময়কার কষ্টের গল্প মনে পড়লে এখনও কষ্ট হয়। ছোটবেলায় আমার ছোটখালা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আদর করে ডাকতেন আকাশ। আমাকে দেখলেই তার আকাশের মতো বিশাল মনে হতো। তাই এই নাম।

তাকে নিয়েই আমার আজকের এই দুঃখের গল্প লেখা।

আমি রাতে একা ঘুমাতে চাইতাম। কিন্তু খালা যখন আমাদের বাসায় আসতেন আমায় কোলে করে তার ঘরে নিয়ে যেতেন। তার এই ভালোবাসাটুকু আমার কাছে অত্যাচার মনে হতো। তবু কিছু বলতাম না। মাঝরাতে শুধু চুরি চুরি করে নিজের ঘরে চলে আসতাম।

একদিন মাঝরাতে নিজের ঘরে আসতে গিয়ে একটা কান্ড হলো। আর সেখান থেকেই এই গল্পের শুরু।

» আরও পড়ুন: হেমন্তের রাত — নস্টালজিক মুক্তগদ্য

দুই.

আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। আর তখন শুনি বাবা-মা তাদের ঘরে নিচুগলায় ঝগড়া করছেন। ঝগড়াটা ছোটখালাকে নিয়ে। মা প্রায় কাঁদোকাঁদো হয়ে বললেন, “তুমি আমার বোনকে এভাবে সন্দেহ করতে পারলে?”

বাবা বললেন, “কেন করবো না? ও তোমার মায়ের পেটের বোন হলেও একজন লোভী। তোমার বাবা মরবার আগে তোমায় যত সম্পদ দিয়েছেন তারচেয়ে অনেক কম দিয়েছে তোমার ছোটবোনকে। সে তোমার জমিতে ভাগ বসাতেই প্রতিনিয়ত বাসায় আসে। তুমি বোকা, তাই বুঝো না।”
মা এবার সত্যিই কাঁদতে লাগলেন। বললেন, “দেখো, আমার খোকাকে এসব বলো না। আমার বোন ওকে খুব ভালোবাসে।”
“বলবো না। তবে তুমি তোমার বোনকে নিষেধ করে দিবে যেন এ বাড়িতে আর না আসে।”
“পারব না আমি!”

এসময় আমি নিজের ঘরে চলে আসি। আর ঠিক করি বাবার সন্তুষ্টির জন্য যে কাজ মা পারবে না, সেটা আমি পূরণ করবো। সেই ভাবনায় ছিল আমার জন্য ভুল। আর জীবনের কিছু বাস্তব গল্প এভাবেই তৈরি হয়।

তিন.

সে রাতে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে গেছি, পরদিন সকালেই কষ্টের গল্প রচিত হলো। সকালে খালা এসে ডাকলেন একসাথে ব্রেকফাস্ট করার জন্য। আমরা সবাই ডাইনিং টেবিলে বসলাম। আমি চুপচাপ খেতে খেতে ছোটখালাকে বললাম, “খালা, তুমি আমাদের বাসায় আর এসো না।”

কথাটা শুনে মা চমকে তাকালেন। বাবা সহজ রইলেন। আর খালার দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি আহত চোখে আমায় দেখছেন। মা বললেন, “এসব কী হচ্ছে নীল? বড়দের সাথে এভাবে কথা বলতে হয়?”
খালা মাকে থামিয়ে আমার নাম ধরে ডাকলেন, “আকাশ—”

আমি থামালাম। বললাম, “এই নামটির কোনো অর্থ নেই আমার কাছে।”
খালাকে দেখলাম প্রায় কাঁদো কাঁদো। কিন্তু আমার ভেতরে তখন আরও কঠিন কথা বলা বাকি, এ যেন কঠিন বাস্তব গল্প শুরু হবার সময়।

আমি এক নিঃশ্বাসে বললাম, “তুমি নানার রেখে যাওয়া মায়ের জমির জন্য আমাদের বাসায় আসো। আমি সব বুঝি।”
বাবা এবার ছুটে এলেন। আমাকে থাপ্পড় দিলেন ঠিকই কিন্তু চুপ থাকতে বললেন না। আমি থাপ্পড় খেয়ে বললাম, “তোমার জন্যই বাবা-মায়ের দূরত্ব বাড়ছে। তুমি চলে যাও। আর এসো না।”

» আরও পড়ুন: লেখক হবার পথে — সফলতার শিক্ষণীয় গল্প

চার.

খালা কান্না সামলানোর চেষ্টা করলেন, লুকানো কষ্টের গল্প ছিল তার চোখে। অনেক কষ্টে বললেন, “আমি না এলে তোর অনেক ভালো লাগবে, তাই না?”
বাবা এবার বলতে হয় বলেই খালার নাম ধরে বললেন, “মিলি, ও ছোট মানুষ। কোনো কিছু ভেবে বলেনি।”
খালা এই প্রথম কঠিন স্বরে বললেন, “জমির ব্যাপারে না শুনলে ও কীভাবে বলল দুলাভাই?”

বাবা কিছু না বলে গম্ভীর মুখে তার ঘরে চলে গেলেন। আমিও আমার ঘরে চলে এলাম। আর আমি জানতাম আমি ঠিক করেছি। সেদিন ছোটখালা অনেক কান্না জমিয়ে চলে গেলেন। বিদায়ের সময় আমার মাথায় হাত রেখেছিলেন। এই জীবনের দুঃখের গল্প তার যেন বিশ্বাস হচ্ছিলো না। অথচ আমি ভেবেছিলাম— এগুলো সব অভিনয়।

পাঁচ.

সময় কেটে গেছে— কলেজে উঠে দারুণ ব্যস্ত আমি। মা প্রায়ই বলেন, “তোর ছোটখালা খুব অসুস্থ। ব্রেইন টিউমারের ব্যথায় ঘুমায়নি অনেক রাত।”
মায়ের কথা শুনে আমার ভেতরটা ছোটখালার জন্য কাতর হতো, কিন্তু বাইরে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করতো। যেন খালার সাথে আমার এমন এক সম্পর্ক, যেখানে আমি তাকে কোনোদিনই বোঝার প্রশ্ন রাখি না। এটা যেন নিতান্তই কষ্টের গল্প ছিল, আর কিছুই নয়।

তবু বাড়ি থেকে বের হবার দিনে একসময় দেখা হয়েই গেল। খালা সেই ছোটবেলার মতো আমার মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, “তুই আকাশের মতো বিশাল হতে চাইতি, তাই তোর জন্য একটা স্পেশাল বই এনেছি— The Little Prince.”

আমি বইটা হাতে নিলাম। কোনোকিছুই আর আগের মতো নেই জেনেও খালার দিকে তাকালাম। তার চোখে মায়া ছিল। আমি যেন হারিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমাকে কঠিন হতে হবে, এটা ভেবে আমি বইটা তার হাতে ফিরিয়ে দিই। বলি, “আমি এই বইটি রাখতে পারব না।”
খালা হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকেন। আমি ততক্ষণে কলেজের দিকে পা বাড়িয়েছি। পিছু তাকানোর মতো ইচ্ছেটুকুও আমার ছিল না।

কিন্তু বাসায় ফিরে আমি বইটা দেখতে পেলাম। খালা বাসায় এসেছিলেন— আমি বুঝলাম। বইটা খুলে দেখি ভেতরে লেখা— “যদি কেউ তোকে সত্যিই ভালোবাসে তবে সে তোকে নিজের মতো একা থাকতে দেবে। আর দূর থেকে আশীর্বাদ করবে।”

» আরও পড়ুন: সবুজ আলোর দেশে — বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি

ছয়.

লেখাটা পড়ে আমার খুব স্পর্শকাতর অনুভূতি জাগলো। ইচ্ছে হলো সমস্ত অবহেলার কষ্টের গল্প ভুলে ছুটে যাই খালার কাছে। আমি সত্যিই মন পরিবর্তন করলাম। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে মাকে বললাম, “মা, তৈরি হয়ে নাও। খালাকে দেখতে যাব।”
মা যেন তৈরিই ছিলেন৷ নারী জাতি এমনই। তারা সবকিছুই আগে আগে ঠিক পেয়ে যায়। মা আমায় বললেন, “আমি জানতাম তুই একদিন নিজের ভুল বুঝতে পারবি।”

আমরা বের হবার ক্ষণেই ফোনে জানতে পারি— ছোটখালা হাসপাতালে। ওটিতে নেয়া হবে তাকে। মাকে নিয়ে যখন পৌঁছেছি, তখন খালাকে স্ট্রেচারে করে নেয়া হচ্ছে। তখনও তার কিছুটা জ্ঞান ছিল। আমি ডাকলাম, “খালা!”

খালা কোন এক যাদুবলে নিজের সবটুকু ভারসাম্য নিয়ে আমার দিকে তাকালেন। অস্ফুট স্বরে বললেন, “তুই আসবি, আমি জানতাম রে আকাশ!”
আমি তখন অনেক কথা বলার জন্য কাতর ছিলাম। কিন্তু সময় আর জমাট আবেগের তীব্রতা আমায় কিছু বলতে দিলো না।

সময় শুধু শিক্ষণীয় দুঃখের গল্প রচনায় নিমগ্ন ছিল।

খালা ওটিতে প্রবেশ করলেন। মায়ের কান্না শুরু হলো তখন৷ আর আমি নিজেকে ক্ষমা করতে অপারগ ছিলাম। শুধু মনে হচ্ছিলো— সন্দেহ আমাদের ভালোবাসাকে আঘাত করে। কিন্তু নিজের ভুল বুঝতে না পারলে সমস্ত ভালোবাসায় মরে যায়।


গল্প: সন্দেহ

লেখা: বাপ্পী মাহমুদ 

প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top