সবুজ আলোর দেশে | আবুল হাসনাত বাঁধন

সবুজ আলোর দেশে — বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি

সবুজ আলোর দেশে — একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি বা সায়েন্স ফিকশন। গল্পটি লিখেছেন আবুল হাসনাত বাঁধন। গল্পের নায়ক একজন তরুণ অধ্যাপক ড. আপন, যার পৃথিবীতে কোনো পিছুটান নেই। পৃথিবীর বৃহত্তর স্বার্থে পৃথিবী ছেড়ে সে গবেষণার খাতিরে পাড়ি জমায় ভিন্ন এক গ্রহে। চলুন— ড. আপনের এই নিঃসঙ্গ যাত্রার সঙ্গী হওয়া যাক…!

সবুজ আলোর দেশে | আবুল হাসনাত বাঁধন

এক.

অবশেষে সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিলো GLS41 গ্রহে পৃথিবীর প্রতিনিধি হিসেবে যাবে তরুণ অধ্যাপক ড. আপন। সে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি। তার কেউ নেই। মা-বাবা গত হয়েছেন অনেক বছর আগেই। ভালোবাসার মানুষটাও হারিয়ে গেছে অন্য এক পৃথিবীতে। হয়তো দূরের কোনো গ্যালাক্সিতে। তাই ড. আপনের সম্পর্কের কোনো পিছুটান নেই। ওই অজানা গ্রহ থেকে সে ফিরে আসতে না পারলেও কেউই তার জন্য অপেক্ষা করবে না। তার অনেক দিনের ইচ্ছে দূরে কোথাও হারিয়ে যাওয়ার। যেখানে কোনো মানুষ থাকবে না, থাকবে না কোনো কোলাহল। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজে ঘেরা থাকবে।

তবে GLS41 গ্রহের ব্যাপারটা অনেক আলাদা। ২০২৫ সালে জার্মান মহাকাশ বিজ্ঞানী স্টিফেন ট্রাটোব মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কাছাকাছি একটা অদ্ভুদ গ্যালাক্সি দেখতে পান। তিনি ওই গ্যালাক্সির নাম দেন, “রেইনবো গ্যালাক্সি”। কারণ, ওই গ্যালাক্সির অন্যান্য নক্ষত্রগুলো আমাদের মিল্কিওয়ের মতো স্বাভাবিক হলেও, এর মধ্যে একটা অদ্ভুত স্টার ক্লাস্টার কিংবা তারা গুচ্ছ রয়েছে। এই ক্লাস্টারটি মূলত খুব কাছাকাছি জায়গায় অবস্থিত সাতটা বিশালাকৃতির নক্ষত্র দিয়ে গঠিত। এদের ফাঁকে ফাঁকে যদিও অসংখ্য ছোটো নক্ষত্র রয়েছে! কিন্তু টেলিস্কোপে খালি চোখে, ওই সাতটা নক্ষত্রকেই ভালোভাবে দেখা যায়। যেন, একটা সমান দৈর্ঘ্যের বাহুওয়ালা ষড়ভুজ আর সেটার একটা কেন্দ্রবিন্দু! সাতটা নক্ষত্রই রংধনুর সাত রংয়ের একেকটার উৎস। আমাদের সূর্য কিংবা অন্যান্য বেশিরভাগ নক্ষত্র যৌগিক বা সাদা আলো দেয়। কিন্তু রেইনবো গ্যালাক্সির ওই নক্ষত্রগুলো একেকটা আলাদা আলাদা রংয়ের আলো দেয়। অর্থাৎ- কেউ লাল, কেউ সবুজ, কেউ নীল, কেউ বেগুনী…! এর মধ্যে ষড়ভুজের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে থাকা নক্ষত্রটাই মূলত সবুজ আলো দেয়।

বিজ্ঞানী স্টিফেন এই গ্যালাক্সি এবং নক্ষত্র সাতটি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেন। বছরখানেক পর তিনি সবুজ নক্ষত্রটির ৯টি গ্রহের মধ্যে ৭ম গ্রহটিতে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পান। সেই গ্রহটিই হলো GLS41. GL মানে Green Light, S হলো বিজ্ঞানী স্টিফেনের নামের প্রথম অক্ষর আর 41 হলো গ্রহের এন্ট্রি-কোড। কারণ, এটি প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া ৪১ তম গ্রহ ছিল। অন্য গ্রহের সাথে পৃথিবীর মানুষেরা যোগাযোগ স্থাপন করতে না পারলেও, GLS41 গ্রহের সাথে পেরেছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে পৃথিবী থেকে বেশ কয়েকটা মানুষবিহীন মহাকাশযানও পাঠানো হয়েছে সেখানে।

হাই রেজুলেশন ক্যামেরা, ড্রোন ও অ্যাডভান্স রোবোটিক্সের মাধ্যমে ওই গ্রহ সম্বন্ধে মোটামুটি তথ্য জানা গেছে। ছবি এবং ভিডিয়োতে বিজ্ঞানীরা যা দেখতে পেয়েছে তা হলো- ‘গ্রহটিতে প্রচুর গাছের মতো জিনিস রয়েছে। কিন্তু সব আগাগোড়া সবুজ রংয়ের। সবুজ ছাড়া অন্য রংয়ের কিছু নেই। বেশ কয়েকটা বিশাল দিঘীর মতো তরলের উৎস আছে। কিন্তু তাও সবুজ রংয়ের। ওই গ্রহের ৩টা উপগ্রহ রয়েছে। এর মধ্যে একটা পৃথিবীর চাঁদের মতো। সেটাও হালকা সবুজ রংয়ের আলো প্রতিফলিত করে। হয়তো সবুজ জোছনা!’

» আরও পড়ুন: বই পড়ার গুরুত্ব: জ্ঞান ও চেতনার উন্মেষের পথ

দুই.

কোনো এক অজানা কারণে পৃথিবী থেকে পাঠানো মহাকাশযানগুলোর ক্যামেরাগুলো দু-তিন দিনের মধ্যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। তবে, সর্বশেষ ক্যামেরায় একটা চমকপ্রদ জিনিস ধরা পড়ে। তা হলো, ওই গ্রহের প্রাণী। দুটো প্রাণী, দেখতে প্রায় একই ধরনের। অবয়বটা মানুষের মতো। উচ্চতা তিন-চার ফুট হবে প্রায়। পায়ের চেয়ে হাত লম্বা। হাতগুলো দুই-তিন ফুট করে হবে। মাথাটা অনেকটা তরমুজের মতো। মাথার চারদিকে ৪টা চোখ। তার মানে এরা ৩৬০ ডিগ্রি কোণে দেখতে পারে। নাক জাতীয় কিছু নেই, তবে একটা মুখ আছে। ওদের পুরো শরীরও সবুজ রংয়ের। তবে এদের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে কিছু বুঝা যায়নি।

বেশ কয়েকমাস ধরে ওইগ্রহের প্রাণীগুলো রেসপন্স করতে শুরু করেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ওই গ্রহ থেকে পৃথিবীতে বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের বেতার তরঙ্গ প্রেরণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থার রাডারে সংকেতগুলা ধরা পড়লেও কেউই তরঙ্গগুলোর মানে বুঝতে পারলো না। তবে এটা আঁচ করা যাচ্ছে যে, ওই গ্রহের প্রাণীগুলো মানুষের মতোই কিংবা মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে যথেষ্ট বিকশিত। তাই ব্যাপারটা নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মহাকাশ বিজ্ঞানীরা একত্রিত হয়ে একটা কনফারেন্স করলেন। আলোচনা শেষে সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো— এবার তথ্য সংগ্রহের জন্যে মানুষ পাঠানো হবে GLS41 গ্রহে।

কনফারেন্স শেষে বাংলাদেশি বিশ্বখ্যাত মহাকাশ বিজ্ঞানী ড. এ এইচ হাবিব সকলের কাছে ড. আপনের কথা বললেন, GLS41 গ্রহে পাঠানোর জন্য। ড. আপন, ড. হাবিবের বাল্যবন্ধু। মানুষ পাঠানো হবে জেনে, কনফারেন্সের পরে ড. আপনই তার কাছে আবদার করেছিল ওই গ্রহে যাওয়ার। হাবিব সাহেব ড. আপনকে পাঠানোর উপকারিতা বর্ণনা করার পর, সকলেই রাজি হয়ে গেলেন, শুধু ভারতীয় বিজ্ঞানী ড. জাদেন্দ্র সিধু ছাড়া। তবুও ড. আপনকেই পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। কারণ- সে তরুণ, শক্ত, সামর্থ্যবান, সবলদেহী, অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়। এছাড়া সে প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক। বিজ্ঞানে কাঁচা কাউকে পাঠালে বিপদের সম্ভাবনা আছে। তাই ড. আপনই একেবারে উপযুক্ত। ওদিকে আবার পৃথিবী ছেড়ে অন্য গ্রহে যেতে তেমন কেউ রাজিও ছিল না!

» আরও পড়ুন: চায়ের শেষ চুমুক — গভীর ভালোবাসার গল্প

তিন.

এরপর, GLS41 গ্রহে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে— মহাকাশে ভ্রমণ, মহাকাশযান পরিচালনা সহ, জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় আয়ত্ব করার জন্য ড. আপনকে দীর্ঘ ৫ বছর ধরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো।

২০৩৪ সাল, ৭ই জুন

সকালবেলা। পৃথিবী পৃষ্ঠে ঝকঝকে রোদ ওঠেছে। আকাশে একদম মেঘ নেই। এমন একটা সুন্দর সময়ে ড. আপন রওনা হলো GLS41 গ্রহের উদ্দেশ্যে। মহাকাশযানটি ড. হাবিব এবং ফরাসি বিজ্ঞানী স্টিভস নিকোলাই এর সম্মিলিতভাবে ডিজাইন করা। এর গতিবেগ সেকেন্ডে প্রায় ১ লক্ষ কি.মি.। যাওয়ার আগে ড. আপন শুধু ড. হাবিবের কাছেই বিদায় নিয়েছিল। পৃথিবীতে আর কেউ নেই তার। ফিরে আসলেও ড. হাবিবের কাছেই আসবে। যাবার আগে ব্যাগের মধ্যে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাটা নিয়ে নিলো আপন। ওই গ্রহে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন আছে, তবুও দুইটা বড়ো সিলিন্ডারে অক্সিজেন গ্যাস দেওয়া হলো তার জন্যে। সাথে সপ্তাহ তিনেক এর জন্য খাবার। মহাকাশযানটা ছুটছে আলোর গতিবেগের অর্ধেকের চেয়েও বেশি গতিবেগে।

বেশ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ড. আপনকে নিয়ে মহাকাশযানটা সৌরজগত, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি পেরিয়ে রেইনবো গ্যালাক্সিতে প্রবেশ করল। এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একাকিত্ব গ্রাস করল ড. আপনকে। সে অনুভব করল, আসলে আমাদের পৃথিবীই ঢের ভালো। মানুষ আর মানুষের জীবনের কোলাহল এক অদ্ভুত প্রশান্তিময় জিনিস। অথচ সেগুলো পেছনে ফেলে সে এগিয়ে চলেছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।

‘কেমন হবে সেই সবুজ নক্ষত্রের সবুজ গ্রহ GLS41? সবুজ প্রাণীগুলো কি খুবই শক্তিশালী? তারা কি ড. আপনকে মেরে ফেলবে? সবুজ তরলগুলো কি খুব সুস্বাদু নাকি বিষাক্ত? গাছের মতো জিনিসগুলো কী?’ প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে ড. আপনের মাথায়।

মহাকাশযানের স্বচ্ছ গ্লাসের বাইরে সবুজ নক্ষত্রটা দেখা যাচ্ছে। একঘণ্টা পর সে গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। এমন সময় ড. আপন ব্যাগ থেকে পতাকাটা বের করে তাকিয়ে থাকে। কী সুন্দর লাল-সবুজ পতাকা! ড. আপনের পৃথিবীতে ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়। দেশের জন্যে অদ্ভুত ভালোবাসা অনুভব করে সে। তার কেউ না থাকুক, দেশে তো তার ক্ষীণস্রোতা কৃষ্ণখালী নদী আছে, গাছ আছে, সাথে ফুল-ফল, পাখির গান আছে! এই গ্রহ থেকে যদি কখনো পৃথিবীতে ফিরে যেতে না পারে তাহলে দেশের রূপ আর উপভোগ করা হবে না তার। এই সবুজ আলোর দেশটা যদি তার স্থায়ী ঠিকানা হয়ে যায়, তাহলে কী করবে সে?

» আরও পড়ুন: জীবন নিয়ে উক্তি ও পর্যালোচনা — প্রবন্ধ

একঘণ্টা পর মহাকাশযানটা GLS41 গ্রহে অবতরণ করল। দীর্ঘ ভ্রমণে ড. আপনের মধ্যে যে চিন্তাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল, সেগুলো সে মুহূর্তের মধ্যে ঝেড়ে ফেলে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠল। মনে মনে বলল, ‘আমি মহৎ উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি। যেভাবেই হোক আমার দায়িত্ব যথাযত ভাবে পালন করে আবার পৃথিবীতে ফিরে যাব।’ এই বলে সে GLS41 গ্রহের সবুজ মাটিতে পা রাখল…।

পরিশিষ্ট

মাসখানেক কেটে যাওয়ার পরও ড. আপনের আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। কোনো এক অজানা কারণে GLS41 গ্রহে অবতরণের পর থেকেই পৃথিবীর সাথে তার সব সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা কিছু করতে পারলো না। কী হয়েছিল ড. আপনের সাথে? তাকে কি মেরে ফেলা হয়েছিল নাকি সে নিজেই সবুজ আলোর দেশে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেল?


গল্প: সবুজ আলোর দেশে

লেখা: আবুল হাসনাত বাঁধন

রচনাকাল ও স্থান: (২৫/১১/২০১৫) |পাথরঘাটা, চট্টগ্রাম।

প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টাল ও ফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top