অন্ধকার পেরিয়ে — শিক্ষনীয় গল্প

অন্ধকার পেরিয়ে — শিক্ষনীয় গল্প

অন্ধকার পেরিয়ে — শিক্ষনীয় গল্প। ‘অন্ধকার পেরিয়ে’ গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। এটি একটি সফলতার শিক্ষনীয় গল্প, যেখানে ফাহিম নামের একটা অলস ছেলের ঘুরে দাঁড়াবার গল্প বলা হয়েছে।

ফাহিম ছিল একটা উদাসীন ছেলে, যার বাস্তব জ্ঞান নিয়ে তেমন চিন্তাভাবনা ছিল না। এই চিন্তাভাবনা স্বল্পতার কারণে সে যেন অস্তমিত সূর্যের মতই নিস্প্রভ হয়ে উঠছিলো। কিন্তু হঠাৎ তার জীবনে পরিবর্তন আসে। সেও বুঝতে পারে — অন্ধকার চিরদিনের জন্য নয়।

‘অন্ধকার পেরিয়ে’ তাই একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প। যে গল্পে বাস্তবিকই অন্ধকার পেরিয়ে আলোর পথ অনুসন্ধান করা হয়েছে।

অন্ধকার পেরিয়ে | বাপ্পী মাহমুদ

এক.

সকালবেলাটা ফাহিমের জন্য বিরক্তের।

আর সকালের এই বিরক্তি শুরু হয় নাস্তার টেবিলে। ব্রেকফাস্টের সময় ফাহিমের বাবা এমন সব প্রসঙ্গ তুলেন, যা ফাহিমকে বিরক্ত করে। আজ ব্রেকফাস্টে তার বাবা রফিক সাহেব বললেন, “তোমার জীবনের লক্ষ্য কী আমায় বলো তো?”

ফাহিম মাত্রই রুটি মুখে তুলতে যাচ্ছিলো, এমন প্রশ্নে তার খাবারে অনিহা চলে আসে।

সে পাল্টা জিজ্ঞেস করলো, “হঠাৎ? এই প্রশ্ন কেন?”

“কারণ আছে,” রফিক সাহেব বলে চলেন, “ফেসবুকে তুমি আজকাল এমন সব পোস্ট করছো, সবই লোক দেখানো কাজ। যা দেখে মনে হয় তুমি ভাইরাল হবার চেষ্টায় আছো।”

“আমি ভাইরাল হবার চেষ্টা করিনি।”

রফিক সাহেব কথাটি না শোনার ভান করলেন। বললেন, “নিজের ভেতরের সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করো। সেটাকে ইউটিলাইজ করতে শিখো। পরিশ্রম ছাড়া কেউ বড় হয় না।”

ফাহিম কিছু বলতে চাইলো, সেটা বুঝেও রফিক সাহেব নিজে বললেন, “লাইফে শর্টকাট খোঁজা বন্ধ করো।”

ফাহিম এবার লম্বা শ্বাস নিয়ে খাবার না খেয়ে উঠে গেল।

দুই.

সকালে না খেয়েই ফাহিম ইউনীভার্সিটিতে এসেছে। আজ একটা বিশেষ ক্লাস আছে। কিন্তু ক্ষুধার কারণে ক্লাসে তার মনোযোগ কমে আসছিলো। সেইসাথে বাবার বলা কথাগুলো মাথার ভেতর কুয়াশার মত আটকে ছিল।

ফাহিমের প্রিয় স্যার কামরুল হাসান ক্লাস নিতে নিতে ফাহিমকে লক্ষ্য করছিলেন।

ক্লাস শেষে তিনি ফাহিমকে ডাকলেন, সে যেন তার কক্ষে দেখা করে। ফাহিম কিছুটা ভীত হলো। কামরুল স্যার যদি লক্ষ্য করে থাকেন সে ক্লসে মনোযোগী ছিল না, তবে সেটা খুবই লজ্জার হবে।

কিন্তু কামরুল স্যার এ বিষয়ে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। তিনি হাসিমুখে ফাহিমকে বললেন, “শুনেছি তুমি খুব ভালো ছবি আঁকো?”

“চেষ্টা করি স্যার,” ফাহিম হাসলো, “ভালো পারি কিনা জানি না।”

“তাহলে চেষ্টা করে যাও। ভালো কিছু হবেই।”

ফাহিম আবারও হাসে, বিগলিত হাসি।

কিন্তু কামরুল স্যার তার বিষয়ে চিন্তিত ছিলেন৷ ছেলেটা আজকাল ক্লাসে প্রায়ই উদাস হয়ে যায়৷ তবে এখন এ বিষয়ে তাকে তিনি জিজ্ঞেস করতে চান না — ফাহিম অপ্রস্তুত হয়ে যাবে।

» আরও পড়ুন: অচেনা আতংক — শিক্ষনীয় থ্রিলার গল্প

তিন.

ফাহিমের উদাসীনতা বাড়ছিলো।

সে সত্যিই জানে না সফলতা মানে কী। কিন্তু ভান করে সে একদিন সফল হবে। সবাইকে দেখিয়ে দিবে। আজও ব্রেকফাস্টের সময় রফিক সাহেব কিছু প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, রফিকের মা সালমা হোসেন স্বামীর হাতটা ধরে ইশারায় থামান৷

তারপর ফাহিমকে সালমা হোসেন জিজ্ঞেস করলেন, “তোর প্রিয় বিরিয়ানি রান্না করবো আজ। ভার্সিটি থেকে আসার পর কিছু জিনিস কিনে আনিস।”

“হঠাৎ বিরিয়ানি কেন মা?”

ফাহিম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে। আর তখনই তার বাবা-মা দুজনেই একসাথে বলেন, “হ্যাপি বার্থডে টু ইউ!”

ফাহিম অবাক হয়। সেইসাথে এত আনন্দিত হয় যে তার চোখে পানি আসে। সে কিছু বলবার ভাষা খুঁজে পায় না।

তার বাবা-মা দুজনেই তাদের আবেগী ছেলেকে দেখছিলেন।

রফিক সাহেবের কেমন মায়া হলো ফাহিমের জন্য। একমাত্র সন্তান ফাহিম। রফিক সাহেব শুধু চান তার ছেলেটা একটু সিরিয়াস হোক, জীবনকে চিনতে শিখুক।

কিন্তু ফাহিম নিজের ইচ্ছার বিপরীতে কিছুই করতে পারে না। আজকাল সে পড়াশোনা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। খাতায় ছবি আঁকা, অকারণে গিটার নিয়ে গান করা — এসব দিন দিন বেড়েই চলেছে।

তিনি উপদেশ দিতে চাইলেও ফাহিম বিরক্ত হয়। রফিক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ছেলেটা যে কার মত হলো তিনি ভেবে পান না!

চার.

আজ সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। ফাহিম ঘরে বসে কিছু লিখছিলো। কবিতার মত এলোমেলো লাইন লিখে যেতে যেতে সে হঠাৎ খেয়াল করলো বৃষ্টি কমে আসছে। তাহলে কি সে আজ ভার্সিটি যাবে?

তার মন খারাপ হলো। আজকাল ভার্সিটি যেতেও মন টানে না। সে ব্যাগ গুছিয়ে রওনা হয়। কিছুদূর যেতেই একটা কথা তার মনে পড়লো, যেটা সেদিন ফাহিমের বাবা বলেছিলেন — “নিজের ভেতরের সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করো। সেটাকে ইউটিলাইজ করতে শিখো। পরিশ্রম ছাড়া কেউ বড় হয় না।”

ফাহিম নিজেকে প্রশ্ন করলো, “হঠাৎ এটা মনে এলো কেন?”

কিন্তু সে তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। এদিকে রিকশা ভার্সিটিতে পৌঁছে গেছে।

কামরুল স্যার আজও ক্লাসে ফাহিমকে আনমনা দেখলেন। তার মন খারাপ হলো। এই ছেলেটার প্রতি তার মনোভাব অন্যদের থেকে একেবারেই আলাদা। আর ছেলেটিও অন্যসব ছেলেদের মত না।

ফাহিম পরিশ্রম করতে চায়, কিন্তু কমফোর্ট জোন ভাঙতে চায় না। ফাহিমের চেনা জগতের বাইরেও যে একটা বিশাল জগৎ আছে, আর সেই জগতকে বিশ্বাস করলে যে বহুদূর যাওয়া সম্ভব — এটা কামরুল সাহেব তাকে বলতে চান।

কামরুল সাহেব আজও ফাহিমকে তার কক্ষে ডাকলেন।

পাঁচ.

ফাহিম চিন্তিত মুখে কামরুল সাহেবের সামনে বসে আছে।

কামরুল সাহেব বললেন, “আজ তোমায় ক্লাসে অনেক অমনোযোগী মনে হয়েছে। কোনো সমস্যা?”

ফাহিম যেন চমকে ওঠে৷ বলে, “জ্বী স্যার?”

কামরুল সাহেব আবারও বললেন, “ক্লাসে তুমি অন্যমনস্ক ছিলে ফাহিম৷ কোনো সমস্যা?”

“না স্যার,” ফাহিম অল্প হাসার চেষ্টা করলো, চেষ্টা সফল হল না, “আমি স্যার সবই শুনেছি।”

কামরুল সাহেব বললেন, “আই ডোন্ট থিংক সো!”

ফাহিম মাথা নিচু করে। যেন সে হার মানছে। কামরুল সাহেব বললেন, “ফাইন্যান্স সাবজেক্ট নিয়ে তোমাদের ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টে আমি যে ক্লাসটা নিই, তা খুবই গোছানো। একেকটা ক্লাস নিতে আমার অনেক প্র‍্যাকটিস করতে হয়। এত কষ্টের পরও যদি কোনো ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ক্লাসে ফাঁকি দেয়, তবে তা আমার জন্য কষ্টের।”

ফাহিম চুপ করে রইলো। কামরুল সাহেব আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। তবে তাকিয়ে রইলেন। ছেলেটাকে খুবই হতাশ লাগছে। তার আত্মবিশ্বাস বলে কিছু নেই — সেটা টের পাওয়া যাচ্ছে।

“আমি একটু বিচলিত স্যার,” ফাহিম বলতে শুরু করলো, “আমি জানি না কীভাবে আমার সফলতার গল্প শুরু করবো।”

» আরও পড়ুন: রিলেশনশিপ — এক অদ্ভুত ভালোবাসার গল্প

ছয়.

কামরুল সাহেব হাসলেন, অভয়ের চিরসবুজ হাসি।

ফাহিম সেই হাসিতে ভরসা পেলো। কামরুল সাহেব গল্পের ভঙ্গিতে বললেন, “একটা মানুষকে অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। সে খুবই অলস। তারপরও সে চায় না অন্ধকারে বন্দি থাকতে। কারণ সে অলস হলেও জানে দীর্ঘ একমাস অন্ধকারে থাকলে যে কেউ নিজেই অন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই লোকটা এবার অনুসন্ধানে বের হল। আলোর অনুসন্ধান!”

কামরুল সাহেব থামলেন। তাকালেন ফাহিমের দিকে। লক্ষ্য করলেন ফাহিম মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি বললেন, “লোকটা এবার আলো জ্বালানোর পরিকল্পনা করলো। তুমি কি বলতে পারবে এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য কঠিন কিনা?”

“কঠিন নয়,” ফাহিম সাথে সাথেই বলল, “সে চাইলে দ্রুত একটা মোমবাতি ধরাতে পারে।”

কামরুল সাহেব উচ্ছ্বাসের সাথে বললেন, “হ্যা! এটাই হবে তার প্রকৃত জীবনের শুরু। যে শুরু সফলতার সাথে যুক্ত হয়েছে।”

ফাহিম চুপ করে আছে। তবে সে শুনছে মন্ত্রমুগ্ধের মতো।

কামরুল সাহেব আরও বললেন, “তোমাকে শুধু যেকোনো একটা ছোট স্টেপ দিয়ে শুরু করতে হবে। মাথায় রাখতে হবে দুইটা জিনিস। এক, শুরুটা হবে আলো দিয়ে। দুই, যেকোনো একটি লক্ষ্য বেছে নিয়ে ছুটতে হবে।”

“লক্ষ্য?” ফাহিম নিজ অজান্তেই প্রশ্ন করে, “জীবনের লক্ষ্য?”

“হ্যা,” কামরুল সাহেব বললেন, “জীবনের লক্ষ্য। কখনোই একসাথে দুইটি লক্ষ্য নিয়ে ভাববে না। কারণ যে বিড়াল একসাথে দুটি ইঁদুর ধরতে চায়, সে দুইটিই হারায়।”

সাত.

রফিক সাহেব আজ ব্রেকফাস্টে ফাহিমকে দেখলেন না। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন — ছেলেটা আর কবে ডিসিপ্লিন শিখবে? রফিক সাহেব নিজের ছেলের ঘরে এলেন। আর দেখলেন আশ্চর্য দৃশ্য, ফাহিম টেবিলে বসে ম্যাথ করছে। তিনি এটা দেখে খুশিতে নীরবে যেমন এসেছিলেন, নীরবেই চলে গেলেন৷

ফাহিম কিছুক্ষণ বাদেই এলো।

বলল, “বাবা, আমি আমার জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পেয়েছি। আপাতত আমায় সুন্দর একটা গ্র‍্যাজুয়েশন মার্কস নিয়ে আন্ডার গ্র‍্যাজুয়েট হতে হবে। আমায় শুধু সময় দাও, আমি ভালো কিছু করে দেখাবোই!”

রফিক সাহেব ছেলের ভেতরের স্পিরিট দেখে প্রাণোচ্ছল অনুভব করলেন। সালমা হোসেনও তার ছেলের পাশে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

আর ফাহিম জানতো — লক্ষ্য পূরণের জন্য এটাই চমৎকার শুরু!


গল্প: অন্ধকার পেরিয়ে

লেখা: বাপ্পী মাহমুদ 

প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top