তখন শেষ বিকেল — গভীর ভালোবাসার গল্প

তখন শেষ বিকেল — গভীর ভালোবাসার গল্প

তখন শেষ বিকেল — গভীর ভালোবাসার গল্প। ‘তখন শেষ বিকেল’ গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। এটি একটি রোমান্টিক গল্প। যেখানে নীল আহসান নামের এক অগোছালো তরুণের ব্যর্থ প্রেমের গল্প লেখা হয়েছে। গল্পে ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করছি। চলুন শুরু করা যাক।

তখন শেষ বিকেল | বাপ্পী মাহমুদ

এক.

আমার গার্লফ্রেন্ড আমার ব্যাপারে অনেক কিছুই জানে না। আর আমি তাই ওর কাছে অনেক মিথ্যা বলেছি নিজের সম্পর্কে। আমাদের রিলেশন ফেসবুকে। গার্লফ্রেন্ডের নাম প্রীতি।

আমি দেখতে অতটা হ্যান্ডসাম না। তার ওপর বেশ রোগা। ছবি তোলার সময় এমনভাবে তুলি যাতে স্বাস্থ্য পুরোপুরি বোঝা না যায়। প্রীতি বেশ কয়েকবার অভিযোগ করেছে, “এত ক্রপ করে ছবি দাও কেন? পুরো ছবি দিতে পারো না?”

জবাবে আমি হাসির ইমোটিকন রিপ্লাই দিই।

আজকাল প্রীতির হয়তো আমায় নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে। সেদিন কোনো কারণ ছাড়াই জিজ্ঞেস করলো, “এই, তুমি বাইক চালাতে পারো না?”

“পারি তো,” আমি মিথ্যা বললাম, “ইয়ামাহার ল্যাটেস্ট মডেল আমার পছন্দ!”

“তাহলে বাইক নিয়ে তোমার ফেসবুকে ছবি বা ভিডিয়ো নেই কেন?”

আমি অনেকক্ষণ চুপ রইলাম। আর যখন দেখলাম রিপ্লাই খুঁজে পাচ্ছি না, তখন মেসেজ আনরিড করে সিগারেট ধরালাম। তখনই প্রীতির মেসেজ, “তুমি কি স্মোক করো?”

আমি কী উত্তর দেবো ভেবে পেলাম না। ও বলল, “স্মোক আমি পছন্দ করি না!”

দুই.

“আমি কি ভিডিও কল দিতে পারি?”

আচমকা মাঝরাতে ফোনে অডিও কলের মুহূর্তে প্রীতি আবদার করে বসে। কিন্তু আমি চাই না সে ভিডিওতে সরাসরি আমায় দেখুক। ফেসবুকে ছবি আপলোডের সময় ফিল্টার ইউজ করি বলে আমায় সুন্দর দেখায়। ভিডিওতে এই মাঝরাতে আমায় কেমন দেখাবে কে জানে!

প্রীতি আবারও বলল, “ভিডিও কলে আসবে?”

আমি বললাম, “এত রাতে?”

প্রীতির বুঝি অভিমান হলো। বলল, “আচ্ছা, তাহলে ফোন রাখছি।”

আমি দ্রুত আবার মিথ্যা কথা সাজিয়ে নিলাম। বললাম, “আসলে.. আজ খুব ঘুম পাচ্ছে। আর তাছাড়া আগামীকাল ভার্সিটিতে যেতে হবে।”

“ও। ঠিক আছে।”

প্রীতি ফোন রাখে৷ আমিও স্বস্তির শ্বাস ফেললাম বটে, কিন্তু দুর্ভাবনা রয়ে গেল — এভাবে কতদিন?

এই প্রশ্ন মাথায় নিয়ে একদিন আমি ফেসবুক স্ক্রল করছিলাম ক্লাসে বসে।

তখনই দেখি একটা ছেলে বাইকে চেপে ছবি পোস্ট করেছে ফেসবুকে। এতে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু প্রীতি সেখানে কমেন্ট করেছে, “So decent you are!”

আমি দ্রুত ক্লাস থেকে বের হলাম।

তারপর প্রীতিকে ফোন দিলাম। যদিও জানি ব্যাপারটা তুচ্ছ, তবু আমার অনেক জেলাস ফিল হচ্ছে। প্রীতি ফোন তুললো না। একসময় লাইন কেটে দিলো। আমি দম বন্ধ করে ফোনের ডিসপ্লেতে তাকিয়ে থাকি।

তিন.

এই ঘটনার পর থেকে আমাদের দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। আমি তাকে প্রায়ই ফোনে পাই না। পেলেও প্রীতি তেমন উৎসাহ দেখায় না। ফোন করে একসময় আমি আহত গলায় বলি, “তুমি কি ভুলে যাচ্ছো আমায়?”

“এখন কথা বলতে ভালো লাগছে না,” প্রীতি আমার প্রশ্নের উত্তর দেয় না, “রাখি কেমন?”

“না,” আমি যেন একটু বেশিই চিৎকার করে বসি, “আমি তোমায় খুব ভালোবাসি প্রীতি।”

“এখন এসব কথা আসছে কেন?”

“কারণ তুমি এখন অনেক বদলে গেছো, তাই।”

“আমার ঘুম পাচ্ছে। অনেক রাত হয়েছে। তুমিও ঘুমিয়ে যাও।”

প্রীতি লাইন কেটে দেয়।

হয়তো ঘুমিয়েও যায়। কিন্তু আমি জেগে থাকি সারারাত। আমার ঘুম আসে না।

» আরও পড়ুন: শূন্যতায় খুঁজি তোমায় — নতুন রোমান্টিক গল্প

চার.

আজ আমার খুব খুশি লাগছে।

অনেকদিন পর প্রীতি নিজ থেকে আমায় ফোন করেছে। রিসিভ করার সময় দেখি উত্তেজনায় আমার হাত মৃদু কাঁপছে। আমি ফোন কানে নিলাম৷ কিন্তু যা শুনলাম তার জন্য মানসিক প্রস্তুতি ছিল না আমার।

প্রীতি বলল, “আমি সরি। বাট এই রিলেশন আমার পক্ষে কন্টিন্যু করা পসিবল না।”

“কেন প্রীতি?” আমি ভেঙে পড়ি, “আমি কোনো দোষ করেছি? বলো, আমি নিজেকে শুধরে নিব।”

“ব্যাপার সেটা নয়। আর তোমায় তো আমি কখনো ফিজিক্যালি দেখিওনি।”

আমি তখনো অবুঝ, বললাম, “তুমি চাইলেই আমি তোমার বলা লোকেশনে আসতে পারবো। কিন্তু হঠাৎ এভাবে ছেড়ে যেও না। প্লীজ!”

“এত চাইল্ডিশ হয়ো না, বি প্র‍্যাকটিক্যাল। আর ভালো থেকো। শুভকামনা। গুডবাই।”

প্রীতি ফোন রেখে দেয়।

আমি অবিশ্বাসের চোখে ফোনের ডিসপ্লেতে চেয়ে থাকি। কে জানতো এমনটা ঘটবে? প্রচন্ড ব্যথায় আমি যেন মিশে যাচ্ছি দূর অজানায়।

পাঁচ.

এ ঘটনার একমাস পার হয়ে গেল।

এই একমাস আমি পাগলের মত ছিলাম। খাওয়ার সময় কাঁদতাম আর ঘুমানোর সময় করতাম স্মোক। মাঝে মধ্যে কান্না বেড়ে যেত। বাসায় কেউ যাতে কান্না শুনতে না পায় সেজন্য বারান্দায় চলে আসতাম।

একদিন বিকেলের ঘটনা, বারান্দায় এলাম। কান্না করেই চলেছি। নিজেকে বোঝাতে পারছি না কিছুই। অথচ আমার এই করুণ অবস্থায় হঠাৎ আজব ব্যাপার ঘটলো। তিনতলা বাড়ির এই বারান্দার অপজিটে আরও একটি লাগোয়া ফ্ল্যাটের মুখোমুখি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে কেউ।

একটা মেয়ে।

সে বই পড়ছিলো। আমায় কাঁদতে দেখে সে বলল, “প্লিজ, একটু আস্তে কাঁদুন৷ সামনে আমার এক্সাম।”

মেয়েটি এমনভাবে কথাটি বলল যে, আমি এক মুহূর্তের জন্য কাঁদতে ভুলে গেলাম। আর সে আবারও বলল, “আমি চিত্রা। এবার ক্লাস টেনে উঠেছি।”

আমিও সহজ স্বরে নিজের নাম বললাম, “আমি নীল, নীল আহসান।”

“আপনার নাম তো আমি জানি।”

“তাই?” আমি অবাক, “কীভাবে?”

চিত্রা জবাব দিলো না। কেমন অদ্ভুত করে হাসে। সেই হাসিতে কি প্রেম ছিল?

ছয়.

“চিত্রা!”

চিত্রাকে আজ বারান্দায় দেখছি না। তাই ডাকলাম নাম ধরে। কিন্তু সে আসছে না। অন্য কেউ ডাক শুনে ফেলবে, এই ভয়ে আমিও জোরে ডাকতে পারছি না।

“চিত্রা!”

আবারও ডাকলাম। এবার ও এলো।

আমি হাসিমুখে তাকিয়ে রইলাম।

কিন্তু চিত্রার মুখ আজ বিষণ্ণ। ওর চোখে নিষ্প্রাণ ছায়া। কী হয়েছে হঠাৎ? আমি বললাম, “তোমার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম।”

“কেন?” চিত্রা সাথে সাথেই প্রশ্ন করলো।

আমি জবাব দিতে পারলাম না। সে-ই বলল, “আমায় ভালোবাসো?”

আমি এবার একটু যেন ইতস্তত হলাম। মনে হলো, তার প্রশ্ন শুনে লজ্জা পাচ্ছি। কিন্তু সেই লজ্জায় ভালো লাগা ছিল।

সাত.

চিত্রা একটু জেদ ধরে বলে, “কী হলো? উত্তর দাও — তুমি কি আমায় ভালোবাসো?”

আমি কিছু না ভেবেই এবার বলি, “হ্যাঁ!”

“তাহলে প্রীতি কে ছিল?”

আমি চমকে উঠি।

বললাম, “প্রীতিকে তুমি চেনো?”

“এসব ভেবে লাভ নেই,” চিত্রা প্রসঙ্গ ঘোরায়, “আমি এখন তোমার বর্তমান।”

আমি তবু কিছু বুঝি না। কিন্তু সে আমার বর্তমান — এই কথাটা ভালো লাগলো।

চিত্রা বলল, “তবে এত খুশি হবার কিছু নেই। আমি হঠাৎ যেমন এসেছিলাম হঠাৎ-ই চলে যাব!”

আমি আবেগী হয়ে উঠি এই কথায়। বুঝতে পারি প্রীতির পর সত্যিই কাউকে ভালোবেসেছি — আর সে হলো চিত্রা। বললাম, “তোমায় আমি ধরে রাখব, কোথাও যেতে দেবো না।”

চিত্রা জবাব দেয় না।

ওর ঠোঁটের কোণে হাসি। কেউ বলে দেয়নি, কিন্তু আমি জানি এটা ব্যথা মিশ্রিত হাসি। সে বলে, “আমিও তোমায় ভালোবাসতে চায়। কিন্তু আমার ফিরবার পথ নেই!”

আট.

চিত্রার সাথে আজকাল আর দেখা হয় না।

বারান্দায় যাই, ওর নাম ধরে ডাকি — কেউ আসে না। একদিন একজন অচেনা লোককে বারান্দায় দেখে উৎসাহ পাই। যাক, উনার কাছে অন্তত চিত্রার খোঁজ পাওয়া যাবে।

কিন্তু না। আমি ভুল ছিলাম। লোকটি চিত্রার নাম শুনে অবাক হলো। বলল, “এই নামে তো কেউ এখানে থাকে না।”

আমিও অবাক হলাম।

আর জানতে পারলাম লোকটি এ বাসায় নতুন ভাড়া এসেছেন। তারমানে চিত্রা বাসা বদল করেছে? আমি একরাশ অভিমান নিয়ে বিষণ্ণ হই। কিন্তু প্রেম তাতে কমে না। বরং আমি জানতে চাই চিত্রা এখন কোথায় থাকে।

এই প্রশ্নের উত্তরে যা জানলাম, তাতে আমি পুরোপুরি দমে যাই। চিত্রা নামে কেউই নাকি ওই ফ্ল্যাটে এতদিন থাকত না। তবে বছর দুয়েক আগে থাকত, চিত্রা নামের একটা কিশোরী মেয়ে ওই ফ্ল্যাটেই মারা গিয়েছিল।

ঘটনা জেনে আমার অভিমান যেন কঠিন থেকে তরলে রূপান্তরিত হয়ে গেল। কিন্তু সেই তরলে ভালোবাসা হয়ে ধরা দেয়নি চিত্রা। মাঝখানে তরলে জমে গেছে শ্যাওলা…।

*****

গল্প: তখন শেষ বিকেল

লেখা: বাপ্পী মাহমুদ 

প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

1 thought on “তখন শেষ বিকেল — গভীর ভালোবাসার গল্প”

  1. চমৎকার রোমান্টিক-হরর গল্প। শেষটা অপ্রত্যাশিত ছিল।

    লিখতে থাকুন। এরকম আরও গল্প চাই, নিয়মিত…!

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top