‘নিভৃতের মায়ায়’— রহস্য গল্প। গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। এই গল্পের আগের দুই পর্ব অনুযায়ী গল্পে জিনো নামক একজন রহস্যময় চরিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে। লেখক হিসেবে চেষ্টা করেছি কলমের খোঁচায় তাকে জীবন্ত করে তুলবার। গল্পটা কেমন হয়েছে আপনারা পড়ে জানাবেন আশা করি।
নিভৃতের মায়ায় | বাপ্পী মাহমুদ
এক.
নীলা হঠাৎ যেমন এসেছিল, তেমনিভাবেই চলে গেল। আকাশে সূর্যের আলো বাড়ছে। জানালার শার্সি খুলে দিলাম। কিছুক্ষণ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু মনটা অস্থির। বারবার মনে হচ্ছে, সম্প্রতি যা ঘটেছে সব মিথ্যা।
তবে এটুকু ভেবে আশ্বস্ত হচ্ছি নীলা অন্তত ভ্যাম্পায়ার নয়। তার পূর্বপুরুষদের মধ্যে তার দাদার ভাইয়েরা ভ্যাম্পায়ারদের শিকার ছিল। অনেক কঠিন পরিস্থিতিতেও তারা বেঁচে যায়। কিন্তু ভ্যাম্পায়ার সংক্রমিত ভাইরাসের জন্য তারা নিজেরাও ভ্যাম্পায়ার হয়ে যায়।
ভ্যাম্পায়ারদের চেহারায় বয়সের ছাপ পড়ে না।
নীলার দাদাদেরও মুখে বয়সের ছাপ নেই। তারা তরুণ বয়সে ভাইরাসের শিকার হয়ে এখনও তরুণ আছে।
আমি নীলাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তারা এখন কোথায় আছে?”
নীলা অল্প হেসে বলে, “আমাদের ভার্সিটিতেই তারা পড়াশোনা করছে। দাদারা বহু সংখ্যক বার হল গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছেন।”
আমি জানালা থেকে সরে এলাম। ভার্সিটি যাবার সময় হয়ে এসেছে। দ্রুত তৈরি হয়ে নিয়ে বাসে চাপলাম। মনে মনে জিনোকে খুঁজছি। অনেক প্রশ্ন আছে আমার তাকে জিজ্ঞেস করবার। কিন্তু কোথাও তাকে পেলাম না। আমার শুধু অস্থিরতা বাড়তে লাগলো।
» আরও পড়ুন: স্বপ্ন নেই
দুই.
ভার্সিটিতে পৌঁছে নিজের ক্লাসরুমের দিকে এগুচ্ছি।
তিনতলায় উঠে করিডোর ধরে হাঁটছিলাম, হঠাৎ কিছু বুঝবার আগেই কেউ একজন দ্রুত আমার পাশ দিয়ে ছুটে যাবার সময় ধাক্কা লাগে। আর ধাক্কার কারণে আমি করিডোরের রেলিং থেকে উল্টে পড়ি।
রেলিং থেকে পড়েই যাচ্ছিলাম, তখন জিনো আমার হাতটি ধরে। আমি ভয়ে কেঁদেই ফেলেছি। করিডোরেও অনেকে জড় হয়েছে।
নিচে থেকে আর্তনাদ করছে অনেকে। আমি জিনোর দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমায় তোলো!”
কিন্তু সেসময় করিডোরের অন্যরা এসে জিনোকে আমার থেকে আলাদা করতে চাইলো। তাদের এমন করার কারণ বুঝতে পারছি না। আমার হাতের বাঁধন আলগা হতে শুরু করেছে। জিনো পেরে উঠছে না মানুষগুলোর সাথে।
আমি কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করলাম, “আমাকে বাঁচতে দাও।”
কিন্তু তারা বলল, “না! আমরা তোমায় চাই না।”
“কেন? কী দোষ আমার?”
“তুমি একজন খুনির বন্ধু,” তারা রাগত গলায় বলল, “জিনো ওয়াটসন একজন খুনি ভ্যাম্পায়ার!”
আর তখনই আমি নিচে পড়তে শুরু করলাম। চিৎকার দিয়ে আমি নিচে তাকাই। বাঁচার আকুতি নিয়ে হাত-পা ছুড়তে ছুড়তেই কারও স্পর্শ অনুভব করি।
তাকাতেই পুরো দৃশ্যপট পাল্টে যায়। দেখি, আমি বাসে বসে আছি। আমার কাঁধে নীলার হাত। সে বলল, “স্বপ্ন দেখেছিস?”
আমি কিছু বললাম না। চলন্ত বাসে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, তাও মনে নেই। শুধু অবিশ্বাসের সাথে ভেবে চলেছি— স্বপ্ন এত জীবন্ত হয়?
» আরও পড়ুন: তুমি নেই কোথাও — ভালোবাসার গল্প
তিন.
কিন্তু ভার্সিটিতে পৌঁছে যে ঘটনার সাক্ষী হলাম তা স্বপ্নের চেয়ে কম কিছু নয়। ক্যাম্পাসে দুজন ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেছে। তাদের ঘাড়ে কামড়ের দাগ বসে আছে। সারা ভার্সিটিতে সবাই একটায় কথা বলছে— ‘ভ্যাম্পায়ার! ভ্যাম্পায়ার!’
নীলা আমার পাশে ছিল।
সে আচমকা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে। আর বলে, “এখনও বুঝছিস না? এগুলো জিনোর কাজ!”
“তুই কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছিস?”
নীলা আবারও মোবাইল বের করলো। আমি বিস্ফারিত চোখে দেখি ক্যাম্পাসের সিসি ক্যামেরা ফুটেজে জিনোকে দেখা যাচ্ছে। সে নির্মমভাবে দুজনকে মেরে ফেলছে।
নীলার দিকে তাকাতেই সে বলল, “ক্যাম্পাসের ভিডিও ফুটেজ আমাকে যে দিয়েছে, তাকেও জিনো মারতে চায়। শুধু তুই পারিস তাকে বাঁচাতে।”
আমি আঁতকে উঠে বলি, “কীভাবে?”
“জিনোর সাথে কথা বলে। ও তোকে ভালোবাসে। তোর কথা সে ফেলবে না।”
কিন্তু জিনোকে কোথাও পাওয়া গেল না। ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা ছেলেটির নাম রাশেদ। নীলার পাশেই দাঁড়িয়ে সে, ভয়ে প্রায় চুপসে গেছে। আমার দিকে বারবার ভরসার চোখে তাকাচ্ছে। আমি এখনও তার সাথে কোনো কথা বলিনি। শুধু ভাবছি— জিনো এতটা ভয়ংকর তা কে জানতো!
চুপচাপ থেকে কোনো কাজ হবে না, তাই নীলাকে বললাম, “তোর দাদাদের বল রাশেদের খেয়াল রাখতে। আর আমি জিনোকে খুঁজব।”
নীলা মাথা নাড়লো, বলল, “জিনোর সাথে সাবধানে কথা বলিস।”
“তুই চিন্তা করিস না। আমার কিছুই হবে না।”
» আরও পড়ুন: নিভৃতের মায়ায় (প্রথম পর্ব) — ভূতের গল্প
চার.
জিনোর সাথে যখন দেখা করব বলে ঠিক করেছি, তখন ফোনে জিনোর টেক্সট এলো— নবগঙ্গা নদীর ক্যাসল ব্রীজে এসো। একা!
কিন্তু আমার একা যাওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ।
আমি কী করব? নীলা বলল, “আমার দাদাদের মধ্যে ছোটজন থাকবে রাশেদের সাথে। বড় দাদা ও মেজো দাদাকে তোর সাথে পাঠাচ্ছি।”
“আচ্ছা।”
আমি পা বাড়াতেই নীলা আমার হাতটি ধরলো। বলল, “ভয় পাস না। ভয় পেলেই সব শেষ!”
আমার সেই মুহূর্তে ফ্যাকাসে হাসি হাসা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।
ভার্সিটি থেকে একটি লোকাল বাসে রওনা হলাম।
বাস থেকে নেমে ক্যাসল ব্রীজের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার মাঝপথে দুইদিক থেকে দুজন যুবক এগিয়ে এলো। তখন মধ্যদুপুর। আমার দিকে তাদের চাহনি ছিল অন্যরকম। আর আমিও নিশ্চিত হলাম— এরা নীলার দাদা।
তারা দুজন আমার দু’পাশে পায়ে পায়ে হাঁটছে।
তাদের সাথে আমার সৌজন্য আলাপের মতো কিছু কথা হলো। বয়সে তাদেরকে তরুণ দেখাচ্ছে। কে বলবে তাদের বয়স আশি-পঁচাশির ভেতর? বড় দাদার নাম কুশ, মেজ দাদার নাম ইয়ুল। দুটিই ছদ্মনাম— ভ্যাম্পায়ার হবার পর তারা এই নাম ব্যবহার করছে।
ক্যাসল ব্রীজে আসবার কিছু পথ বাকি। কুশ আর ইয়ুল দুজনেই আমাকে ভরসা দিয়ে আলাদা পথে দুদিক চলে গেলেন। বললেন, “তোমার ওপর আমাদের নজর থাকবে। বিপদ হবে না।”
আমি একা পথে ক্যাসল ব্রীজ এলাম।
» আরও পড়ুন: সন্দেহ — কষ্টের গল্প
পাঁচ.
জিনো যখন সামনে এলো তখন আমি একইসাথে অবাক ও দুঃখিত হলাম। সে আগের মতো নেই। তার চেহারায় আগের সেই লজ্জার ছাপ নেই, আছে রুক্ষতা। আচরণে যথেষ্ট টক্সিক হয়েছে। আমার চোখের খুব কাছে ঝুঁকে এসে সে বলল, “আমায় ভয় করো না। ভয় করলেই সব শেষ।”
আমি এসব আর নিতে পারছিলাম না।
খুব রুঢ় কন্ঠে বললাম, “তুমিও তোমার মায়ের মতোই একজন মনস্টার। তুমি নিষ্পাপ মানুষকেও মেরে ফেলো।”
জিনো নিজের সপক্ষে যুক্তি দিলো না। ব্রীজের রেলিংয়ে সে ঝুঁকে দাঁড়ালো। বলল, “তুমি এখনও জানো না তুমি কী নিয়ে কথা বলছো।”
“আমি নিরপেক্ষতার বিষয়ে কথা বলছি।”
“নিরপেক্ষতা?” সে সাংঘাতিক রাগ দেখালো, “আমার জায়গায় থাকলে তুমি কী করতে?”
ঠিক এসময় উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমার মনে হলো— জিনোর সম্পর্কে আমি অল্পই জানি। সে বলল, “তুমি আর তোমার বন্ধুরা চিন্তিত হয়ো না। আমি কারও কোনো ক্ষতি করব না।”
আমি তবু আশ্বস্ত হতে পারছিলাম না। দ্বিধা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। জিনো এবার আরও বিশ্লেষণ করে বলল, “রাশেদকে আমি মারব না। এটা তোমাদের ভ্রান্ত ধারণা মাত্র।”
“তোমাকে বিশ্বাস করব কীভাবে?”
জিনো সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, “আমাকে অবিশ্বাস করলেই বরং ক্ষতি। সময় বলে দিবে আমি কে ছিলাম।”
সে আমার অভিমুখে হাঁটতে শুরু করেছে। আমি পিছন থেকে ডাকার জন্য ইতস্তত ছিলাম। সেসময় কুশ আর ইয়ুল এলো। কিন্তু তারা জিনোর ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করলো না। আমরা তিনজন নিঃশব্দে বাস ছাউনিতে এলাম। তারপর একটা লোকাল বাসে উঠে শহরে ফিরলাম। মাঝপথে ওরা দুজন নেমে গেলেন।
আমি একা একা হেঁটে বাড়ি ফিরছি। আমার পথিমধ্যেই কান্না পেল। কান্না আটকে গলায় অদৃশ্য ব্যথা অনুভব করলাম।
» আরও পড়ুন: হেমন্তের রাত — নস্টালজিক মুক্তগদ্য
ছয়.
এমন দিনও এলো তাহলে?
ভার্সিটির ক্লাস শেষে করিডোরে দাঁড়িয়ে আছি। কেউ একজন এসে ক্যান্টিন রুমে যেতে বলল— আমার জন্য একজন অপেক্ষা করছে। ক্যান্টিনে গিয়েই আঁতকে উঠি।
একজন ধবল সাদা চামড়ার ভদ্রমহিলা বসে আছেন। চোখে সানগ্লাস। তার চামড়ার ফ্যাকাসে বর্ণ বলে দিচ্ছে— সে একজন ভ্যাম্পায়ার। আমি নিশ্চিত হলাম— তিনিই জিনোর মা র্যাচেল স্টোন।
আমাকে কাছে পেয়ে তিনি ইশারায় বসতে বললেন। তার মুখে হাসি, আচরণে শীতল আবহাওয়া। প্রথম দেখায় পরিষ্কার হলো মহিলা খুবই বুদ্ধিমতী। তিনি আন্তরিক গলায় বললেন, “তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।”
আমি অল্প হাসলাম। সত্যি বলতে সেসময় আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় ছিলাম।
তিনি বললেন, “আমার অনেক কিছুই বলবার আছে। তুমি কি শুনবে?”
“নিশ্চয়ই শুনব। আপনি বলুন।”
“বলব। তাড়া নেই। শোনো, তোমার ভেতর যত কনফিউশন এবং জিনোকে নিয়ে ভালোবাসার যত দ্বন্দ্ব সবকিছুর জবাব আমার কাছে আছে।”
এটা বলে তিনি আমার হাতের ওপর হাত রাখলেন। কিন্তু আমি ভরসা পাচ্ছিলাম না। তিনি যেন সেটা বুঝলেন। আর বড় করে শ্বাস নিয়ে বললেন, “দুর্বল যখন বোকা হয় তখন তাদের ওপর শক্তিশালী আর বুদ্ধিমান ভ্যাম্পায়াররা সহ্য ক্ষমতা হারাবে— এটাই সত্য।”
আমি চমকে উঠলাম। তিনি এমন একটা কথা বলেছেন যা বাস্তবিক দিক থেকে সঠিক হলেও মানবতার জন্য নিষ্ঠুর ছিল। এক মুহূর্তের জন্য জিনোর কথা মনে পড়ে গেল— যখন নিরপেক্ষতার প্রসঙ্গে সে বলেছিল— আমার জায়গায় থাকলে তুমি কী করতে?
(চলবে…)
গল্প: স্বপ্ন নেই
লেখা: বাপ্পী মাহমুদ
প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টাল ও ফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।



