রিলেশনশিপ — এক অদ্ভুত ভালোবাসার গল্প। ‘রিলেশনশিপ’ গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। এটি একটি রোমান্টিক জনরার প্রেমের গল্প। রিলেশনশিপ গল্পটি মুহিব নামের এক অগোছালো ছেলেকে নিয়ে। তার জীবনে আসা এক অদ্ভুত ভালোবাসা সম্পর্কে। প্রিয় পাঠক, চলুন পড়া যাক, বাপ্পী মাহমুদের লেখা— রিলেশনশিপ — এক অদ্ভুত ভালোবাসার গল্প।
রিলেশনশিপ | বাপ্পী মাহমুদ
এক.
জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যা অলস মানুষকেও মোটিভেট করে। আর জীবনের সকল ইতিবাচক সিদ্ধান্ত তখন একদিনেই পূরণ করতে ইচ্ছে হয়। আমাদের আজকের গল্পের মুহিব তেমনই এক চরিত্র।
মুহিব খুবই অলস আর অগোছালো একটি চরিত্র।
গল্পে তার বয়স ছাব্বিশ হলেও সে আচরণে ইমম্যাচিউর। তবে যেমনটি বললাম — এই মুহূর্তে সে অনেক মোটিভেটেড। আর হবে নাই বা কেন? খুব দ্রুতই সে বিয়ে করতে যাচ্ছে। মেয়ের বাবা-মাকে কথা দিয়ে এনগেজমেন্ট সেরে ফেলেছে মুহিবের পরিবার।
আজ কোনো এক কারণে মেয়েটি মুহিবকে দেখতে চায়। ফোন রাখবার পরই সে অ্যাড্রেস হোয়াটসঅ্যাপ করলো মুহিবকে। মুহিব অনেকক্ষণ আচ্ছন্নের মতো তাকিয়ে রইল টেক্সটের দিকে।
দুই.
মেয়েটি, যার সাথে মুহিবের বিয়ের কথা চলছে — তার নাম রিমি। মুহিবকে যে রেস্তোরাঁয় ডাকা হয়েছে, ওইটা তার বাবার রেস্তোরাঁ। রিমির বাবা এমনিতেও অনেক বড়ো কোম্পানির মালিক। এই রেস্তোরাঁ নিজের ছেলে, মানে রিমির বড়ো ভাইয়ের জন্য খুলে দিয়েছেন।
রেস্তোরাঁ যে তার হবু শ্বশুরবাড়ির নামে — এইটা ভেবে মুহিব একটা আনকোরা অহংবোধ অনুভব করে।
রিমির সামনে বসার পর রিমি প্রথম যে প্রশ্ন করলো, তা শুনে যেকোনো বুদ্ধিমান ছেলেই চমকে যেত। আর বুঝত তাকে অপমান করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু মুহিব বুদ্ধিমানদের কারও ভেতর পড়ে না।
রিমি সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কি জানো ওয়ারেন বাফেট কত বছর বয়স থেকে উদ্যোক্তা হয়েছেন?”
“না তো,” মুহিব অবাক হবার ভান করে বলে, “তুমি জানো?”
রাগে রিমির দাঁতে দাঁত লেগে যায়। তবু সে নকল হাসি মুখে আনে। আর বলে, “মেধা আর পরিশ্রম যেখানে নেই, আমিও সেখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারি না।”
রিমি ভেবেছিল, ছেলেটা এবার লজ্জায় পড়বে।
কিন্তু না, সে উৎসাহ নিয়ে বলল, “হ্যা, আমিও তোমার মতোই!”
“না!” এই প্রথম মুহিবের কথায় প্রতিবাদ করলো রিমি, “তুমি চাইলেও আমার মতো ইন্টেলিজেন্ট হতে পারবে না।”
মুহিব কিছু না বুঝলেও হকচকিয়ে যায়। বুঝতে পারে কোনো এক সিরিয়াস টপিকে কথা এগুচ্ছে। কিন্তু সেই সিরিয়াস টপিকটা আসলে কী তা সে বোঝে না।
» আরও পড়ুন: তখন শেষ বিকেল — গভীর ভালোবাসার গল্প
তিন.
মুহিব মাথা নিচু করে হাঁটছে।
সে রেস্তোরাঁ থেকে বের হলো। একবার ইচ্ছে হলো রিমির দিকে তাকানোর। কিন্তু সে তাকালো না। আর রিমি? তার বয়ফ্রেন্ড আছে। মুহিব যাবার জন্য উঠে দাঁড়াতেই সেই ছেলেটি হঠাৎ কোত্থেকে এলো।
অনেক মন খারাপ লাগছে মুহিবের। রাস্তায় না থাকলে সে সত্যিই কান্না করত। কারণ রিমি অনেক কঠিন কথা বলেছে। সে জানিয়েছে, “আমি তোমায় বিয়ে করতে চাই না।”
মুহিবের হাসিমাখা চেহারা বদলে যায়। সেদিকে লক্ষ্য না করেই রিমি বলে, “তুমি যদি নিজের ইচ্ছায় বিয়েটা ভেঙে দাও, তবে আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।”
মুহিব দেখলো কোনো খাবারের অর্ডারও করা হয়নি। সে কি এতটাই অবহেলিত?
কিন্তু এই অবহেলা মুহিবকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করলো।
চার.
এই ঘটনার পর কেটে গেছে আজ চারটি বছর।
একটা মেয়ের সাথে সম্প্রতি মুহিবের পরিচয় হলো। মেয়েটার নাম মেঘা। বাস স্টপে মেঘা ওকে প্রথম দেখে। মেঘা বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। আর মুহিবের গাড়িটাতে তখন সেই বাসস্টপের সামনে টায়ার পাংচার হয়।
মুহিব স্পেয়ার চাকা না থাকায় কাউকে ফোন করে। আর অতি দ্রুত সে এসে চাকা লাগিয়ে দেয়। পুরো ঘটনাটা অতি দ্রুত ঘটে। মুহিব খুবই স্টাইলিশ ভঙ্গিতে তখন গাড়িতে ঢুকে চলে যায়।
দৃশ্যটা দেখে মেঘা অন্যরকম শিহরণ বোধ করে। ‘ছেলেটা দারুণ স্টাইলিশ’ — নিজের মনেই বলে সে। আরও ভাবে এমন স্টাইলিশ কেউ যদি তার বয়ফ্রেন্ড হতো! আর তখনই বাস আসে। সে কল্পনা থেকে বেরিয়ে বাসে বসে।
একটা চাকরির ইন্টারভিউ আছে।
তার অনেক টেনশন হচ্ছে। তবে মনে হচ্ছে সে ভালো করবে। আর কী আশ্চর্য, চাকরির ভাইভা বোর্ডে তিনজনের মধ্যে একজন হিসেবে সে ছেলেটিকে বসে থাকতে দেখল!
পাঁচ.
মুহিবই প্রথম প্রশ্ন করলো, ইংরেজিতে জানতে চাইল মার্কেটিং ফিল্ডে সেলস ডিপার্টমেন্টে লিড দেওয়া নিয়ে হাবিজাবি প্রশ্ন। মেঘা কিছুই মন দিয়ে শুনলো না। শুধু নিজ অজান্তেই বলে বসলো, “আই লাভ ইউ!”
ওখানে বসা তিনজনই অবাক হলেও প্রত্যেকেই ক্যাজুয়ালি একটা হাসি দিলো, পোলাইটলি সিচুয়েশন হ্যান্ডেল করতে চাইল। কিন্তু মেঘা? সে লজ্জায় কোথায় যেন মিশে যাচ্ছিল।
মুহিব শুনতে পায়নি এমন ভঙ্গিতে বলল, “এই চাকরি কি আপনার জন্য জরুরি?”
মেঘা উত্তর দিতে পারলো না৷ তাকিয়ে রইল। তার নিজের চোখেই উপচে পড়া প্রশ্ন, সে কিভাবে উত্তর দেবে?
মুহিব বলল, “ঠিক আছে, আপনি আসতে পারেন।”
বাকি দুজন কোনো প্রশ্নই জিজ্ঞেস করেনি। মেঘার কেমন কান্না পেল। সে উঠে যায়। আর বাইরে এসে করিডোর ধরে আনমনে হাঁটতে থাকে।
কিন্তু সে জানতো না, তার জন্য এক বিশেষ চমক অপেক্ষা করছে।
» আরও পড়ুন: শূন্যতায় খুঁজি তোমায় — নতুন রোমান্টিক গল্প
ছয়.
মেঘার বয়স পঁচিশ বছর।
সে এখনো অবধি কারও সাথে রিলেশন করেনি। মুহিবকেই তার প্রথম ভালো লাগা। সেই ভালো লাগাও সে ধরে রাখতে পারলো না। করিডোর ধরে সে হাঁটতে হাঁটতে একটা লম্বা শ্বাস নিলো। তারপর কী মনে করে একবার থামল।
আর তখনই পদশব্দ শোনা যায়। মেঘা পেছন তাকিয়ে দেখে মুহিব এদিকেই আসছে। তার মুখে হাসি আসে। মুহিবও যেন তখন হাঁটার গতি বাড়ালো। তা দেখে মেঘার হাসি আরও ব্যপ্তি লাভ করে।
কিন্তু মুহিব তখনই মেঘাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আর মেঘা বোকার মতো সামনে তাকিয়ে দেখে মুহিব একটা লোকের সাথে কী নিয়ে কথা বলছে। দেখে মনে হয় লোকটাকে মিষ্টি শাসন করছে সে — লোকটা কি তার বাবা?
মেঘার ধারণাই সত্যি। লোকটা মুহিবের বাবা। অন্যদিনের মতো আজও টিফিন ক্যারিয়ারে তিনি খাবার নিয়ে হাজির। মেঘা কাছে গেল। আর বলল, “এত রাগ করছেন কেন স্যার? আপনার বাবা ভালোবেসেই আপনার জন্য খাবার এনেছেন তো!”
কথা শুনে বাবা-ছেলে দুজনেই চমকে তাকায়। লজ্জায় আবারও নীল হয় মেঘা।
মেঘা লজ্জা পেলেও আবার বলে, “আপনার তো তবু বাবা আছেন, আমার এই আদরটুকুও নেই।”
বলতে বলতে মেঘার চোখে পানি আসে। মুহিব আর তার বাবা সচকিত হয় তার আবেগে। লোকটি বলেন, “মা, তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তুমি কি আমার ছেলের পিএ?”
“না,” মেঘা অল্প হাসে, “সেই সৌভাগ্য আমার হয়নি!”
“সৌভাগ্য?” মুহিব চমকে যায়, “সৌভাগ্য মানে?”
লোকটি মৃদু ধমকান তার ছেলেকে। বলেন, “তুই বুঝবি না। এগুলো ফ্যামিলি ম্যাটার।”
তারপর তিনি মেঘার দিকে প্রশ্রয়ের দৃষ্টিতে তাকান। মেঘাও প্রশ্রয় পায়।
আর মুহিব তখন কিছু একটা ভাবছিল।
সাত.
এ ঘটনার পর মুহিব মেয়েটাকে আলাদা ডেকে পার্সোনালি কথা বলতে চায়। তারা দুজন অফিসের ক্যান্টিনে বসলো। মুহিব বলল, “আমি ভালোবাসতে জানি না!”
মেঘা অবাক, এরকম ছেলে সে আগে দেখেনি।
মুহিব বলে চলে, “আমি খুব বোকা ছিলাম। হয়তো এখনো আছি। আমাকে কেউ টলারেট করবে.. তাই-ই ভাবতে পারি না আর ভালোবাসা —”
মেঘা ওর মুখের কথা কেড়ে নেয়। বলে, “আমি সব শিখিয়ে দেবো।”
“কোনো দরকার নেই,” মুহিবের মুখ কঠিন হয়, “আমি ভালোবাসা চাই না এখন আর!”
“কেন?”
“কারণ যখন চেয়েছি, তখন পাইনি।”
“ওসব কি ভুলে যাওয়া যায় না? আমিই কি আপনার বর্তমান হতে পারি না?”
মুহিব লম্বা শ্বাস নেয়, বলে, “কিছু মনে করবেন না। কিন্তু.. প্রতিষ্ঠিত হবার আগে আমি যত মেয়েকেই প্রেম নিবেদন করেছি সবাই ফিরিয়ে দিয়েছে। আর এখন? এখন আমি প্রতিষ্ঠিত হতেই —”
মেঘা আবার থামালো ওকে। বলল, “আপনার কষ্ট বুঝতে পারছি।”
মুহিব চমকে তাকালো। এই প্রথম কোনো মেয়ে তার কথায় রাগ করেনি। সে বলল, “সত্যিই বুঝতে পারছেন?”
মেঘার মায়া হলো। ছেলেটা কত অনুনয়ের সাথে প্রশ্নটা করেছে!
মেঘা হাসি আনলো মুখে।
মুহিবের মনে হলো এ হাসি যেন কতদিনের চেনা। সে তাকিয়ে রইল নিঃসংকোচে। আর বলল, “আমি তাহলে ভুল ছিলাম। মেয়েদের সম্পর্কে ভুল ধারণা ছিল, ভেবেছিলাম, তারা শুধু ছেলেদের প্রতিষ্ঠিত হতে দেখেই প্রেমে পড়ে।”
মেঘা বলল, “ইটস ওকে।”
মুহিব হাসে। সাথে মেঘাও। এটা ছিল দুজন দুজনকে পেয়ে যাবার রঙিন হাসি!
গল্প: রিলেশনশিপ
লেখা: বাপ্পী মাহমুদ
প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টাল ও ফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।



