‘স্বপ্ন নেই’— দুঃখের গল্প। গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। মূল গল্পে একটা মানুষের স্বতন্ত্র মনোভাব ফুটে উঠেছে, যে ব্যক্তি নিঃসঙ্গ ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু সে কি দুঃখী? প্রিয় পাঠক, তার উত্তর না হয় আপনারাই দেবেন।
স্বপ্ন নেই | বাপ্পী মাহমুদ
এক.
তার ডায়রিতে বড় বড় করে লেখা— ‘আমি স্বপ্ন দেখতে জানি না’। জুইয়ের সাথে বিয়ের পর জুই একদিন লেখাটি দেখে ফেলে। এ নিয়ে সে প্রায়ই প্রশ্ন করে। ফারদিন তাতেও নির্বিকার। বেশি প্রশ্ন করলে বলে, “আমার জীবনে কোনো লক্ষ্য নেই।”
“কী!” অবাক হয় জুই, “এটা সম্ভব না!”
“কেন সম্ভব নয়?”
“একসময় আমাদের ছেলেমেয়ে হবে, তাদের মানুষের মতো মানুষ করতে হবে। সন্তানকে পড়ালেখা শিখিয়ে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব। তুমি দিনরাত শ্রম দিয়ে টাকা রোজগার করবে, আর—”
মাঝপথেই ফারদিন থামিয়ে দেয়। বলে, “ব্যস, আর শুনতে চাই না। এক কাপ চা বানাও। তোমার কথা শুনে মাথা ধরেছে।”
জুই চা বানাবার কোনো তাড়া দেখায় না।
ফারদিন ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে থাকে খোলা জানালা দিয়ে। জানালার বাইরে ব্যস্ত রাস্তা। রাস্তায় গাড়ি ছুটছে, লোকজন হাঁটছে। প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো উদ্দেশ্য আছে। এ পৃথিবীতে উদ্দেশ্যহীন লোকেরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন।
ফারদিনও সেই বিচ্ছিন্ন লোকেদের দলের একজন। তার কোনো বন্ধু নেই, তার বিশেষ সম্পদ নেই, থাকার জন্য তার নিজের বাড়ি নেই। মাঝে মাঝে ফারদিন তো ভুলে যায় তার জীবন আছে।
বাইরে সন্ধ্যা মিলাচ্ছে। ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলে উঠলো। এখন ফারদিন বের হবে। তার বাবা ফয়সাল উদ্দিন ডেকেছেন। ফয়সাল সাহেব থাকেন ঢাকার ঝিকাতলীতে। ওখানে তার নিজস্ব সংসার। কিছুদিন আগে ফয়সাল সাহেব একটা কমবয়সী মেয়েকে বিয়ে করেছেন। ফারদিনের বিয়ের ঠিক দু’মাস পরই তিনি বিয়ে করেন।
ছোটবেলাতেই ফারদিনের মা মারা গেছেন। বাবার কাছে সে অনাদরে মানুষ। তবু সে তার বাবাকে লক্ষ্য করতো। লোকটি অলস প্রকৃতির ছিলেন, কোনো কাজ করতেন না। প্রচুর স্মোক করতেন। আর মাঝে মধ্যে ফারদিনকে ডেকে বলতেন, “আমার জীবনে কোনো লক্ষ্য নেই। তাতে আমি মরে যাইনি। তুমিও জীবনে লক্ষ্য রেখো না। সব মানুষকেই একরকম হতে হবে তার কোনো মানে নেই।”
ফারদিন জিজ্ঞেস করলো, “লক্ষ্য কেন থাকবে না?”
“বড় হও, নিজেই উত্তর পেয়ে যাবে।”
» আরও পড়ুন: তুমি নেই কোথাও — ভালোবাসার গল্প
দুই.
ফারদিন আজ বড় হয়েছে। তার বয়স ছাব্বিশ বছর। প্রথম জীবনে সে গল্প লিখতো। তার মন বলতো এটাই তার জীবনের লক্ষ্য। এটাতে তার প্যাশন আছে।
কিন্তু মানুষ তার লেখা গ্রহণ করেনি। সেও একসময় লক্ষ্য করলো— তার লেখালেখির জগতটা কল্পনাকেন্দ্রিক। কল্পনাকে সাধারণ মানুষ গ্রহণ করে না, করতে পারে না।
সে বহু পত্র-পত্রিকায় লেখা পাঠিয়েছিল।
কেউ ছাপেনি। সে ভেবেছিল— আমি এখন থেকে নিজের জন্য লিখব। আজও সে নিজের জন্যই লিখে। কিন্তু সেই প্যাশন তার প্রফেশন নয়। তার জীবনের লক্ষ্যটা আর নেই।
জুই এসে বলল, “কী ভাবছো?”
ফারদিন উঠে দাঁড়ালো জানালা থেকে, বলল, “বাবার কাছে যাচ্ছি।”
জুইয়ের মুখ কঠিন হয়ে গেল। প্রতিমাসেই ফারদিন তার বাবার সাথে দেখা করে, তারপর কিছু টাকা নিয়ে ফেরে। সেই টাকায় সংসার চলে। এই জীবন জুইয়ের ভালো লাগে না।
“ফারদিন!”
“হুম?”
“তুমি যাবে না।”
“ঠিক আছে, তুমি বললে পরে যাব।”
“না,” জুই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কন্ঠে বলে, “আর কোনোদিনই যাবে না!”
ফারদিন দাঁড়িয়ে থাকে, কিছু বলে না।
জুই বলে, “আমি একটা চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, সেই পর্যন্ত তুমি অপেক্ষা করো।”
“ঠিক আছে।”
জুই কাছে এসে ফারদিনের হাতটা ধরলো।
ফারদিনের মুখের অভিব্যক্তি বদলানো না। কেমন নিষ্প্রাণ তার চোখ দুটো। কে বলবে, এই ছেলেটা একসময় গল্প লিখে জুইকে ইম্প্রেস করেছিল?
সেদিন ছিল এক্সামের দিন। ফাইনাল ইয়ার ইনকোর্স এক্সাম হতে দেরি হবে— এমনটাই জানানো হয়েছে। ক্লাসে তখন সবাই হতাশার শব্দ করলো। তখন ফারদিন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “তোরা যদি কিছু মনে না করিস এই সময়ে আমি একটা গল্প বলে শোনাতে পারি।”
» আরও পড়ুন: নিভৃতের মায়ায় (প্রথম পর্ব) — ভূতের গল্প
তিন.
সবার তখন অবসন্ন অবস্থা, কথাটি শুনে একটু উত্তেজিত হলো সবাই। ফারদিন গল্প বলতে শুরু করে। একটা আধুনিক রূপকথার গল্প। যেখানে একজন রাজকন্যা রাত হলেই মন্ত্রীপুত্রের কাছে এসে দরজায় কড়া নাড়ে। মন্ত্রীপুত্র দরজা খোলে না।
একদিন রাজকন্যার খুব অভিমান হলো। মন্ত্রীপুত্র সেদিন দরজা খুলে জানায়— আগামীকাল রাজদরবারে সে রাজকন্যাকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠাবে। খুশিতে রাজকন্যার ঘুম হয় না।
কিন্তু প্রস্তাব পাঠানোর আগেই সেনাপতি শত্রুতা করে রাজাকে বলে, “রাজকন্যার সাথে মন্ত্রীপুত্রের সম্পর্ক আছে।”
সেনাপতি প্রমাণস্বরূপ রাজকন্যার পায়ের ছাপ এনে রাজাকে দেখায়। রাজা ক্রুদ্ধ হন। মন্ত্রীপুত্রকে নির্বাসনে পাঠাবার আদেশ দেন।
মন্ত্রীপুত্র সব জেনেও তার ঘর থেকে দরজা খুলে বের হয় না।
তাকে সত্যিই নির্বাসনে পাঠানো হয়। এতকিছুর পরও মন্ত্রীপুত্রের কোনো অভিযোগ ছিল না, সে কিছুই বলল না রাজার উদ্দেশ্যে। সবাই বলতে লাগলো— সে কাপুরুষ। কিন্তু মন্ত্রীপুত্র জানতো— এটা তার নিজের ব্যক্তিত্ব। যার দাম এই রাজদরবারে নেই।
একদিন রাজ্যে খরা দেখা দিলো। জ্যোতিষী বললেন, “যে দরজা বন্ধ আছে, সেটা খুললেই খরা দূর হবে।”
জ্যোতিষীর ইঙ্গিত অনুযায়ী রাজা একসময় বুঝতে পারেন নির্বাসিত মন্ত্রীপুত্রকে মুক্ত করতে হবে। মন্ত্রীপুত্র মুক্ত হতেই খরা দূর হয়। কিন্তু রাজকন্যাও ততদিনে মন্ত্রীপুত্রের মুক্তির খবরে অভিমানী হয়ে ওঠে। সে স্বেচ্ছায় নির্বাসন বেছে নেয়।
মন্ত্রীপুত্র নিজ উদ্যোগে রাজকন্যার ঘরের দরজা খোলে। কিন্তু রাজকন্যা সেখানে নেই। আছে শুধু একটা ডায়রি, যেখানে লেখা— ‘আমি স্বপ্ন দেখতে জানি না’।
মন্ত্রীপুত্র বুঝতে পারে— রাজকন্যা মরেনি। সে শুধু স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিয়েছে। আর যে মানুষ স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেয়, সে চোখের সামনে থেকেও হারিয়ে যায়।
» আরও পড়ুন: সন্দেহ — কষ্টের গল্প
চার.
ফারদিনের গল্প এখানেই শেষ।
ক্লাসজুড়ে তখন নীরবতা। আর কেউ লক্ষ্য করেনি— জুইয়ের চোখে পানি। পরীক্ষা শেষে জুই অনেক খুঁজলো ফারদিনকে।
কিন্তু এ ঘটনার প্রায় দুই মাস পর ফারদিনের সাথে তার দেখা। একটা রেস্টুরেন্টে ফারদিন কাজ করতো। জুই তাকে দেখেই এগিয়ে যায়। বলে, “তুমি কি কাল আসবে, আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব?”
ফারদিন অল্প হেসে বলল, “কোথায় আসতে হবে?”
জুই একটা পার্কের ঠিকানা দেয়।
কিন্তু ফারদিন আসেনি। জুই আক্ষেপ নিয়ে পার্কে বসে ছিল। এরপর আবারও ভার্সিটিতে দেখা, ক্যাম্পাসে সে হাতে গিটার নিয়ে বসে ছিল।
জুই সামনে এসে দাঁড়ালো। তার চোখে কোনো অভিমান নেই, অভিযোগ নেই। শুধু আছে সাধারণ একটি প্রশ্ন৷ সে প্রশ্ন করলো, “গিটারটি তোমার?”
ফারদিন বলল, “না। আমার হলে অন্তত ভালোভাবে বাজাতে পারতাম।”
এরপর জুই একদিন ফারদিনকে গিটার গিফট করে।
আশ্চর্য, গিটার পেয়েও ছেলেটির মুখের অভিব্যক্তি বদলালো না! তবে তাদের প্রেম হয়ে গেল। সেই প্রেমটাও যেন নামেই প্রেম। ফারদিন কোনো ব্যাপারেই আগ্রহী না। জুইয়ের খুব অভিমান হয়। কারণ সে-ই আগবাড়িয়ে সম্পর্ক গড়েছে।
জুই হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েছে। ফারদিন কিছুক্ষণ ঘুমন্ত জুইকে দেখলো। তারপর সিদ্ধান্ত নিলো জুইকে না জানিয়েই সে তার বাবা ফয়সাল সাহেবের কাছে যাবে। জুই জানলে রাগ করবে৷ কিন্তু ফারদিনের করার কিছু নেই।
নিঃসঙ্গ মানুষকে জীবন নিরুপায় করে দেয়। ফারদিন এখন টাকার জন্য নিরুপায়। সে গভীর শ্বাস নিয়ে জুইয়ের কপাল থেকে আলতো স্পর্শে চুল সরালো।
ফারদিন তার বাবার বাড়িতে আসার পর ফয়সাল সাহেব কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর কেঁদে ফেলে ছেলেকে বুকে জড়ালেন। বললেন, “আমি ভুল করেছি। অন্যায় করেছি তোর প্রতি। তোকে কখনও কাছে টেনে নিইনি।”
ফারদিন নির্লিপ্ত গলায় বলল, “এসব কথা থাক। আমার কোনো অভিযোগ নেই।”
ফয়সাল সাহেব ছেলের নির্লিপ্ততা দেখে আশ্চর্য হলেন। ব্যথিত হলেন। ফারদিনের সৎ মা, যে কিনা বয়সে ফারদিনেরও ছোট সেই মেয়েটি এসে ফয়সাল সাহেবকে নিঃসংকোচে চুমু খেলো। আর বলল, “তুমি তাড়াতাড়ি এসো, পার্টিতে সবাই অপেক্ষা করছে।”
“তুমি যাও, আমি পরে আসছি।”
» আরও পড়ুন: হেমন্তের রাত — নস্টালজিক মুক্তগদ্য
পাঁচ.
মেয়েটি চলে গেল। ফয়সাল সাহেব বললেন, “আমি খুব সুখে আছি রে। কিন্তু তোর অবস্থা খুবই খারাপ।”
“খারাপ কেন বলছো?”
“সেদিন বৃষ্টিতে দেখলাম তুই হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছিস।”
“বৃষ্টিতে হাঁটতে আমার ভালো লাগে।”
“পাগলামি করিস না বাবা। অনেক করেছিস, এবার বাস্তবে ফিরে আয়।”
“তা হয় না বাবা,” ফারদিন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কন্ঠে বলে, “আমার জগতটা এই সমাজের মতো কৃত্রিম নয়। তাই আমি এই সমাজের কেউ হতে চাই না।”
ফয়সাল সাহেবের আরও কিছু বলার ছিল।
ফারদিন সেসব না শুনেই কিছু টাকা হাতে বেরিয়ে পড়ে। ফয়সাল সাহেব বেশি পরিমাণে টাকা দিতে চাইছিলেন, ফারদিন নিলো না। কঠিন গলায় বলল, “আমার জন্য মায়া বাড়িও না!”
বাড়ি ফিরতে গিয়ে ফারদিনের হঠাৎ কী যেন মনে হলো। জুইয়ের কথা ভেবে সে নিজেকে দোষারোপ করলো। মনে মনে বলল, “এই মেয়েকে আমি কষ্ট ছাড়া আর কিছুই দিইনি।”
ফারদিন গভীর শ্বাস ফেলে দ্রুত পায়ে হাঁটতে থাকে।
জুই প্রায় তিন ঘন্টা অপেক্ষা করেও ফারদিনের খোঁজ পেল না৷ রাত দশটার কাছাকাছি। জুই বাইরে বেরুবার দরজা খুললো। কিছুক্ষণ একা খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে সে। ঘরে ঢুকবার সময় সে দেখে— তার পায়ের কাছে একটা চিরকুট পড়ে আছে। চিরকুটটা সে সহজভাবে তুলে নিলেও ভেতরের লেখা তার হৃদয়ে আঘাত হানে— ‘আমি চলে যাচ্ছি.. দূরে.. আমায় খুঁজো না। খুঁজে লাভ হবে না!’
(সমাপ্ত)
গল্পটা কেমন লাগলো? এই দুঃখের গল্প শুধুই দুঃখের ছিল না, ছিল ভালোবাসারও। আর ছিল অবহেলার কষ্টের গল্প। যেখানে একটি নিষ্প্রাণ চরিত্রের অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে, যা বাস্তব জীবনের অসহনীয় কষ্টের গল্প হয়ে উঠেছে। গল্পটি সম্পর্কে মতামত জানাবেন আশা করি!
গল্প: স্বপ্ন নেই
লেখা: বাপ্পী মাহমুদ
প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টাল ও ফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।



