গাজরের হালুয়া — ছোট গল্প

গাজরের হালুয়া — ছোটো গল্প

গাজরের হালুয়া — ছোটো গল্প। গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। এখানে স্মৃতিচারণমূলক গদ্যে উঠে এসেছে এক নারীর প্রতি লেখকের শিশু সময়ের স্মৃতিচারণ। এই লেখায় ফুটে উঠেছে লেখকের স্মৃতির মেঘ। যে মেঘ গাঢ় হতে হতে বৃষ্টির প্রারম্ভক্ষণ লিখে আনমনে। চলুন, পড়া যাক — গাজরের হালুয়া।

গাজরের হালুয়া | বাপ্পী মাহমুদ

এক.

তখন আমি এগারো বারো বছরের বালক। সারাদিন অনেক ব্যস্ত ছিলাম। স্কুল থেকে ফিরে কোচিং করলাম। ফেরার পথে পাড়ার কে যেন বলল, “আজ নিশি ভাবিকে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”

ক্লিনিকে কেন? প্রশ্নটা মাথায় এলেও আমি সেখানে দাঁড়ালাম না। হাঁটছি দ্রুত। বাসায় পৌঁছে পানি পান করব, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গেছে। কিন্তু বাসায় এসেও একই প্রসঙ্গ। এবার মা বললেন, “তোর নিশি ভাবির বাচ্চা হবে, দোয়া কর আল্লাহর কাছে।”

আমার অভিব্যক্তি কেমন ছিল সেটা আজ প্রায় বয়স ত্রিশে এসে মনে করতে পারি না।

তবে এটুকু মনে আছে, পাড়ায় তখন বাড়ির বাইরে একত্র হয়েছিল কমবেশি সবাই। নিশি ভাবির অবস্থা নাকি শরণাপন্ন। আমি এত কঠিন শব্দ তখন নতুন শুনছি — শরণাপন্ন। তাহলে কি নিশি ভাবি মারা যাচ্ছেন?

আমার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু কাকে প্রশ্ন করব? সবাই কত ব্যস্ত। আমার বড়ো বোন হঠাৎ পায়ে স্যান্ডেল না পরেই দৌড়ে গেল। তার চোখে পানি। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়েই দেখলাম সে দৃশ্য।

এমনি করে সন্ধ্যা নামলো।

দুঃসংবাদ প্রথম কে এনেছিল জানা নেই, তবে দেখলাম নিশি ভাবির ননদ ওরফে আমার আপুর বান্ধবী রিমি আপু কাঁদতে শুরু করেছেন। শুনতে পেলাম তিনি কাঁদতে কাঁদতেই বলছেন, “ওরা আমার ভাবিকে মেরে ফেলেছে!”

আমার বড়ো বোন উর্মি আপু নিজেও কাঁদছেন। আর স্বান্তনা দিতে গিয়ে আরও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছেন। আমি সেই শিশু বয়সে মৃত্যুটির সাক্ষী রইলাম। মৃত্যু কত নিকটে! ভাবির মুখটা তখন সেভাবে মনে পড়ছে না। কিন্তু তাকে প্রায়ই দেখতাম।

» আরও পড়ুন: পারাপার — বই রিভিউ

দুই.

ক্লিনিকের নাম হাসনাহেনা ক্লিনিক।

অনেকেই নিষেধ করেছিল বাচ্চা ডেলিভারি করতে এখানে যেতে। কিন্তু নিশি ভাবির প্রসব বেদনা ছিল আকস্মিক। তখন কাছে কোথাও নেবার তাড়ায় সবাই দু’কিলো দূরের হাসনাহেনা ক্লিনিকই পেল।

মৃত্যুর কিছুক্ষণ পর পাড়ায় সন্ধ্যা নামলো। আজকের সন্ধ্যাটা কেমন চুপিচুপি নামছে বলে মনে হলো। যদিও কান্নার শোরগোল ইতিমধ্যেই পড়ে গেছে। সন্ধ্যার আধারে সেই কান্না কেমন আধ্যাত্মিক লাগছিল আমার।

বারান্দায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। নিশি ভাবির লাশ এখনো ক্লিনিকে। ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই হইচই শুরু হয়েছে। শোনা যাচ্ছে সিজার করতে গিয়ে জরায়ু কাটতে গিয়ে সমস্যা হয়েছে। জরায়ুর আশেপাশে থাকা অন্ত্র না কী যেন কেটে ফেলায় আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে।

ছোটো থাকায় মৃত্যু রহস্য পুরোপুরি খোলাসা হলো না। আমরা ছোটরা একত্র হয়ে গম্ভীর মুখে বড়দের কথা শুনছিলাম। বড়রা প্রায়ই আমাদেরকে আড়াল করে নির্মম বাস্তব আলাপ জুড়ে দিচ্ছিলেন। আমাদের বলছিলেন, “তোমরা ছোট মানুষ, ভয় পাবে।”

আমার বাবা এই মৃত্যুর ঘটনায় বেশ হইচই করলেন।

তিনি বললেন একসময়, “হাসনাহেনার ডাক্তাররা সব কসাই!”
আস্তে আস্তে সময় গড়াচ্ছিল। মৃত্যুর হাওয়া চারদিকে চাদরের মতো বিছিয়ে পড়ছে। নিশি ভাবির পরিবারের লোকেরা আসতে শুরু করেছে। রাত নামছে। আর আমার মনে হলো হঠাৎ — আজকের রাতটা অন্যসব রাতের চেয়ে দীর্ঘ হতে চলেছে।

তিন.

“তোমরা কয় ভাইবোন?”
একদা নিশি ভাবি আমায় জিজ্ঞেস করেছিলেন প্রশ্নটি। আমি গম্ভীর স্বরে বললাম, “আমরা দুই ভাইবোন।”

আমি গম্ভীর হয়ে জবাব দিয়েছিলাম কারণ তিনি আগে থেকেই জানতেন আমরা দুই ভাইবোন। তবু প্রশ্ন করায় আমার কিঞ্চিৎ রাগ হলো। নিশি ভাবি আমায় তখন কোলে তুলে নেন। এটা তার মৃত্যুর এক বছর আগের ঘটনা।

আমাকে তখন কেউ সচরাচর কোলে নেয় না।

আমিও মনে করতাম অনেক বড়ো হয়ে গেছি। তাই নিশি ভাবির আকস্মিক এই কোলে নেওয়াতে আমি যেন কেমন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি। আমার গাল লজ্জায় লাল হয়ে যায়। সেদিকে যেন লক্ষ্য করে তিনি হাসেন। তার হাসিতে শব্দ হয়।

আর কী কারণ জানি না, সেদিন ওই হাসির জন্যই আমার নিশি ভাবির ওপর মায়া লাগলো। তিনি খুব সুন্দর হালুয়া বানাতেন — গাজরের হালুয়া। সেবার শীতকালে রমজান মাস পড়েছিল। তিনি একদিন আমাদের বাড়িতে এলেন ইফতার নিয়ে। ইফতারে কোনোকিছুরই কমতি ছিল না — তেলেভাজা বেগুনি, আলুর চপ, ছোলা, জিলাপি। আর সেইসাথে ছিল গাজরের হালুয়া।

আমার হালুয়ার রঙ এত পছন্দ হলো যে এটাকে খাদ্যের পাশাপাশি এক অসাধারণ শিল্প বলে মনে হলো। শিল্প মনে হবার কারণেই কিনা কে জানে খেতে মায়া লাগছিল। কারণ খেলেই তো ফুরিয়ে গেল। তবুও হালুয়া আমি মুছে খেয়ে শেষ করেছিলাম।

পরদিন আর ভাবির বাড়ি থেকে হালুয়া এলো না। তবে তাদের দেয়া ইফতারির বাটি ফেরত দেবার অজুহাতে আমি গেলাম ইফতারি নিয়ে। আমায় দেখে ভাবির সেকী খুশি। চোখ বড়ো বড়ো করে বললেন, “ওমা, লাজুক ছেলেটা এসেছে!”

» আরও পড়ুন: অন্ধকার পেরিয়ে — শিক্ষনীয় গল্প

চার.

সেদিন ইফতার ভাবিদের বাসাতেই সারলাম। মনটা শুরু থেকেই গাজরের হালুয়া খেতে চাইছিল। আমার বাসা থেকে ডালের বড়া, ছোলা, ডিমের চপ, মিষ্টি আর বেগুনি গেলেও ভাবির সেই অসাধারণ গাজরের হালুয়া ছিল না। ভাবির বাড়িতে অবশ্যি হালুয়া ছিল। আমি তৃপ্তি করে গাজরের হালুয়া খেয়ে ফিরলাম।

ভাবি সেদিন বললেন, “লাজুক ছেলেটা দেখি অনেক হালুয়া পছন্দ করে!”
কথাটা শুনে আমি যেন লজ্জায় খাবার টেবিলে মিশে যাচ্ছিলাম। আবার ভাবির রসিকতা ভালোও লাগছিল।

এ ঘটনার এক বছর পর সেই ভাবির মৃত্যু সংবাদ আমাকে যে তার থেকে কত দূরে নিয়ে গেল — সেটা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে না পারলেও কিছুটা অনুভব করতে পারছিলাম। আমি তখন বাসার বাইরে দাঁড়িয়ে। আমার পাশে আমার চেয়েও বয়সে অনেক ছোট একটা ছেলে — রিমি আপুর ভাগ্নে দীপু দাঁড়িয়ে ছিল।

দীপু আমায় দেখে কেন জানি হাত নাড়ে। আমি এগিয়ে যাই। দীপু ছোটো বলেই শোকটা বুঝতে পারছে না। দীপু তখন তার সাত বছর বয়সী কন্ঠে বলে, “আমার আন্নি(আন্টি) মারা গেছে, শুনেছেন?”

আমি তখন কী জবাব দিয়েছিলাম সেটা আজ আর মনে করতে পারি না।

তবে দীপুর সাথে তখন বেশ কথা হতে শুরু করলো। ও আমায় ‘মামা’ বলে ডাকছিল। এত অল্প বয়সে মামা হওয়ায় আমি যেন লজ্জায় পাচ্ছিলাম। তবু আমাদের মামা-ভাগ্নের বন্ডিংটা মজবুত হয়ে উঠেছিল। নিশি ভাবির মৃত্যুর পর শুক্রবারে মিলাদ হলো। দীপু মিলাদের পরও থাকল কিছুদিন।

পাঁচ.

একটু একটু করে সময় গড়াচ্ছিল। আর কী আশ্চর্য, ক’দিনের মধ্যেই পাড়ায় সবাই সাধারণ দিনের মত ব্যস্ত হয়ে গেল। কারও মুখ দেখে আর মৃত্যুর কথা মনে পড়ে না — সবাই স্বাভাবিক।

ছোট ছিলাম, তাই পরিবেশের হঠাৎ বদলে যাওয়া বুঝতাম না। কিন্তু তার ছাপ ঠিকই পড়তো মনে। আমিও লক্ষ্য করলাম দীপুর সাথে কথা বলার সময় রিমি আপুদের বাসায় এসে আমারও আর নিশি ভাবির কথা মনে পড়ছে না।

রিমি আপুকেও অনেকদিন পর হাস্যোজ্জ্বল দেখলাম।

নিশি ভাবির মৃত্যুতে রিমি আপুই কেঁদেছিলেন সবচেয়ে বেশি। তার কান্নাভেজা মুখটি এখনও রয়ে গেছে স্মৃতির রোমন্থনে।

তারপর…

আমি স্কুলের সেই ব্যস্ত ছেলেটি হয়ে উঠলাম। কোচিং শেষ করেই দ্রুত বাসায় খেয়ে দেয়ে আবার বিকেলে ক্রিকেট ম্যাচ। নিশি ভাবির মৃত্যুর দরুন কিছুদিন না খেলায় ঠিকমতো দৌড়াতেও হিমশিম খাচ্ছিলাম — বারবার হচ্ছিলাম রানআউট।

পাড়ায় সুন্দর দিন ফিরে এলো আমারও। আমিও ভুলে গেলাম নিশি ভাবিকে।

» আরও পড়ুন: অচেনা আতংক — শিক্ষনীয় থ্রিলার গল্প

ছয়.

দেখতে দেখতে আবারও রমজান মাস এলো।

আমারও রোজায় ধরলে মনে পড়ে যায় নরম গরম গাজরের হালুয়া। বিকেলে ইফতার বানানো লগ্নেই মায়ের আঁচল ধরে পিছু পড়ি। মা বিরক্ত হলেও বায়না ধরি — গাজরের হালুয়ার। কিন্তু মা আর বানায় না।

আজ নয়, কাল খাবি — কিন্তু সেই কালই থেকে যায় অনুপস্থিত। আমার ধৈর্য আর ধরে না।

“এত অস্থির হলে চলে?” মা হাসেন, “রোজা রমজান হলো সংযমের মাস। খাওয়া-দাওয়ার মাস না।”

আমি অভিমানী হয়ে পড়ি। কিন্তু বুঝতে পারি মায়ের ওপর অভিমান করে কাজ নেই। আচ্ছা, রিমি আপুদের বাসায় কি হালুয়া রান্না হয় না? দীপুটা গত বছর রমজানের মাঝামাঝিতে থাকলেও এবার আর আসেনি।

আমি তাই আর ওদের বাড়িতে যাবার অজুহাতও ফুরিয়ে ফেলেছি। তখনই রিমি আপু যেন একদিন মেঘ না চাইতেই জলের মতো ইফতার নিয়ে এলেন। আমি খুবই উত্তেজিত হয়ে ইফতারের আয়োজন দেখতে টেবিলে এলাম।

কিন্তু না… আজ আর নেই গাজরের হালুয়া। সবই আছে — শুধু হালুয়া নেই। আমার খুব মন খারাপ হলো। আর বুঝলাম এই হালুয়া শুধু নিশি ভাবিই বানাতেন। তিনি ছাড়া আর কেউ বানায়নি কখনো।

কে জানে, অন্য কেউ গাজরের হালুয়া বানালে সেটা কতটুকু তার হালুয়ার মতো সুস্বাদু হতো?


গল্প: গাজরের হালুয়া

লেখা: বাপ্পী মাহমুদ 

প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top