তুমি নেই কোথাও — ভালোবাসার গল্প

তুমি নেই কোথাও — ভালোবাসার গল্প

‘তুমি নেই কোথাও’— ভালোবাসার গল্প। গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। মূল গল্পে হাই স্কুলের দুটি ছেলে মেয়ের ভালোবাসা নিয়ে আবেগ, দ্বিধা আর দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে।

আমি চেষ্টা করেছি অল্প কথায় গল্পের মাধূর্য ফুটিয়ে তুলতে।

আমার লেখার ধরনটা আপনাদের কেমন লাগবে জানি না। তবে আমার চেষ্টা ছিল— গতানুগতিক লেখার ধরন থেকে বেরিয়ে নতুন ভাবে লিখবার।

তুমি নেই কোথাও | বাপ্পী মাহমুদ

এক.

কিছুদিন যাবৎ নীলুর মন অস্থির হয়ে আছে। অস্থিরতার কারণে কারও সাথে গুছিয়ে কথাও বলতে পারছে না। সেদিন ক্লাসে ফাহিম জিজ্ঞেস করলো, “ফিজিক্সে আজকের টপিকটা বুঝেছো?”

নীলু চমকে উঠলো।

চমকানোর কারণে তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হতে থাকে। সেটা নজর এড়ায় না ফাহিমের। সে অবাক চোখে নীলুর দিকে তাকায়। নীলু অপ্রস্তুত হেসে বলে, “আসলে.. ফিজিক্স আমার ভালো লাগে না।”
“আমারও না,” ফাহিম উৎসাহের সাথে একমত হয়, “বিশেষ করে ক্লাসে স্যার ভালো করে পড়ান না। এভাবে চলতে থাকলে..”

ফাহিম হাত নেড়ে কথা বলে যেতে থাকে। মূগ্ধ শ্রোতার মতো শুনতে থাকে নীলু। আর ভাবে একটা ছেলে মানুষ এত সুন্দর হয় কী করে?
ক্লাসে মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে নীলু। ফাহিমের সাথে যখন সে কথা বলে তখন অনেক ছেলে মেয়েই হিংসার চোখে তাদের দেখে।

কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে— তারা রাজযোটক। অথচ ফাহিম এসব নিয়ে ভাবেই না। তাকে দেখে মনে হয় আশেপাশে কে কী বলছে সে জানে না।

নীলুর মন অস্থির হবার কারণ হচ্ছে ফাহিম। ছেলেটার সবকিছুই তার ভালো লাগে। সেদিন সকালে নীলু ফাহিমের বাসা হয়ে স্কুলে যাচ্ছিল। ফাহিমের তখন মাত্রই ঘুম ভেঙেছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে দাঁতব্রাশ করছে।
দৃশ্যটা শুচিবায়ু নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু নীলুর কী হলো কে জানে, সে মনে মনে ভাবলো— আহা ছেলেটা কত সুন্দরভাবেই না দাঁতব্রাশ করছে! কী সুন্দর ফেনা মুখে!

ফাহিম এখনও হাত নেড়ে কথা বলে যাচ্ছে। নীলু হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছে। আর মনে আশংকা নিয়ে ভাবছে— ভালোবাসার কথা সে কীভাবে মুখে আনবে?

» আরও পড়ুন: নিভৃতের মায়ায় (দ্বিতীয় পর্ব) — ভূতের গল্প

দুই.

আজ নীলু একটা সিদ্ধান্ত নিবে। ঘরময় সে পায়চারি করতে শুরু করেছে। সিদ্ধান্তটা কোনোমতেই সে বদলাবে না। সে হাতে ফোন নিয়ে সময় দেখলো— রাত অনেক— তিনটার কাছাকাছি।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নীলু চায় এখনই ফাহিমকে ফোন দিতে। শুরুতেই সে বলবে, “আমি রাতজেগে তোমার সাথে কথা বলতে চাই।”

এরপরও কি ফাহিম তার ভালোবাসার ইশারা বুঝবে না?

নীলুর ঠোঁটে অজানা খুশিতে হাসি খেলে গেল। তার কিছুটা উত্তেজনাও হচ্ছে। ফাহিমকে ফোন দিতে গিয়ে টের পেল তার হাত কাঁপছে।

ফাহিম ফোন ধরে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল, “হ্যালো।”
নীলু সাথে সাথেই কিছু বলতে পারলো না। অনেক সময় পর বলল, “ফাহিম.. আমি সরি.. আসলে—”
ফাহিম বলল, “ইটস ওকে। রাখছি কেমন? বাই!”

নীলু পুনরায় কিছু বলবার আগেই ফাহিম ফোন রাখলো। নীলু অবিশ্বাসের চোখে ফোনের স্ক্রিনে তাকায়। তার চোখভর্তি পানি। এতটা দুঃখ পাবে সে নিজেও জানতো না।

দুঃখের সাথে সাথে তার রাগও হচ্ছে। ফাহিমটা এমন কেন? চাপা কষ্ট নিয়ে নীলু ঠিক করলো— সে কিছুদিন ফাহিমের সাথে কথা বলবে না। হাতের ফোনটাতে এখনও আলো জ্বলছে। ফাহিম কি একটিবার ফোন দিবে?
ভাবতে ভাবতেই ফোনের আলো নিভে গেল। সেইসাথে যেন নিভে গেল ভালোবাসার একটি সম্ভাবনা।

তিন.

ফাহিম তার বাইসাইকেলে চড়ে স্কুল যাবার পথে ক্লাসমেট রুহির সাথে দেখা হয়ে গেল। রুহিও প্রতিদিন বাইসাইকেল নিয়ে স্কুলে আসে। কিন্তু আজ তার সাইকেলের টিউব হঠাৎ লিক হয়ে যাওয়ায় সে হাঁটাপথে পা বাড়িয়েছে।

তাকে দেখে ফাহিম থামলো। বলল, “কী ব্যাপার মহারাণী? খবর ভালো?”
“হুম,” রুহি মাথা নাড়লো, “রিকশা পাচ্ছি না। বাদ্ধ হয়েই হাঁটতে হচ্ছে।”
“আমার সাইকেলের সামনে বসতে পারো। যদি তোমার আপত্তি না থাকে।”

রুহি জবাব না দিয়ে হাসলো। আর ফাহিম বুঝলো— এটা সম্মতির হাসি।
রুহিকে সাইকেলে বসিয়ে ফাহিম প্যাডেল দিতে থাকে। কিছুদূর যেতেই দৃশ্যটা দেখে নীলু। এম্নিতেই গতরাতের দুঃখটা সে ভুলতে পারেনি। তারওপর এই দৃশ্য। একটা মানুষ দুঃখ পেতে শুরু করলে বারবার দুঃখ পেতেই থাকে। নীলুর ক্ষেত্রেও এই আপ্তবাক্যটি সঠিক।

সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো।

আকাশে তখন মেঘের ঘনঘটা। লোকজন দ্রুত ছুটে চলেছে। তখনই দমকা হাওয়ার সাথে সাথে মুষলধারে বৃষ্টি নামলো। নীলু চুপচাপ দাঁড়িয়ে সেই বৃষ্টিতে। তার চোখের পানি মিশে গেছে বৃষ্টির পানিতে।
বৃষ্টিভেজা হয়ে নীলু একটা রিকশা ডেকে বাড়ি ফিরলো। বারান্দায় নীলুর মা দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি অবাক চোখে তাকালেও নীলু কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢোকে।

নীলুর মা বুঝতে পারেন— তার মেয়ে ভালো নেই। দুপুরে নীলু খেতে এলো না। মা ঘরে এসে দেখেন— নীলু বাতি নিভিয়ে শুয়ে আছে। তিনি নীলুর মাথায় হাত রাখতেই দেখেন— জ্বরে ওর গা পুড়ে যাচ্ছে।
“একী কান্ড নীলু,” মা তার মেয়ের প্রতি মায়া অনুভব করেন।
“মা,” নীলু তার মাথা মায়ের কোলে আনলো, “আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও না।”

» আরও পড়ুন: নিভৃতের মায়ায় (প্রথম পর্ব) — ভূতের গল্প

চার.

তিনদিন ধরে নীলুর জ্বর চললো।

তার স্কুলে যাওয়া হলো না। দুই একজন বন্ধু নীলুর খোঁজ নিতে এলো। নীলু এর মাঝে ফাহিমের জন্যও অপেক্ষা করলো। কিন্তু সে এলো সবার শেষে।
“নীলু,” ফাহিম একটু আর্দ্র কন্ঠে বলল, “তুমি কি আমার ওপর রেগে আছো?”

নীলু যেন এরকম প্রশ্নেরই অপেক্ষায় ছিল। সে ছলছল চোখে তাকায়। ফাহিম তার হাতে থাকা একটি খাতা নীলুর দিকে এগিয়ে দেয়। খাতাটি নীলুর— ফিজিক্সের নোট লেখা আছে।
ফাহিম নোটটি ফেরত দিলো। আর নীলুরও মনে পড়লো— নোটটিতে একটা চিরকুট ছিল। ফাহিম কি চিরকুটটি পায়নি?

তার অনেক রকম চিন্তা হতে থাকলো। হয়তো ফাহিম চিরকুটের লেখাটা পড়েছে, কিন্তু ভান করছে— কিছুই হয়নি। নীলু সংকোচ ভুলে ফাহিমের চোখে তাকালো। চারিদিকে তখন নিঃশব্দ বিচরণ করছে। ফাহিম তখন জোরে একটা শ্বাস ফেলে। বলে, “আমি আসছি, কেমন?”

নীলুর ইচ্ছে হলো বলে, “না, তুমি কোথাও যেতে পারবে না। তুমি আমার। শুধুই আমার!”
নীলু অবশ্যি তা করলো না। বলল, “চা খেয়ে যাও।”
ফাহিম চুপচাপ হাসলো। নীলু সত্যিই চা আনে। দুজনে চা নিয়ে বারান্দায় বসে আছে।

ফাহিম তখন কথা শুরু করে, “নীলু!”
নীলুর ভেতরে ধাতব ঝংকার বেজে ওঠে। ভালোবাসার অজানা সম্ভাবনা যেন উঁকি দিচ্ছে!
ফাহিম চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করে বলে, “আমি শুরু থেকেই জানি— তুমি আমায় ভালোবাসো। কিন্তু আমি তোমায় ভালোবাসতে পারব না।”

কথাটি শেষ করে ফাহিম তাকালো। নীলুও তাকিয়ে ফাহিমের চোখে। ফাহিম আবার বলতে শুরু করলো, “তুমি আমার ভালো বন্ধু।”
নীলুর চোখে এবার পানি চলে আসে।
ফাহিম তা দেখেও না দেখার ভান করে। বলে, “আমি বন্ধুত্বটা নষ্ট করতে চাই না। আমি জানি, তুমিও চাও না।”

নীলু ভেজা গলায় বলল, “আমার চাওয়া বা না চাওয়াতে কিছু কি যায় আসে তোমার?”
ফাহিম কিছু বলল না। অভিমানী নীলুকে সে কাঁদতে দেখলো— সশব্দের কান্না।

পাঁচ.

আজকেও ফাহিম স্কুলে যেতে গিয়ে রুহিকে রাস্তায় দেখলো। রুহিও ফাহিমকে দেখে হাঁটা থামায়। হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে। ফাহিম বুঝতে পারে— রুহির মনের ভাষা।
কিন্তু সে কোনোদিকে না তাকিয়েই সাইকেল নিয়ে চলে যায়। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে কেবল রুহি।

স্কুলে এসে ফাহিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

ক্লাসে আজ নেই নীলু। শুধু আজ নয়, পনেরোদিন হলো সে নেই। চলে গেছে শহর ছেড়ে দূরে কোথাও, দূরের কোনো স্কুলে। যাবার আগে একদিন ফাহিমের বাসায় আসে। ফাহিম তার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

নীলু বলেছিল, “তুমি কি পারতে না আমায় ভালোবাসতে?”
“পারতাম,” ফাহিম তাকায়, “কিন্তু পারিনি..”
ফাহিম কথাটি শেষ করেছিল খুব ধীরে। তারপর দুজনে বেশকিছুক্ষণ নীরব। একটু পর ফাহিমই কথা শুরু করে, “ভালোবাসা শুধু একটা অনুভূতি না, দায়িত্বও। কিন্তু আমি নিজেকে এখনও চিনতেই পারিনি।”

নীলুর ঠোঁটের কোণে হাসি দেখা গেল। কিন্তু ফাহিম লক্ষ্য করলো তার চোখ কাঁপছে— সেখানে পানি। নীলু বলল, “তুমি এত সুন্দর করে তোমার দায়বদ্ধতা জানালে যে, আমি রাগের সুযোগটাও পেলাম না।”
“আমায় ভুল বুঝো না—”
নীলু হাতের ইশারায় থামালো, ফাহিমকে তার কথা শেষ করতে দিলো না। তারপর বলল, “আমি যাচ্ছি। এ শহর ছেড়ে। হয়তো তোমার জীবন থেকেও। এখানে থাকলে প্রতিদিন নিজেকে ছোট হতে দেখব।”

ফাহিমের আর কিছু বলার ছিল না। কিন্তু সে প্রাণপণে চাইছিলো নীলু থাকুক। বন্ধু হয়ে আজীবন থাকুক। তবে নীলুকে আটকানোর সে কে? তার কী অধিকার আছে?

নীলু চলে গেল। দূরে.. অনেক দূরে। ফাহিম এখন নিঃশব্দে স্কুল আসে, ক্লাস করে। কিন্তু তার মন অন্য কোথাও। হাইয়ার ম্যাথের সমীকরণ অংকে বারবার তার ভুল হয়। সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। আর বুঝতে চেষ্টা করে— নীলুকে ফিরিয়ে দিয়ে সে ভুল করেছে কিনা।

» আরও পড়ুন: সন্দেহ — কষ্টের গল্প

ছয়.

আর নীলু?

নতুন শহরটা তার ভীষণ পছন্দ হলো। সেখানকার ছেলেমেয়েরাও আন্তরিক। স্কুলে সে ব্যস্ত থাকার যথেষ্ট চেষ্টা করে। এখানে একটা ছেলে নীরবে তাকে পছন্দ করে। কিন্তু কখনও মুখে কিছু বলে না।
লাজুক সেই ছেলেটি ক্লাসে নীলুর কাছাকাছি বসার জন্য প্রতিদিনই স্কুলে তাড়াতাড়ি আসে। নীলু সব দেখে। ভালোবাসার প্রতি ছেলেটির নীরব আবেগ তাকে মূগ্ধ করে।

ঠিক যেমনি মূগ্ধ করেছিল ফাহিম নামের একটি ছেলে। ফাহিমের হাত নেড়ে কথা বলা তার এখনও মনে পড়ে। তবে ভালোবাসার ক্ষেত্রে ছেলেটির প্রতি সে ফাহিমের মতো হতে চায় না।

নীলুর স্কুলের ছেলেটি যদি তাকে প্রপোজ করে, নীলু তাকে ফিরিয়ে দেবে না। সেও নীরবে ছেলেটার অনুভূতি জানার জন্য অপেক্ষা করে।
ক্লাসে নীলু জানালার পাশে বসে। জানালা দিয়ে প্রকৃতি দেখে। স্যারের দেয়া অংকের সমীকরণও মেলায়।

সবদিন সমীকরণ মেলে না।

আজ যেমন মিলছে না। সে অনেক কাটাকুটি করছে, এদিকে ক্লাস শেষ হতে আর মাত্র দশ মিনিট বাকি। এসময় কেউ বলল, “এক্সকিউজ মী!”
নীলু চমকে তাকায়। দেখে, সেই নীরব ছেলেটি দাঁড়িয়ে। আজ সে লজ্জা ভুলে অনেক কনফিডেন্স নিয়ে বলে, “আমি কি তোমায় সাহায্য করতে পারি?”

নীলু জবাব দেয় না। তবে হাসিমুখে খাতা এগিয়ে দেয়। আর ছেলেটিও অংক কষতে শুরু করে। নীলু মূগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে— এভাবে ছোট ছোট দায়িত্ব পালন করেও ভালোবাসা যায়।

ছেলেটির অংক শেষ। নীলু বলল, “থ্যাংকস।”
ছেলেটি বলে, “আমার নাম রায়ান।”
“তোমার সাথে পরিচিত হয়ে খুব ভালো লাগলো রায়ান।”

রায়ান অল্প হেসে তার বেঞ্চে ফিরে যায়। আর নীলু জানতো— একটা সুন্দর ভালোবাসার গল্পও শুরু এখান থেকেই।


গল্প: তুমি নেই কোথাও

লেখা: বাপ্পী মাহমুদ 

প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top