নিভৃতের মায়ায় (দ্বিতীয় পর্ব) — ভূতের গল্প

নিভৃতের মায়ায় (দ্বিতীয় পর্ব) — ভয়ংকর ভূতের গল্প

‘নিভৃতের মায়ায়’— ভয়ংকর ভূতের গল্প। গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। আজ গল্পটির দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হচ্ছে। চলুন, শুরু করা যাক।

নিভৃতের মায়ায় | বাপ্পী মাহমুদ

এক.

জিনোর বাবার বলে যাওয়া কথাগুলো আমার কানে বাজছিল। ভদ্রলোকের নাম ফয়সাল হোসেন। তার সাথে আমার দ্বিতীয়বার দেখা হয়নি। আমি নিজের ব্যক্তিগত ডায়রি বের করলাম। সেখানে আজকের তারিখটা লিখলাম— ১০ ডিসেম্বর। কিছু বিষয় আমি পয়েন্টে পয়েন্টে নোট করতে চাই, যা আমায় ভাবাচ্ছে।

প্রথম ব্যাপার, জিনোর মা ভ্যাম্পায়ার। তাকে আমি চিনি না।

দ্বিতীয় ব্যাপারও এই ভদ্রমহিলাকে নিয়ে। তিনি আমেরিকান এবং একইসাথে ভ্যাম্পায়ার।

তৃতীয় ব্যাপার, জিনো নিজেও সংগত কারণে ভ্যাম্পায়ার। তবে তার উদ্দেশ্য কী? শহরে যেসব মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে জিনোই তাদের হত্যাকারী। কিন্তু সে কেন মানুষদের হত্যা করছে?

 

তিন নম্বর পয়েন্টের দিকে তাকিয়ে থেকে আমি পয়েন্টটি কেটে দিলাম। জিনো কেন হত্যাগুলো করেছে তা মনে হয় আমি জানি। তার রক্তের প্রয়োজন। তাই সে দুষ্ট মানুষদের হত্যা করছে।

“কী লিখছো?”
কথাটি শোনামাত্র বিস্ময়ে ঘাড় ঘুরাবার আগেই ঘাড়ের কাছে গরম নিঃশ্বাস টের পেলাম। তাকিয়ে দেখি— জিনো দাঁড়িয়ে আছে। আমি মাথায় হাত চেপে বলি, “তুমি? তুমি আমার বেডরুমে!”

জিনো সহজ ভঙ্গিতে হাসলো।

আমার তখন তার সাথে কোনো কথায় বলতে ইচ্ছে করছিল না। তবু বললাম, “কেমন আছো?”

» আরও পড়ুন: নিভৃতের মায়ায় (প্রথম পর্ব) — ভূতের গল্প

দুই.

জিনোর সাথে অনেক কথা হলো। কিন্তু আমার এলোমেলো ভাব দূর হলো না। সে চলে গেল। আমিও বেডরুমের দরজা খুলে বের হলাম। আর বাবা তখন আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

আমাকে তার পাশ কাটিয়ে যেতে দেখে তিনি বললেন, “তোমার মা তোমার জন্য পিৎজা অর্ডার করেছেন।”
আমি জানি, বাবা-মা আমার মন ভালো দেখতে চান। কিন্তু আমি এখন ক্লান্ত। জীবনে প্রথম কাউকে ভালোবাসলাম। অথচ সে মানুষ না, ভ্যাম্পায়ার।

আমি বেসিনের সামনে এলাম। আমার গোলাকৃতি মুখটা কেমন লম্বাটে দেখাচ্ছে। স্পষ্টতই ঘুম না হবার ফল এটা। শুনেছি ভ্যাম্পায়াররাও ঘুমায় না। ঘুমহীন জগতটা কেমন?

মুখে পানি ছিটালাম।

বাবা তখনও দাঁড়িয়ে। আমার মায়াই হলো। বললাম, “বাবা!”
“বল মা।”
“আমি ভালো আছি। আমায় নিয়ে ভেবো না।”

বাবা কিছু বলতে চাইছিলেন, আমি সে সুযোগ না দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়লাম। আর অজান্তেই দরজাটা শব্দ করে লাগিয়ে দিই।

এখন অনেক রাত। আমার চোখে ঘুম নেই। আমি জিনোর জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু সে এলো না। তবে সে যাবার আগে বলে যাওয়া কথাগুলো আমায় ভাবাচ্ছিল।

» আরও পড়ুন: সন্দেহ — কষ্টের গল্প

তিন.

“আমার মা চাইলে এই ঝিনাইদহ শহরকে তুচ্ছ করে ফেলতে পারেন,” জিনো বলেছিল, “তিনি ভয়ংকর রাগী।”
আমি জিনোর চোখে ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি দেখছিলাম, কিন্তু ওর গলার স্বর ছিল রুক্ষ। এই প্রথম তার গলার স্বর চিকন ছিল না।

জিনো বলে চলে, “আমার মাকে কোনো ছিনতাইকারী আঘাত করেনি, যারা আঘাত করেছিল তারা সাধারণ মানুষ।”
আমি ভীষণ অবাক হয়ে বলি, “কী বললে?”
“সেদিনও মা রক্তের অনুসন্ধানে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু স্রষ্টা হয়তো তার ওপর নারাজ ছিলেন। তাই তিনি মানুষদের হাতে মার খেলেন। ভর্তি হলেন হাসপাতালে।”
আমি বিস্ময়ের মতো শব্দ করলাম, এসব ভয়ংকর রূপকথার মতো শোনাচ্ছিল।

“আমার মায়ের নাম র‍্যাচেল স্টোন। তিনি মানুষের প্রতি নির্দয় নন। আমার মতো করে তিনিও মানুষকে ভ্যাম্পায়ারের সমকক্ষ কেউ মনে করতে চান। কিন্তু তার সহ্য ক্ষমতা কম। গভীর রাতে তিনি শিকারী হয়ে যান। আর সাধারণ মানুষ মরতে থাকে। তিনি রক্ত খেয়ে তৃপ্ত হন। তাই আমার মা একজন মনস্টার।”

জিনো আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিল। আমি কি তখন স্বান্তনা দিতে পারতাম না? জিনোর দিকে তাকিয়ে দেখি সে ততক্ষণে খোলা জানালা দিয়ে চলে গেছে। আমি আমার দোতলা ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি— চারদিকে শুনশান নীরবতা।

» আরও পড়ুন: হেমন্তের রাত — নস্টালজিক মুক্তগদ্য

চার.

রাত কেটে ভোর হলো। ঘড়িতে সময় ছয়টার কাছাকাছি। এত ভোরে বহুদিন পর ঘুম ভাঙলো। শীতের শুরু। তবু কম্বল সরিয়ে উঠে বসি। গতরাতে আড়াইটার সময়ও জেগে ছিলাম। তবু এত তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙবে কে জানতো।

ডায়রিটা আবার হাতে নিলাম।

কেটে দেওয়া তিন নম্বর পয়েন্টের নিচে লিখলাম— জিনোর মায়ের নাম র‍্যাচেল স্টোন। তিনি একজন মনস্টার। সাধারণ মানুষকে হত্যা করায় তার কাজ।
এটা লিখবার পর আমার মাথায় একটা প্রশ্ন উঁকি দিলো— র‍্যাচেলের হাত থেকে যারা বেঁচে গেছে তারা কেন প্রকাশ করছে না র‍্যাচেল একজন ডাইনি বা মনস্টার?

প্রশ্নটি আমাকে দারুণভাবে নাড়া দিয়ে যাচ্ছিল।

সেইসাথে র‍্যাচেলের জন্য অদ্ভুত মায়াও হচ্ছিল। বেচারি যেই হোক, সে তো নিজ ইচ্ছায় মনস্টার হয়নি। ঠিক এসময় কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে আমি চমকে উঠি। দরজা খুলতেই নীলা ভেতরে ঢুকে পড়ে।

এত ভোরে এসেও তার চোখমুখ নির্বিকার। নীলা বলল, “আংকেল আন্টি জেগে নেই আশা করি।”
“না।”

নীলা আমার হাত ধরে বেডরুমে নিয়ে গেল। বলল, “জিনোর সম্পর্কে আমি অনেক কিছু জানি, তোকে বলতে চাই।”
“ওর সম্পর্কে তুই কী জানবি?” আমি প্রসঙ্গ এড়াতে চাই, “ও তো সাধারণ মানুষ।”
“না,” নীলা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, “ও মানুষ নয়।”

এবার আমিও গম্ভীর হলাম। বুঝলাম, মিথ্যা বলে পাশ কাটানো যাবে না।

» আরও পড়ুন: লেখক হবার পথে — সফলতার শিক্ষণীয় গল্প

পাঁচ.

নীলা বলে চলল, “জিনো শুধু ভ্যাম্পায়ারই নয়, ভয়ংকর ভ্যাম্পায়ার। সে সব ধরনের মানুষের রক্ত শুষে নেয়। কিন্তু প্রকাশ্যে আসে কেবল দুষ্ট লোকেরা। বাকিদের সে লুকিয়ে রাখে।”

আমি বললাম, “তুই এত নিশ্চিত কীভাবে?”
নীলা জবাব না দিয়ে তার ফোন বের করে। আর কিছু ছবি দেখায়। একটা ছবিতে রক্তহীন একটা চুপসে যাওয়া মানুষের মৃতদেহ। পরের ছবিতে পানিতে সেই মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়ার চিত্র। যে ব্যক্তি ভাসিয়ে দিচ্ছে, সে আর কেউ না— জিনো ওয়াটসন।

ভয় ও কৌতূহলে আমার মুখ পাংশুবর্ণ ধারণ করলো।

আমি নীলাকে বললাম, “কিন্তু এসব তুই কিভাবে জানলি?”
নীলা তার জবাব না দিয়ে বলল, “যে সকল লোকেদের হাতে জিনোর মা র‍্যাচেল মার খেয়েছে, তারা কেউ সাধারণ মানুষ ছিল না।”

আমি এবার নীলার সাথে একমত হতে পারলাম না। কারণ জিনো নিজে বলেছে ওরা সাধারণ মানুষ ছিল। আত্মরক্ষার জন্য র‍্যাচেলকে মেরেছে। নীলাকে সে কথা জানালে সে হেসে ফেলে। বলে, “তাই? সাধারণ মানুষ হলে একজন ভ্যাম্পায়ারকে কিভাবে মারতে পারে?”

নীলার প্রশ্নটি আমায় ভাবালো। আমি আবার কৌতূহল বোধ করি। জিজ্ঞেস করি, “তুই এতকিছু জানিস কীভাবে?”
“কারণ র‍্যাচেলকে যারা মেরেছিল তারা আমারই পূর্বপুরুষ— তারা সবাই নিজেরাও ভ্যাম্পায়ার।”
“নীলা!” আমি চমকে উঠি, “তুইও ভ্যাম্পায়ার?”

নীলা জবাব দেয় না, কিন্তু তার চিবুকের গোড়ায় খেলে যায় ধারালো হাসি। আর সে বলে, “জিনোকে বিশ্বাস করিস না, সে বিশ্বাসের যোগ্য নয়।”

(চলবে…)


গল্প: নিভৃতের মায়ায়

লেখা: বাপ্পী মাহমুদ 

প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top