নিভৃতের মায়ায় (প্রথম পর্ব) — ভূতের গল্প

নিভৃতের মায়ায় (প্রথম পর্ব) — ভূতের গল্প

‘নিভৃতের মায়ায়’— ভূতের গল্প। গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। এই গল্পটিতে স্নেহা নামের একটি মেয়ের অদ্ভুত প্রেমের গল্প ফুটে উঠেছে। প্রেমের হলেও গল্পের মূল জনরা ভূতের। আজ গল্পটির প্রথম পর্ব শেয়ার করছি। গল্পটি সম্পূর্ণ পড়ার অনুরোধ নিয়ে শুরু করি, চলুন।

নিভৃতের মায়ায় | বাপ্পী মাহমুদ

এক.

শহরের পায়রা চত্ত্বর মোড়ে নতুন রেস্টুরেন্টে একটি ছেলেকে ভালো লেগে গেল আমার। ঝিনাইদহ ছোট শহর, তাই বারবার মনে হতে লাগলো ছেলেটিকে আগে কোথাও দেখেছি। সান্ধ্যকালীন সময়ে রেস্টুরেন্টে কফি খেতে খেতে এ নিয়ে আমি ভাবছিলাম। তখন আমার বন্ধু নীলা ডাকলো, “এই স্নেহা!”

আমি ডাক শুনে তাকালাম। নীলা ছেলেটির পাশেই দাঁড়ানো। দুজনে কথা বলছে। আমার মনে হলো এটাই সুযোগ— ছেলেটার সাথে কথা বলবার। কিন্তু আমি ছেলেটাকে এত গুরুত্ব দিচ্ছি কেন? বারবার মনে হচ্ছে তার নামটা জানতে পারলে আমি শান্ত হবো।
নীলা আমাকে কাছে পেয়ে বলল, “ছেলেটা কী হ্যান্ডসাম, না?”

আমি জবাব না দিয়ে ছেলেটার দিকে তাকালাম। যা ভেবেছি তাই হয়েছে— ছেলেটা লজ্জায় আর কোনোদিকে তাকাতে পারছে না, মাথা নিচু করে আছে।
ঠিক এসময় আমার মনে হলো, ছেলেটি নিশ্চিত ইন্ট্রোভার্ট। নীলা চোখের ইশারায় আমার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচালো। আর আমার মনে পড়ল কিছুদিন আগেই নীলাকে বলেছিলাম যে, এ শহরের কোনো ছেলেই আমার মনের মতো না।

কিন্তু কে জানতো আমার গল্পটা কোনো সাধারণ গল্প না— ভূতের গল্প।

তবে এই ছেলেটিকে প্রথম দেখাতেই এত ভালো লেগে গেল কেন? নীলা কোন ফাঁকে আমায় একা রেখে চলে গেছে ঠিক বলতে পারি না। এখন ছেলেটি আর আমি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আমি বললাম, “আপনার নামটা কি জানতে পারি?”
ছেলেটি আন্তরিক গলায় বলল, “অবশ্যই! আমি জিনো ওয়াটসন।”

আমার মনে হলো আমি ভুল শুনছি।

জিনো ওয়াটসন নামটি নিশ্চিত হতে আমি নিজেও বললাম, “জিনো ওয়াটসন?”
“জ্বী,” ছেলেটি নিঃসংকোচে বলল, “আমার মা আমেরিকান। তাই নামটা বিদেশি ধরনের।”
“ও আচ্ছা,” আমার কাছে এখন নামটা চমৎকার লাগছে, “আপনি কি খুব কম কথা বলেন?”
জিনো এ কথার জবাব দিলো না, হঠাৎ বলল, “আপনার সাথে আমার আবার দেখা হবে।”

এরকম কথা শুনে আমি ঈষৎ অবাক হলাম। ভূতের গল্প পড়ার মতো একটা অদ্ভুত শিহরণ হলো।

তখনই নীলা আচমকা আমার কাঁধে হাত রেখে আমায় চমকে দিলো। আমি নীলার দিকে তাকালাম। নীলা বলল, “কেমন?”
আমি সেকথার জবাব না দিয়ে পুনরায় ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকালাম। কিন্তু ছেলেটা তখন আর নেই। জিনো নামের ছেলেটিকে রেস্তোরাঁর লোকালয়ে আর খুঁজে পেলাম না।

» আরও পড়ুন: সন্দেহ — কষ্টের গল্প

দুই.

ছেলেটিকে আবার দেখলাম।

ইউনীভার্সিটি যাবার জন্য বাসে উঠেছি, মাঝের সীটে চুপচাপ গিয়ে বসলাম। তখন আমার বামদিকে জানালার পাশে বসা এক ছেলে বলে, “কেমন আছো?”

আমি চমকায়। ছেলেটি হুডি পরে আছে। ভূতের গল্প পড়ার সময় এরকম হুডি দেখা যায়। হুডিতে মাথা ঢাকা থাকায় তাকে চিনতে পারছি না। তবে গলার স্বর জিনোর মতই স্পষ্ট ও চিকন। ছেলেটি মাথা থেকে হুডি নামালো।
বলল, “আমরা একই ইউনীভার্সিটির, তবে আমি তোমার থেকে এক ইয়ার সিনিয়র।”
আমার তখনও সম্বিৎ ফেরেনি, কেমন ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে আছি। এই প্রথম লক্ষ্য করলাম— জিনোর চোখের মনি নীল।

সে বলল, “স্নেহা, তুমি এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারো না। লোকে ভাববে তুমি আমার প্রেমে পড়েছো।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতে চাইলাম— তার চোখ নীল কেন। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলালাম।
জিনো কোনো কারণ ছাড়াই হাসছে। আর তার হাসিটা যেন বলে দিচ্ছে— সামনে আরও বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে— ঠিক যেন ভূতের গল্প।

বাস চলছে।

আমরা দুজন পাশাপাশি বসে আছি। আমার মনে অনেক প্রশ্ন জড় হয়েছে। জিনো ওয়াটসনকে ভালো লাগতেও শুরু করেছে। হঠাৎ আমার মনে হলো— জিনো বুঝি আমার অনুভূতি সম্পর্কে সব জানে।

» আরও পড়ুন: হেমন্তের রাত — নস্টালজিক মুক্তগদ্য

তিন.

ভার্সিটিতে জিনোর সাথে প্রায়ই দেখা হয়। বেশিরভাগ সময় ক্যান্টিনে। আজ ক্যান্টিনে সে সানগ্লাস পরে বসে ছিল। আমি তার টেবিলের দিকে যাচ্ছিলাম, সে সেটা টের পেয়ে উঠে চলে গেল।
আমি থমকে দাঁড়ালাম, অপমান বোধ করলাম।

ছেলেটা এমন করলো কেন?

আমার তখন মনে হলো, আমি জিনোকে ভালোবেসে ফেলেছি। এটা হঠাৎ নেয়া সিদ্ধান্ত নয়। অনেকদিনই তো তাকে দেখছি, অল্প অল্প করে অনেক অনুভূতি জমে গেছে। জিনো সত্যিই ইন্ট্রোভার্ট। ভূতের গল্প পড়ার সময় এরকম ইন্ট্রোভার্ট প্রায়ই দেখা যায়। সে কি ভূত? ভেবে হাসিই পেল।

তবে তার কিছু ব্যাপার ভালো লাগতো। তন্মধ্যে কোথাও আড্ডা হলে সে আগ্রহ নিয়ে লোকের কথা শোনে।

তার চোখের কৌতূহলে থাকে বিস্ময়, যা জিনোর ব্যক্তিত্বকে সুন্দরভাবে ছড়িয়ে দেয়। সে কম কথা বললেও যখন কথা বলে তখন সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে থাকে। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি সে জোরে কথা না বলেও স্পষ্ট কথায় সবাইকে মূগ্ধ করে রাখে।

কিন্তু প্রেমে পড়ার জন্য এটুকু তো যথেষ্ট নয়। আমি জানি সেটা। আমি সেদিন থেকেই জিনোর প্রতি দুর্বল, যেদিন সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হেসেছিলো। হাসিটা অন্যরকম। আহ্বানের হাসি। এখন আর তাকে ভূতের গল্প পড়ার মতো অনুভূত হয় না।

আমি আকর্ষণ অনুভব করেছিলাম।

কিন্তু জিনো তখন থেকেই আমায় এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে, যখন আমি নিজেই তার প্রতি দুর্বল। আমি ভেবে পাচ্ছি না, কীভাবে আমাদের প্রেমের গল্প শুরু হবে।

সেদিন সন্ধ্যায় ভার্সিটির বাসে চড়ে বাসায় ফিরছি। নীলা আমার পাশে বসে আছে। সে বলল, “তোদের রিলেশন কেমন চলছে?”
“চুপ কর!”
“আজব, রাগ করছিস কেন?”
“জিনো আমায় পাত্তা দেয় না।”

এই সামান্য কথা বলতে গিয়ে আমার চোখ পানিতে ভরে উঠলো। আর সত্যিই আমি ফুপিয়ে কেঁদে উঠি। নীলা তার একটা হাত স্বান্তনা স্বরূপ আমার পিঠে রাখে। আর আমি অনুভব করি যেন আমাদের গল্পটা নিছক ভূতের গল্প। জিনো সত্যিই একটা ভূত। ভয়ংকর ভূত!

দিনকে দিন আমার অস্থিরতা বাড়তে থাকে। ওদিকে জিনোর কোনো খোঁজ নেই। আমি একা একা গভীর ক্ষতের মতো ব্যথা অনুভব করি। আমার বাবা একদিন জিজ্ঞেস করেন— কী হয়েছে?

আমি তখনও কেঁদেছি। কিছু বলতে পারিনি। বাবা সেদিন রাতেই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে ফোনে আলাপ করলেন।

» আরও পড়ুন: লেখক হবার পথে — সফলতার শিক্ষণীয় গল্প

চার.

ইউনীভার্সিটিতে জিনোকে আর দেখি না। কৌতূহল নিয়ে সেই রেস্টুরেন্টেও গেলাম, যেখানে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। তখন সন্ধ্যা। আমি জিনোকে চুপিচুপি খুঁজলাম, সে নেই! সে কি সত্যিই ভূতের গল্প হয়ে এসেছিল জীবনে?

আমার কষ্ট বাড়তে থাকে।

রেস্টুরেন্ট থেকে ফিরছি, আচমকা একটা গলিপথে কেউ আমার হাত ধরে টান দিলো। আমি চিৎকার করবার মুহূর্তে মুখটা চেপে ধরলো। তাকিয়ে দেখি— এটা জিনো ওয়াটসন। আমি হতবুদ্ধিকর হয়ে ওর হাত পাগলের মতো দ্রুত ছাড়িয়ে নিই। তারপর ওর অভিমুখে দু’কদম এগিয়ে যাই।

জিনো পেছন থেকে ডাকে, “স্নেহা।”
আমি প্রত্যুত্তরে কিছু বলি না। আজ আমি কিছুই বলতে চাই না। শুধু জানতে চাই। জিনো কেন এত রহস্য করে— জানতে চাই। কারণ বাস্তব জীবনটা ভূতের গল্প নয়।

“তোমাকে আমার অনেক কথা বলবার আছে।”
আমি বিরক্ত হয়ে বলি, “তোমার কন্ঠস্বর অপরাধীর মতো শোনাচ্ছে। যেন তুমি রক্ত পিপাসু ভ্যাম্পায়ার।”
“যদি বলি তোমার অনুমানই সত্যি।”
“হাহ,” আমি হতাশার মতো শব্দ করলাম, “আমাকে বাচ্চা মেয়ে মনে হয় তোমার?”
“না,” জিনো মাথা নাড়লো, “শোনো, আমি রোদে থাকতে পারি না। দিনের বেলা সবসময় সানগ্লাস পরে থাকি। এখন শীতকাল নয়। তবু আমি হুডি পরে জবুথবু থাকি। কারণ রোদ আমার সহ্য হয় না।”

আমি বাকরুদ্ধ হবো কিনা তখনও বুঝতে পারি না।

জিনো বলে, “আমি সত্যিই ভ্যাম্পায়ার। আর আমি ভালোবাসার মতো কেউ না। আমাকে ভুলে যাও। আমাদের পথ আলাদা।”
আমি দুঃখে ক্ষণিকের জন্য চোখ বুজলাম। চোখ মেলে দেখি— সে আর নেই। তাহলে আমাদের গল্পটা কি সত্যিই ভূতের গল্প?

» আরও পড়ুন: সবুজ আলোর দেশে — বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি

পাঁচ.

আমার গল্পটি এখানে শেষ নয়। এরপর ঘটে গেছে কিছু বিচিত্র ঘটনা। বাইরে থেকে দেখলে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন, একটার সাথে আরেকটার সম্পর্ক নেই। কিন্তু একটু অনুসন্ধান করলেই বোঝা যায় ভেতরের রহস্য।

একজন আমেরিকান ভদ্রমহিলা এ শহরে আসার পর ছুরিকাঘাতে হাসপাতালে ভর্তি হন। ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে এই হত্যার চেষ্টা করা হয়। তবে মহিলাটির পরবর্তী অবস্থা জানা যায়নি। সে বেঁচে আছে কিনা তা নিয়ে তৈরি হয় রহস্য। যখন প্রকাশ্যে আসে— এটা হত্যার চেষ্টা ছিল, তখন থেকেই শুরু হয় নতুন চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি।

তা হলো— শহরে প্রায়ই মানুষ মরছে।

রাস্তায় লাশ পড়ে থাকছে তাদের। পত্রিকায় লেখা হচ্ছে— ঘাড়ের কাছে কামড়ের দাগ। রক্ত শুষে নেবার ক্ষত সেখানে। এ যেন সত্যিকারের ভূতের গল্প! মজার ব্যাপার হচ্ছে যারা মারা যাচ্ছে তারা কেউই ভালো মানুষ ছিল না। বেশিরভাগই ছিল গ্যাং সদস্য।

জীবদ্দশায় তারা শহরে ত্রাসের সৃষ্টি করতো। এসবের মাঝখানে আমার সমস্যাও জড়িত ছিল। যে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে বাবার আলাপ হয়েছিল, তিনি আমাদের বাড়িতে এলেন। মাঝবয়সী লোক, আমাকে মা বলে ডাকতে লাগলেন।

আর আমিও জানতে পারলাম একটা সত্য— লোকটি জিনোর বাবা। তিনি নিজেই এই সত্য প্রকাশ করলেন। আমি বললাম, “আপনিও কি ভ্যাম্পায়ার?”

“না,” লোকটি হাসলেন, “আমার স্ত্রী হচ্ছেন ভ্যাম্পায়ার। লোকেরা জানে তাকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়।”

“তাহলে জিনোর মা এখনও বেঁচে আছেন?”

“হ্যা, সে এখনও বেঁচে আছে। ভ্যাম্পায়ারদেরকে মেরে ফেলা কোনো মানুষের পক্ষে এত সহজ না।”

আমি হতাশ গলায় বলি, “জিনো আমার জীবনে না আসলেও পারতো আংকেল।”
লোকটি ঈষৎ হাসেন, বলেন, “দুঃখ করো না, ভ্যাম্পায়ারদের থেকে দূরে থাকতে পারাটাই সৌভাগ্যের।”

আমি জানতাম না এই কথার ওজন কতখানি, কিন্তু আমি বুঝেছিলাম— কথাটা সত্য। ডাক্তার ভদ্রলোক বাবার সাথে কিছু কথা বলে চলে যান। আর আমি প্রেসক্রিপশনের এককোনায় দেখতে পাই লেখা আছে— ‘তোমার মানসিক সুস্থতার জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট’।

(চলবে…)

(প্রথম পর্ব এখানেই শেষ। পরবর্তী পর্বে আমরা জানব কিভাবে এই ভূতের গল্প জিনোর চরিত্রকে বিভ্রান্তিকর করে তুলবে। জিনো সত্যিই ভালো নাকি খারাপ তা জানা যাবে।)


গল্প: নিভৃতের মায়ায়

লেখা: বাপ্পী মাহমুদ 

প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

1 thought on “নিভৃতের মায়ায় (প্রথম পর্ব) — ভূতের গল্প”

  1. বাহ, চমৎকার গল্প। পড়ে ভালো লাগলো। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। দ্রুত পরের পর্ব পোস্ট করিয়েন। শুভকামনা…!

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top