রূপকথার রাজপুত্র হ্যান্স অ্যান্ডারসন — প্রবন্ধ। আজকের এই প্রবন্ধ আমার বই পড়ার অভ্যাসকে কেন্দ্র করে। বই পড়তে সবসময়ই ভালো লাগে আমার। সাহিত্য কেন্দ্রিক মন আমার, ছোটোবেলায় ছোটোগল্প থেকে শুরু করে হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের বই ধরলাম। বইটি জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমার বাবা আমাকে উপহার দিয়েছিলেন।
আমি তখন ২০০৬ সালের নয় বছর বয়সী ছোট্ট বালক।
মনে পড়ে এখনো, ওই বয়সে শীতের সময় এলে আমি লেপের ভেতর ঢুকে শুয়ে শুয়ে বইটা পড়তাম। আমার এত ভালো লাগতো বইয়ের গল্পগুলো যে, শীতের সেই সময়টা এখনও আমায় নস্টালজিক করে তোলে!
রূপকথার রাজপুত্র হ্যান্স অ্যান্ডারসন — প্রবন্ধ
তাঁর পুরো নাম হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন। তবে হ্যান্স অ্যান্ডারসন নামেই বিশেষ পরিচিত। ০২ এপ্রিল ১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে ওডেন্সে ডেনিশ (ডেনমার্ক) এই লেখকের জন্ম হয়।
তিনি সহজভাবে তাঁর গল্পের মূলভাব তুলে ধরতেন। তাঁর লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল রূপকথা। হ্যান্স অ্যান্ডারসনের রূপকথার বইয়ে তিনি ছোট্ট জলপরী থেকে শুরু করে আরও অনেক গল্প লিখেছেন, যা তাঁকে শুধু সুপরিচিতই করেনি। বরং ছোট্ট জলপরী বা ‘The Little Mermaid’ নিয়ে মুভিও হয়েছে।
রূপকথার রাজপুত্র হ্যান্স অ্যান্ডারসন তাঁর লেখায় অনেক লোককথাকেও নিজের লেখনশৈলী দ্বারা তুলে ধরেছেন। তেমনই গল্প হলো ‘বুড়ো কখনও ভুল করে না’, ‘বড়ো ক্লোজ আর ছোটো ক্লোজ’।
৪ আগস্ট, ১৮৭৫ সালে হ্যান্স অ্যান্ডারসন মৃত্যুবরণ করেন। জীবদ্দশায় তাকে তাঁরই লেখা কুৎসিত হাঁসের সাথে তাঁর জীবনের মিল খুঁজে পেতেন অনেকেই। আজকের লেখায় আমরা জানবো হ্যান্স অ্যান্ডারসনের সম্পর্কে আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও তাঁর গল্প সম্পর্কে।
হ্যান্স অ্যান্ডারসনকে বলা হয় রূপকথার জাদুকর
হ্যান্স অ্যান্ডারসনের লেখা নিয়ে শুধু সিনেমায় হয়নি, অ্যানিমেশনও তৈরি হয়েছে। রূপকথার রাজপুত্র হ্যান্স অ্যান্ডারসন তাঁর লেখা সহজপাঠ্য রূপে প্রকাশ করতেন। যাতে শিশুরা বুঝতে পারে।
আমার কাছে তাঁর যে রূপকথার অনুবাদ বইটি আছে, সেখানে গল্প শুরু হয় ছোট্ট জলপরীকে দিয়ে। এই গল্পটি ছোটোবেলায় আমি পড়তে শুরু করতাম। মাঝপথে এসে ঘুমিয়ে পড়তাম কিংবা ধৈর্য্য হারাতাম।
আসলে তখন নয় বছরের বাচ্চা থাকায় বইটির গল্পগুলো তুলনামূলকভাবে বড়ো মনে হতো। তবু গল্পগুলো আমায় টানতো। এমনি করে একদিন ছোট্ট জলপরী শেষ করলাম।
সেই গল্পের স্বাদ এখনও পাই আমি।
রূপকথার রাজপুত্র হ্যান্স অ্যান্ডারসন এই গল্পে একটি কাল্পনিক জলপরীর কথা বলেছেন। ছোট্ট জলপরীটি সমুদ্রের গভীরে থাকে। তারা কয়েক বোন মিলে স্থলের মানুষদের গল্প শোনে, আর ভাবে সেই মানুষদের যদি দেখতে পেত! কিন্তু তাদের গল্প শোনানোর সময় তাদের দাদি জানান — ১৫ বছর বয়স না হলে কেউই সমুদ্রের ওপর উঠে মানুষদের দেখতে পাবে না।
ছোট্ট জলপরী সেই থেকে অপেক্ষায় ১৫ বছর বয়সের। দেখতে দেখতে তার বোনেদের ১৫ বছর বয়স হলো। তারা মানুষদের জাহাজে ভ্রমণ করতে দেখার পর ফিরে এসে অন্যদের কাছে সেই রোমাঞ্চকর গল্প বলতো। ছোট্ট জলপরী সেসব শোনে আর নিজেও দেখার জন্য তৃষিত হয়।
এমনি করে গল্পটি খুব চমৎকারভাবে এগিয়েছে। গল্পে জলপরীরা মানুষের মতো মৃত্যুর পরেও আত্মা হয়ে অমর জীবন পেতে পারতো না। তাই ছোট্ট জলপরী মানুষ হতে চাইলো। আর সে সত্যিই মানুষ হয়েছিল, কিন্তু শেষটা ছিল করুণ।
» আরও পড়ুন: গল্প লেখার নিয়ম — প্রবন্ধ
তুষার রানির সাত গল্প
ছোট্ট জলপরীর গল্পের পর আমার প্রিয় গল্প তুষার রানির গল্পটি। এই গল্প বইয়ের অন্যসব গল্প থেকে দীর্ঘ। তাই রূপকথার রাজপুত্র হ্যান্স অ্যান্ডারসন সাতটা পর্বে বিশেষ বিশেষ নাম দিয়ে গল্পটি ভাগ করেছেন।
তুষার রানির গল্পে আমরা শুরুতেই এক ডাইনিকে দেখি। যে একটা আয়না আবিষ্কার করেছে। তার একটা স্কুল ছিল। ওই স্কুলের বাচ্চারা আয়নাটা নিয়ে স্বর্গ পর্যন্ত প্রতিবিম্ব দেখার চেষ্টা করত। এই আয়নার বিশেষত্ব হলো আয়নায় সবকিছুই কুৎসিত দেখায়।
একদিন আয়নাটি ভেঙে যায়।
আর তারপর থেকেই শুরু হয় নতুন গল্প। গল্পে দুই কিশোর কিশোরী থাকে, যারা এ গল্পের মূল চরিত্র। কীভাবে তারা ভাঙা আয়নার টুকরো থেকে একটা অভিযানে লিপ্ত হলো, তা এই গল্পে বলা হয়েছে।
লাল জুতো
এই গল্পটিও আমার ভীষণ প্রিয়। গল্পে একটা মেয়েকে দেখানো হয়, যার নাম কারেন। সে ছিল ছোটোখাটো আর রোগা। সেইসাথে ভীষণ দরিদ্র।
তার পায়ের জুতাজোড়া বেঢপ আকৃতির ছিল। জুতাজোড়ার রং ছিল লাল। একদিন তার মায়ের মৃত্যুতে শবদেহ নিয়ে গোরস্থানে যাবার পথে একজন সম্ভ্রান্ত মহিলা তাকে দেখেন। তার খুব মায়া হয় কারেনকে দেখে।
তিনি মেয়েটাকে নিজের সাথে নেন।
কারেন ভাবে এইসবই হয়েছে তার লাল জুতার কারণে। কিন্তু মহিলা জানান, ও দুটি বিশ্রী। তিনি জুতাজোড়া ফেলে দিতে বলেন। কারেনের জন্য নতুন জুতা কিনলেও কারেন লাল জুতা নিয়েই আগ্রহী।
এখানে কারেনের অবাধ্যতা আর জেদি ও অহংকারী মনোভাব প্রকাশ পায়। যার মূল্য দিতে গিয়ে কারেন অনেক ভোগান্তির শিকার হয়েছিল।
একদিন সে লাল জুতা পরেই গির্জায় যায়। তারপর থেকেই ঘটতে থাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। মৃত্যুদূতের মতোই হাজির হয় কোনো এক তরবারি হাতের আগন্তুক। তাকে মারতে চায় সে!
» আরও পড়ুন: প্রেমের মতো — ভালোবাসার গল্প
যে শিশু স্বর্গের কাছাকাছি
গল্পটি পড়লে আমার মন খারাপ হয়। আবার একইসাথে ভালোও লাগে। গল্পে অনুপ্রাণিত হবার মতো মোরাল কন্সেপ্ট আছে, যা গল্পটিকে রোমাঞ্চকর করে তুলেছে।
এই গল্পে একজন মায়ের আর্তনাদ ফুটে উঠেছে।
পরিবারের সবচেয়ে ছোটো শিশুটি মারা গেছে। মা তাই বিমর্ষ হয়ে কাঁদেন। অন্যরা একটু শান্ত হলেও মাকে কেউই স্বান্তনা দিতে পারে না। তিনি আরও সন্তান থাকলেও ছোটো শিশুর মৃত্যুতে শোকে পাথর প্রায়।
একসময় শিশুটির কফিন প্রস্তুত করা হয়। কফিনে পেরেক ঠুকে গোরস্থানে নেয়া হয়। ক্লান্ত ও শোকাহত মা সবাই যখন ঘুমে তখন সদ্য কবরস্থ শিশুকে দেখতে গোরস্থানের দিকে তিনি পা বাড়ান।
আর গোরস্থানে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সে সময় অলৌকিকভাবে বাচ্চাটির দেখা পান। বুঝতে পারেন মৃত্যুর পর শিশুটি ভালো আছে। স্বর্গের কাছাকাছি আছে।
মায়ের কান্না আর অভিযোগ কমে আসে তখন। তিনি বুঝতে পারেন এভাবে কাঁদলে শিশুর আত্মা কষ্ট পাবে। তাই তিনি আর যারা বেঁচে আছে তাদের যত্ন নিতে শুরু করেন। বুঝতে পারেন সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনায় আসল।
কোনো কাজের নয়
আমার পড়া সবচেয়ে বেস্ট গল্প এটাই। ‘কোনো কাজের নয়’ গল্পে রূপকথার রাজপুত্র হ্যান্স অ্যান্ডারসন একজন মায়ের কথা তুলে ধরেছেন, যাকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে কেউ তেমন কাজের মনে করে না।
মহিলাটি তার একমাত্র সন্তান নিয়ে কোনোরকম ধোপার কাজ করেন।
এরইমধ্যে তার বান্ধবী জানায় একজন পরিচিত ব্যক্তির মৃত্যু সংবাদ। ব্যক্তিটির বাসায় মহিলাটি কাজ করতেন দীর্ঘ কয়েক বছর আগে। সত্যি বলতে ঐ লোকটির সাথে তার প্রেম ছিল। কিন্তু লোকটির মা জানান, তেমন কাজের সে নয়। তাকে তিনিই অন্যত্র বিয়ে দেবেন।
গল্পের শেষে মহিলাটি নিজেও মারা যান। পুকুরঘাটে পা পিছলে পড়ে তার মৃত্যু হয়। সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহ্য মুহূর্ত হলো তখন তার সন্তান জানায় তার মা আসলে অনেক কাজের ছিলেন। তার বান্ধবীও সেই কথায় সম্মতি জানিয়ে বলেন, সবাই তাকে কোনো কাজের মনে না করলেও সৃষ্টিকর্তা তা বলবেন না।
» আরও পড়ুন: তোমায় পাইনি ছুঁতে — মুক্তগদ্য
হ্যান্স অ্যান্ডারসন এবং কুৎসিত হাঁস প্রসঙ্গ
হ্যান্স অ্যান্ডারসনের পিতা দরিদ্র ছিলেন। লেখক তাঁর পিতামাতার সাথে একটি মাত্র ঘরে থাকতেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন মুচি আর মা ধোপানী।
ছোটো থেকেই হ্যান্স অ্যান্ডারসনের বাবা তাঁর কল্পনাশক্তিকে প্রশ্রয় দিতেন। পুতুল নিয়ে খেলাচ্ছলে হ্যান্স অ্যান্ডারসন তখন সেই পুতুলদের নিয়ে গল্প ভাবতে শুরু করেন। তবে তাঁর সফলতার গল্প শুরু হয় ১৮৩০-৩১ সাল থেকে। সেসময় তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
প্রথম জীবনে তিনি অভিনয়ও করেন। তার অভিনয়ের মঞ্চ রয়্যাল থিয়েটারের এক ডিরেক্টর ছিলেন জোনাস কলিন। তিনি তাঁর ভেতরের সুপ্ত লেখক প্রতিভা আবিষ্কার করেন এবং হ্যান্সের যাবতীয় খরচাদির দায়িত্ব নেন।
তিনি গল্পলেখক হিসেবে শুধু মানুষ নিয়েই লিখেননি, বরং রূপক অর্থে লাল জুতো নিয়ে অহংকারী ও জেদি এক মেয়ের পতনের গল্প লিখেছেন। একইসাথে লিখেছেন টিনের সেপাই, দেবদারু গাছ, কুৎসিত হাঁস।
কুৎসিত হাঁস প্রসঙ্গে অনেকেই মনে করেন এখানে লেখক নিজের প্রতিচ্ছবি অংকন করেছেন। জীবদ্দশায় তাঁর নাক ছিল উঁচু ও চেহারা ছিল কিঞ্চিৎ কদাকার। তবু তাঁকে রূপকথার রাজপুত্র বলা হয়।
কুৎসিত হাঁস গল্পে একদিন হাঁসটি নিজের প্রতিবিম্বে সুন্দর প্রতিফলন দেখতে পেয়েছিলো। হ্যান্স অ্যান্ডারসনও কি তাঁর রচিত গল্পে নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছিলেন?
প্রশ্ন রয়েই যায়!
পরিশেষে
হ্যান্স অ্যান্ডারসনের গল্পে নীতিবোধের অভাব সমালোচকরা সেসময় অনুভব করেননি। তবে বিংশ শতাব্দীতে লেখকের প্রতি কেউ কেউ বিরূপ মন্তব্য করে বসে। অনেকেই মনে করেন তাঁর লেখার মোরাল কন্সেপ্ট কঠিন, শিশুরা সহজে নিতে পারবে না।
কথাটা তর্কসাপেক্ষ। তারপরও সবদিক বিবেচনা করলে তিনি রূপকথার রাজপুত্র বলেই বিবেচিত।
প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও প্রবন্ধ পড়তে শব্দশৈলী পোর্টাল ও ফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।



