লেখক হবার পথে — সফলতার শিক্ষণীয় গল্প। গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ।
সফলতার শিক্ষণীয় গল্প অনুযায়ী এখানে একটি কিশোর বয়সী চরিত্রের খোলামেলা ভাবনা ও তার বোধোদয় উঠে এসেছে। এটি সফলতার শিক্ষণীয় গল্প, তাই গল্পটি অনেক বড়ো।
গল্পটি পড়ে আপনার ভাবনা আমাদের কাছে শেয়ার করতে পারেন। চলুন, মূল গল্পে যাওয়া যাক।
লেখক হবার পথে | বাপ্পী মাহমুদ
এক.
সকাল নয়টার পরেও ঘুমে থাকে ফয়সাল। নবম শ্রেণির ছাত্র সে। স্কুলে যায় না বেশকিছুদিন হলো। ওর মা নেই। ছেলের এমন অবস্থা দেখে ফয়সালের বাবা মন খারাপ করে একা একা নাস্তা বানান। একায় টেবিলে বসে খান, অফিসে যান।
আজ ফয়সাল ঘুম থেকে উঠতে উঠতে এগারোটা।
টেবিলে ওর জন্য আলাদা পাত্রে খাবার ঢাকা আছে। ফয়সাল নিশ্চুপ খেয়ে নেয়। তারপর জয়স্টিক হাতে ভিডিয়ো গেমস খেলতে বসে। যেদিন ভালো লাগে না সেদিন ফেসবুকে ঢোকে, গল্প লিখে। ভালো লিখতে পারে সে। ফেসবুকের বিভিন্ন জায়গায় তার লেখা জমা হয়ে আছে।
কিন্তু তাতে কী? মানুষ এখন দুই সেকেন্ডে টপিক ধরতে না পারলে কোনো লেখায় পড়ে না। তারা মুখে যতই স্টার জলসা আর জি বাংলা নিয়ে ট্রল করুক, লেখালেখির জগতে তাদের ওইসব চ্যানেলের অ্যাপ্রোচই পছন্দ। ফয়সালের খুব রাগ হয় এই ধরনের লোকদের দেখে। সে জানে এরা হিপোক্রিট। যারা গল্পের ভেতর সাহিত্য চায় না, তারা কখনো নিরপেক্ষতার মানে বুঝবে না।
ফয়সাল ভাবে। নিরাশ হয়। হাতে কলমও তুলে নেয়। খাতায় কলম ঠেসে নিজের রাগ নিয়ে অনেক কথা লিখতে ইচ্ছে হয় ওর। কিন্তু লিখে কী হবে? কে পড়বে? সবাই জাজমেন্টাল। কেউ শিখতে চায় না। অথচ শিখলে তাদেরই লাভ।
হ্যা, সক্রেটিস তো আর এমনি এমনি বলে যাননি — ‘বিস্ময় থেকেই জ্ঞানের শুরু’। যাপিত জীবনে সে অনেকবার ভেবেছে তার জীবনটা বদলে যেত — যদি সমাজটাও একটু বদলাতো। সমাজের ওপর এই আক্ষেপ তার সারাজীবন থাকবে!
মূর্খরা বদলাতে চায় না, সমাজও মূর্খদের মতো — বদলাতে চায় না। ফয়সাল হতাশ হয়। সে লেখক হতে চেয়েছিল। কিন্তু তার বাবা বলেন, “প্যাশনকে কখনো প্রফেশনের জায়গায় নিয়ে যেয়ো না।”
ফয়সাল অবাক হয়। সে এই কথা বুঝতে পারে না, কিন্তু বুঝতে চায়। তাই তার অবাক চাহনি চেহারায় ফুটে ওঠে। ওর বাবা রফিজুল সাহেব ছেলের চাহনি বোঝেন। কিন্তু তিনি কিছুই ব্যাখ্যা করেন না। কারণ এখনো ব্যাখ্যার সময় আসেনি।
ফয়সালও অবচেতন মনে বুঝতে পারে সে কথা। সে তাড়াহুড়া করে না। বাবা আরেকটা কথাও প্রায়ই বলেন — ‘সময়কে সম্মান করলে জীবনও তোমায় সম্মান ফিরিয়ে দেবে’।
» আরও পড়ুন: সবুজ আলোর দেশে — বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি
দুই.
সময়!
সময় নিয়ে ফয়সালের মনে তেমন ভাবনা নেই। সে দেখেছে তার বাবা বাইরে থাকলে বারবার নিজের হাতঘড়ি দেখেন। বাবার হাতঘড়িটা মলিন হয়ে গেছে — ভাবে সে। যদি একটা নতুন হাতঘড়ি বাবাকে উপহার দেওয়া যেত! ভাবতে ভাবতে চোখে পানি জমে ওর।
ফয়সাল চোখের পানি মুছে বাইরে তাকায়। তার চোখের দৃষ্টি বাইরে থাকলেও মনের দৃষ্টিটা এখনো বাইরের পৃথিবী চিনে উঠতে পারেনি। বাবা কেন বলেন প্যাশন আর প্রফেশনের জায়গা আলাদা রাখতে? বাবা কি সফলতার শিক্ষণীয় গল্প বলার চেষ্টা করছেন?
রফিজুল সাহেব আজ অনেক কর্মব্যস্ত। সরকারি ব্যাংকে তিনি সদ্যই এজিএমের পদ পেয়েছেন। ব্যস্ততা শেষ করে বাড়ি ফিরতে সময় লাগবে। লাগুক, তবু ফয়সাল আজ বাবাকে প্রশ্ন করবে — কেন লেখালেখি পেশা হতে পারে না?
সারাদিন আনমনেই কেটে গেল।
ফেসবুকে ঢুকে দেখে ক্লাসমেট দিশার মেসেজ। “তোমায় একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছি আমি,” দিশা লিখেছে, “অথচ তোমায় পাবার লোভ আমার চিরকালের..!”
এত আবেগ! মূগ্ধ হয় ফয়সাল। সেও লিখে, “হঠাৎ? তুমি কি বিশেষ কিছু বলতে চাও?”
“চাই। বলেছিও ইশারায়। তুমি বুঝোনি।”
“হতে পারে। আমি ভালোবাসাকে সাংঘর্ষিক মনে করি।”
“সাংঘর্ষিক!” অবাক দিশা, “কেন? কেন?”
“সে অনেক কথা। সংক্ষেপে বলি শোনো — ভালোবাসলে ভালো থাকা আর হয়ে ওঠে না।”
দিশা খুব মজা পায় শেষের কথায়। ইমোটিকন দিয়ে নিজের ইমোশন বোঝাতে চায়। ফয়সাল যতটুকু পারে বুঝে নেয়।
তিন.
রাতটা কি দ্রুতই নামলো?
ফয়সাল দেখলো তার বাবা খুবই ব্যস্ত ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকলেন। ফয়সালকে দেখে আশাহত গলায় বললেন, “নিয়মিত স্কুলে যাও না কেন? সকালের ঘুম তো একসময় পাবেই। কিন্তু যে সময়গুলো হারাচ্ছো তা কি আর ফিরে পাবে?”
আবারও সময়ের প্রসঙ্গ। ফয়সাল সিদ্ধান্ত নেয় লেখালেখির প্রসঙ্গটা তুলবে। সে বলে, “বাবা!”
রফিজুল সাহেব বেসিনে হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসে বলেন, “বলো।”
“লেখালেখি কেন আমার পেশা হতে পারে না?”
রফিজুল সাহেব খাবার মুখে তুলতে যাচ্ছিলেন, প্রশ্ন শুনে যেন অবাক হলেন — খাবার মুখে না তুলে ছেলের দিকে তাকালেন। ফয়সালের মনে হলো সে বুঝি উত্তর পাবে না।
রফিজুল সাহেব বললেন, “তুমি চাইলে নিজেই উত্তরটা খুঁজে বের করতে পারো। আর সেটাই হবে তোমার জন্য সফলতার শিক্ষণীয় গল্প।”
“আমি?” ফয়সাল অবাক হয়, “আমি কীভাবে?”
“শোনো, তুমি যদি লেখালেখি করে রোজগার শুরু করো তখন সেখান থেকেই উত্তরটা পেয়ে যাবে।”
“কিন্তু আমি তোমার থেকে সরাসরি জানতে চাই, প্র্যাকটিক্যালি বলো। সফলতার শিক্ষণীয় গল্প আমি ঠিকই বুঝব।”
“আমার উত্তর যত প্র্যাকটিক্যালই হোক, তুমি বুঝলেও অনুধাবন করতে পারবে না। আর অনুধাবন ছাড়া কিছু প্রশ্নের উত্তরের মানে নেই।”
ফয়সাল তবু বুঝলো না কিছু।
রফিজুল সাহেব ছেলের দিকে চেয়ে ছিলেন। তিনি নরম স্বরে বললেন, “তোমার হাতে অল্প কিছু সময় আছে। এই সময়ে তুমি লেখক হও, সেটাকে প্রফেশন বানাও। তারপর সফলতার শিক্ষণীয় গল্প অনুযায়ী উত্তর ঠিকই খুঁজে পাবে।”
ফয়সাল একটা নিঃশ্বাস গোপন করে নিজের ঘরে চলে এলো।
» আরও পড়ুন: বই পড়ার গুরুত্ব: জ্ঞান ও চেতনার উন্মেষের পথ
চার.
রাত ঠিক এগারোটা।
ফয়সালের ঘরের দখিনা জানালা খোলা আছে। আকাশ থেকে চাঁদের আলো, অল্প হাওয়া আসছে। ফয়সাল খাতা খুলে রেখেছে, লিখতে চাইছে একটি সফলতার শিক্ষণীয় গল্প। কিন্তু কলম ছোঁয়া হয়নি। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে সে কিছুই লিখেনি।
বাবার কথাটা তার মনে পড়ছে — “… তুমি লেখক হও, সেটাকে প্রফেশন বানাও। তারপর সফলতার শিক্ষণীয় গল্প অনুযায়ী উত্তর ঠিকই খুঁজে পাবে।”
কিছু একটা আছে বাবার কথায়, যা তাকে নিরুৎসাহিত করে না আবার উৎসাহিতও করে না। খুবই সচেতনধর্মী এক উপদেশ যেন। যে উপদেশ সফলতার শিক্ষণীয় গল্প অনুযায়ী বুঝতে সময়ের অপেক্ষা জরুরি।
ফয়সাল খাতা বন্ধ করল। ঘর থেকে বের হয়ে ডাইনিং টেবিলে এলো পানি খেতে। তখনই দেখলো বাবার হাতঘড়িটা টেবিলে ভুলে ফেলে রেখেছেন। পুরনো হাতঘড়ি — ফয়সাল হাতে তুলে নেয়। ঘড়ির বেল্টে ভাজ পড়েছে, অ্যানালগ ঘড়িটার সেকেন্ডের কাঁটা অনেক চেষ্টা করেও নড়ছে না। এক জায়গায় বারবার ঝাঁকি খাচ্ছে কাঁটাটি।
তার ভেতর অন্যরকম বোধের সঞ্চার হলো।
বাবার এই ঘড়িটা কতদিন ধরে সে বছরের পর বছর দেখছে, কিন্তু কখনো নতুন ঘড়ি উপহার দেবার কথা মনে হয়নি। সে গুগলে সার্চ দিলো — how to fix an old analog watch?
গুগলের সাজেস্টেড কিছু ভিডিয়ো দেখে সে বুঝলো ঘড়ির ব্যাটারিতেই সমস্যা। পরদিন সে তার লক্ষ্য ঠিক করল — ঘড়ির ব্যাটারি কিনবে। অতঃপর সে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলো। স্কুলে গেল। ফিরবার পথে ব্যাটারি বদলে আনলো।
কে জানতো, সফলতার শিক্ষণীয় গল্প এখান থেকেই শুরু হবে?
পাঁচ.
সেদিন সন্ধ্যায় অফিস ফেরত রফিজুল সাহেব এসে ঘড়িটার খোঁজ করলেন। বললেন, “খোকা, তুমি আমার ঘড়িটা দেখেছো?”
ফয়সাল জবাবে মিটিমিটি হাসলো। তারপর অনেক দামী সম্পদ ফিরিয়ে দেবার ভঙ্গিতে সে নিজ হাতে বাবার ঘড়িটা হাতে পরিয়ে দিলো। রফিজুল সাহেব দেখলেন ঘড়িটা সচল — তিনি অবাক চোখে ছেলের দিকে তাকান।
আর ফয়সাল তখনও হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রফিজুল সাহেব বললেন, “এই ঘড়িটা তোমার মা আমায় উপহার দিয়েছিল। সে তার চাকরির প্রথম বেতনের টাকায় এটা কিনেছিল। সেই সময়গুলো ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। এখন সময় যতটা আমাকে দেয়, তারচেয়েও বেশি কেড়ে নেয়।”
ফয়সাল অবাক হয়। বলে, “সময় কেড়ে নিতে জানে?”
“হ্যা,” রফিজুল সাহেব দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, “যেমনি করে তোমার থেকে অনেকটা মূল্য সময় কেড়ে নিয়েছে। আর এটা হয়েছে তোমারই দোষে।”
ফয়সাল মাথা নিচু করে।
রফিজুল সাহেব আরও বলেন, “তবে এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। তুমি চাইলে যেকোনো জায়গা থেকে সফলতার শিক্ষণীয় গল্প শুরু করতে পারো। তবে মনে রাখবে লক্ষ্য তোমার মনের মতো হলেও সেখানে অসৎ চাওয়া যেন না থাকে।”
ফয়সাল যেন প্রেরণা পেল। সে বলল, “আমি বুঝেছি।”
“তোমার ওপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে।”
» আরও পড়ুন: চায়ের শেষ চুমুক — গভীর ভালোবাসার গল্প
ছয়.
দেখতে দেখতে ফয়সাল স্কুলের নিয়মিত ছাত্র হয়ে উঠলো।
ক্লাসে সে পড়াও করে খুব মন দিয়ে। স্যার-ম্যাডামদের সুনজরে পড়েছে সে, আর ফয়সালও বুঝতে পারে স্যার-ম্যাডামরা কতটা হেল্পফুল। তার খুব ভালো লাগে। সেদিন ক্লাসে ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন — তোমরা বড়ো হয়ে কে কী হতে চাও?
ম্যাডামের কথায় অনেকেই কেমন ইতস্তত হয়ে গেল। যেন তারা এই কথা জীবনে প্রথম শুনছে। ম্যাডাম ক্লাসের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণে আনতে বললেন, “জানি, ইংরেজি প্যারাগ্রাফে তোমরা এইম ইন লাইফ পড়েছো। কিন্তু সেটা তো শুধু বইয়ের কথা। তোমার নিজের মনে কোন চাওয়া থাকলে আমায় বলো।”
ফয়সাল তখনই হাত তোলে।
ম্যাডাম বলেন, “হ্যা ফয়সাল, বলো।”
“ম্যাডাম, আমি লেখক হতে চাই।”
সঙ্গে সঙ্গেই কেউ একজন বলে ওঠে, “কী লিখবি তুই? কৌতুক?”
ক্লাসে হাসাহাসি শুরু হয়ে যায়। কিন্তু ম্যাডাম মৃদু ধমকে বলে ওঠেন, “সাইলেন্ট প্লীজ!”
তারপর ফয়সালকে বলেন, “কেন তুমি লেখক হতে চাও? তুমি কি কোনো সফলতার শিক্ষণীয় গল্প লিখতে চাও?”
“জ্বী ম্যাডাম, চাই,” ফয়সাল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ স্বরে বলে, “আমি মানুষের অন্ধকার দিকগুলো সম্পর্কে জানি। তারা অল্পতেই অনেক বেশি জাজমেন্টাল। আর হিপোক্রিটও। তাদের এই ন্যাচার নিয়ে তারা লজ্জা পায় না। যা পৃথিবীর জন্য হুমকি স্বরূপ।”
ম্যাডাম কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। যেন অবাকও হলেন। তারপর বললেন, “তুমি খুবই প্রাসঙ্গিক কথা বলেছো। আর এজন্য লেখক হতে চাওয়া স্বাভাবিক। লেখক তারাই যারা সততাকে কলমের আচড়ে ফুটিয়ে তুলতে জানে।”
ফয়সাল আত্মবিশ্বাসী চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
“কিন্তু মনে রেখো,” ম্যাডাম যেন সাবধান করলেন, “মানুষকে শুধু নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝা যায় না। একজন লেখককে মানুষের খুব কাছে যেতে হয়। বুঝতে হয়। মানুষ কেন অন্ধকারের পথে পা বাড়িয়েছে সেটাও জানতে হয়।”
ম্যাডামের কথায় এবার ফয়সাল হ্যা বা না কিছুই বলল না। তার মধ্যে ইতস্তত বোধের সঞ্চার ঘটলো, তবু সে বলল, “বুঝেছি ম্যাডাম।”
সাত.
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ফয়সাল ম্যাডামের কথার সাথে একমত হতে পারেনি। মানুষকে নিয়ে তার নেতিবাচক বিশ্বাস প্রগাঢ়। সে জানে মানুষ নিজের ভালো নিজে খুঁজে নিতে জানে না। যদি জানতো তবে পৃথিবীতে ভালো লোকের সংখ্যায় বেশি হতো।
তারপরও ফয়সালের বাবা যেমন প্যাশনকে প্রফেশন বানাতে নিষেধ করেছেন — সেই সংশয় ছাপিয়ে নতুন সংশয় যুক্ত হলো স্কুলের ম্যাডামের কথায়। ফয়সাল বিশেষ চিন্তিত ছিল। কিন্তু তার ভাবনা বেশিদূর এগুচ্ছিলো না।
তখনই দিশা এলো।
বলল, “কী ব্যাপার মিস্টার রাইটার? একা একা বসে কী ভাবছেন?”
ফয়সাল শুকনো গলায় বলল, “কিছু না!”
“সত্যিই কিছু না? নাকি আমায় বলা যাবে না?”
“আসলে,” ফয়সাল ছোট করে নিঃশ্বাস নেয়, “আমি অনেক বড়ো স্বপ্ন দেখে ফেলেছি, সে স্বপ্নে আমার সফলতার শিক্ষণীয় গল্প ভুল কিনা বুঝতে পারছি না।”
“বাহ! তুমি তো দেখছি বড়ো মানুষের মতো গুছিয়ে কথা বলো।”
ফয়সাল হাসে। বলে, “আমায় কি আজ নতুন চিনছো?”
“যাক সেসব কথা, তবে তোমায় আমিও আজকাল বুঝি না।”
“কেন?”
“কারণ তুমি আমায় এখনো ভালোবাসি বলোনি।”
“এসব আমার জন্য নয়,” ফয়সাল বলে, “ভালোবাসা ব্যক্তিত্বের জন্য জায়গা রাখে না। ভালোবাসা শুধু বলে অন্যের জন্য নিজের সবকিছু ত্যাগ করো। ভালোবাসা শুধু অন্যের জন্য মরিয়া হতে বলে।”
“এটা কি দোষের?”
“আমি সেটা বলিনি। তবে ব্যক্তিত্ব আমার কাছে সবকিছু।”
দিশা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে, “তুমি ভুল ভাবছো। যে মানুষ ভালোবাসার জন্য সবকিছু করে সে-ই ব্যক্তিত্ববান!”
এটা বলেই দিশা চোখ মোছে আর উঠে চলে যায়। এদিকে ফয়সাল অবাক হয়ে যায় দিশার কথায়। যেন দিশার কথা আর ক্লাসের ম্যাডামের কথায় সত্যি। আর তাকে নিয়ে তার বাবার উপলব্ধিটাও সত্যি।
» আরও পড়ুন: জীবন নিয়ে উক্তি ও পর্যালোচনা — প্রবন্ধ
আট.
ফয়সাল লিখতে আরম্ভ করেছে।
লম্বা একটা সফলতার শিক্ষণীয় গল্প লিখবে সে। অনেক লম্বা গল্প! লিখেই যাবে। তবে অনেক সময় ব্যয় করে লিখবে। এই লেখার ওপর তার লেখালেখির ক্যারিয়ার নির্ভর করে আছে।
অল্প কয়দিনেই একজনের সাথে তার পরিচয় হয়েছে, এক লিটলম্যাগের সম্পাদক। খুবই খুশির খবর লোকটি নিজেই ফেসবুকে তার লেখা পড়ে নক করেছেন। ফয়সালও কথা দিয়েছে খুব দ্রুতই একটা লেখা পাঠিয়ে দিবে।
আর হলোও তাই। লেখা দ্রুতই সম্পাদকের হাতে পৌঁছে গেল। কিছুদিন বাদে লেখাটি লিটলম্যাগে ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হলো। ফয়সাল খুশি মনে তার বাবাকে দেখায়।
বাবা অনেক প্রশংসা করলেন।
আর ফয়সাল বুঝতে পারলো, তার লেখালেখির যাত্রা শুরু হয়েছে। এ ঘটনার পর সে আরও দুটি লেখা লিখলো। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো চতুর্থ লেখায়। সম্পাদক হাসনাত নিজে তাকে বললেন, “এই লেখার টপিকটা চেঞ্জ করলে হয় না?”
“কেন ভাইয়া?” ফয়সাল কিছুটা আশাহত, “আমি তো সমাজের চিত্র তুলে ধরেছি। মানুষ কীভাবে চিন্তা করে, কেন তারা একে-অপরের সাথে সাংঘর্ষিক —”
হাসনাত তাকে থামায়, কথা শেষ করতে দেয় না। তিনি বলেন, “মানুষ নিজের নেতিবাচক প্রতিচ্ছবি দেখে অভ্যস্ত না।”
“যদি তাই হয় তবে আমাকে লেখক হিসেবে প্রতিবাদী হতে হবে। মানুষের ভুলটা দেখিয়ে দিতেই হবে।”
ফয়সালের কথায় কাজ হয় না। হাসনাত দুর্বল শ্বাস ফেলে বলে, “মানুষের প্রতি রাগ থাকলে লেখক হওয়া যায় না। আর তাছাড়া যে মানুষদের প্রতি তোমার রাগ, যাদেরকে জাজমেন্টাল বলছো, তারা তোমার লেখা অ্যাপ্রিশিয়েট করেছে বলেই তোমার লেখা আমরা ছাপাই। বুঝেছো?”
মুহূর্তেই ফয়সাল যেন কোথায় হারিয়ে যায়। সে জবাব দেয় না, কিন্তু বুঝতে পারে হাসনাত ভাইয়ের কথা সত্য। হাসনাত ভাই আরও বলেন, “হ্যা, মানুষের অন্ধকার দিক নিয়ে তুমি যা বলো তা সত্য। কিন্তু তোমায় আরও বুঝতে হবে — পৃথিবীর সিস্টেম এভাবে কাজ করে না। পৃথিবীর সিস্টেম বুঝতে হলে তোমায় এই হিপোক্রিটদের বুঝতে হবে। তাদের মতোই চিন্তা করতে হবে, তারা যা বোঝে তা-ই লিখতে হবে।”
হাসনাত ভাই একটানে বলে গেলেন। ফয়সাল হতাশ গলায় বলল, “এসব তোষামোদির মতো শোনাচ্ছে।”
“তাহলে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নিও না। এটা তোমার জন্য নয়।”
ফয়সাল অবাক হয়ে গেল। আর যেন উত্তরও পেয়ে গেল। যে উত্তর সে তার বাবার কাছ থেকে আশা করেছিল। সে বুঝতে পারলো একজন প্যাশনেট লেখকের সাথে একজন প্রফেশনাল লেখকের পার্থক্যটা আসলে কোথায়।
দুজনেই লেখক। প্যাশনেট লেখক আত্মার ক্ষুধা নিয়ে লিখেন, আর প্রফেশনাল লেখক টাকার ক্ষুধা নিয়ে লিখেন।
নয়.
“বাবা,” ফয়সাল ক্লান্ত গলায় আবারও ডাকে, “বাবা!”
রফিজুল সাহেব অবাক চোখে দেখেন ফয়সালকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, “কী হয়েছে খোকা? তোকে এমন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে কেন?”
রফিজুল সাহেব এতদিন ছেলেকে ‘তুমি’ সম্বোধন করলেও আজ ‘তুই’ বলে ডাকলেন।
আর ফয়সাল বলল, “আমি হেরে গেছি বাবা। তোমার কাছে আমি হেরে গেছি।”
“কী বলছিস? আমার কাছে এসে বস বাবা!”
ফয়সাল সত্যিই কাছে গিয়ে বসলো। আর ওর বাবা ফয়সালের মাথায় হাত বোলালেন। ফয়সাল বলল, “একজন পেশাদার লেখক হওয়ার বিলাসিতা সত্য নয়.. আমি বুঝে গেছি।”
“খোকা, এটা তো ভালো খবর।”
“কিন্তু আমি যে হেরে গেছি।”
“একে হেরে যাওয়া বলে না। একে বলে শেখা। তুই শিখেছিস। মানুষ ঠকে যায় কেবল শেখার জন্য।”
কথাটা ফয়সালের মন ভালো করে দেয়। সে তাকায় বাবার দিকে। আর বলে, “তাহলে কি বাবা একজন প্যাশনেট লেখক কখনোই সফলতার শিক্ষণীয় গল্প বলার জন্য প্রফেশনাল লেখক হবার অধিকার রাখে না?”
“কেন রাখবে না, পাগল ছেলে? অবশ্যই রাখে! তবে শোন, এই শক্তি সবার মধ্যে থাকে না। যাদের ভেতর থাকে তারাই পরবর্তীতে লিও তলস্তয়, কাজী নজরুল ইসলাম হয়ে ওঠেন।”
“আমিও এই শক্তি অর্জন করতে চাই বাবা!”
রফিজুল সাহেব অত্যন্ত খুশি হন ছেলের কথায়। মাথায় আবারও হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, “তাহলে সবার আগে মানুষের প্রতি মনোভাব বদলাতে হবে। কাউকেই দ্রুত জাজ করা যাবে না। কেউ ভালোবাসলে তাকেও ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে হবে। কেউ ঘৃণা দিলে তাকে কলমের আচড়ে বোঝাতে হবে। তবেই না তুই লেখক!”
“ভালোবাসা!” ফয়সাল আপন মনে বলে ওঠে, “হ্যা বাবা, আজ আমি তোমার কথা অনুধাবন করতে পারছি।”
সেইসাথে ফয়সালের আরও মনে হয় দিশার কথা। মেয়েটি যে তাকে ভালোবাসে।
» আরও পড়ুন: হিমু রিমান্ডে — বই রিভিউ
দশ.
দিশার মেসেজ ইদানীং আর ফেসবুকে আসে না।
ফয়সাল নিজেই একবার নক করলো। দিশা সিন করেও রিপ্লাই দেয় না। এরপর আর কী বলার থাকে? ফয়সাল বুঝতে পারে দিশা সেদিনের ঘটনায় আপসেট। সে অভিমান করেছে।
ফেসবুকে দিশা অনলাইনেই আছে এখনো। ফয়সাল লিখলো, “তুমি চাইলে আমি তোমার অভিমান মুছে দিতে পারি।”
“কীভাবে?” দিশা লিখলো, “তুমি তো আমায় ভালোবাসো না।”
“কাল দেখা করো, অনেক কথা বলার আছে।”
“ঠিক আছে।”
“স্কুলে নয়, ছুটির পর বিকেলে রেস্তোরাঁয় এসো। তখন বলব।”
তারা দুজন সত্যিই ছুটির পর রেস্তোরাঁয় বসলো। দিশার অভিমানী চেহারা দেখে মূগ্ধ হয় ফয়সাল। তার কেমন মায়াও লাগে মেয়েটিকে দেখে। এই মেয়েটিকে সে এতদিন ইগনোর করেছে? ফয়সালের নিজেরই বিশ্বাস হয় না নিজেকে।
ফয়সাল এক নিঃশ্বাসে কিছু কথা বলল, “আমি জানি আমি তোমার বিবেচনা থেকে সরে গেছি। কিন্তু মানুষ বদলায়। আমিও তাই সুযোগ ডিজার্ভ করি। আর হ্যা, তুমি ঠিক বলেছিলে — যে ভালোবাসতে জানে সে-ই সবচেয়ে ব্যক্তিত্ববান।”
দিশা অবাক চোখে তাকায়। সে এতটা বোধোদয় আশা করেনি। ফয়সাল হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। আর সে দিশাকে বলল, “আমি কি তোমার হাতটা স্পর্শ করতে পারি?”
গল্প: লেখক হবার পথে
লেখা: বাপ্পী মাহমুদ
প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টাল ও ফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।



