হুমায়ূন আহমেদ — শুধুই কি জনপ্রিয়?

হুমায়ূন আহমেদ — শুধুই কি জনপ্রিয়?

হুমায়ূন আহমেদ — শুধুই কি জনপ্রিয়?

এটি একটি প্রবন্ধ। আজকের এই প্রবন্ধে আমরা হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে জানা-অজানা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে চলেছি। তিনি সাহিত্যদর্শনের পাশাপাশি জনপ্রিয়তাকেও নিয়ে গেছেন উচ্চতায়।

তবে তাঁর জনপ্রিয়তায় কি তাকে সাহিত্যদর্শনে পুরোপুরি প্রবেশ করতে দেয়নি? চলুন, আজ সেসব জানা যাক!

হুমায়ূন আহমেদ — শুধুই কি জনপ্রিয়?

অস্বীকার করার উপায় নেই হুমায়ূন আহমেদ একজন প্রথম সারির জনপ্রিয় লেখক। নব্বই দশকে সাহিত্য অনুরাগী বলতে যা ছিল, তার সিংহভাগই ছিল পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের প্রতি মনোযোগী। সমরেশ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তখন থেকেই লিখে চলছিলেন সাহিত্য।

তাদের লেখায় সাহিত্য ও দর্শন উভয়ই ছিল।

কিন্তু মধ্যবিত্ত দুঃখ কষ্ট কেমন সেটা অনেক বেশি স্পষ্ট আর সজীব ছিল হুমায়ূন আহমেদের লেখায়। আর দুই বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বাস। সুতরাং সবাই অনায়াসেই হুমায়ূন পড়তে আরম্ভ করলেন।

» আরও পড়ুন: রূপকথার রাজপুত্র হ্যান্স অ্যান্ডারসন — প্রবন্ধ

মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি

সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ যাত্রা শুরু করেন ১৯৭২ সালে ‘নন্দিত নরকে’র মধ্য দিয়ে। ওই সময় তাঁর বইটি তুমুল জনপ্রিয়তার সাথে সাথে সমালোচকদেরও অনেক প্রশংসা পায়।

কবি শামসুর রাহমান তাঁকে প্রশংসা করে লিখেছিলেন।

হুমায়ূন আহমেদও তখন থেকে সাহিত্যে শক্ত জায়গা করে নিতে থাকেন। যদিও তাঁর যাত্রা সহজ ছিল না। গল্প-উপন্যাসে তাঁর তুলে ধরা মধ্যবিত্ত জীবন অনুযায়ী তিনি নিজেও ছিলেন মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। বাবা ছিলেন পুলিশে চাকরিরত। মা গৃহিণী।

হুমায়ূন আহমেদ রসায়নে অধ্যাপনা করেছেন। পিএইচডি করেছেন আমেরিকার নর্থ ডাকোটায়। দেশে ফিরে তিনি তাঁর স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে যখন আর্থিক টানাপোড়েনে পড়েন তখন কিছু ইংরেজি বই বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। বইগুলোর অনুবাদ অনুসারে নাম হলো ‘দি এক্সরসিস্ট’, ‘অমানুষ’ ও ‘সম্রাট’।

তাঁকে বলা হয় জাদু বাস্তবতার লেখক। তার প্রমাণ মিলে তাঁর রচিত প্রথম দিককার উপন্যাস অচিনপুরে। এই উপন্যাস বাংলাদেশ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গেও প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

যাপিত জীবনে হুমায়ূন আহমেদ অধ্যাপনা করলেও লেখালেখির টানে তিনি স্বেচ্ছায় তা ছেড়ে দিয়ে পুরোদস্তুর লেখক হয়ে যান। তাঁর লেখা হিমু, মিসির আলি, শুভ্র সিরিজের চরিত্র ছাড়াও আরও বহু গল্প উপন্যাস রয়েছে।

জনপ্রিয় সাহিত্যিক

গল্প-উপন্যাসের জগতে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন তিন শতাধিক বই। তবে এই বইগুলোর মধ্যে তাঁর নিজের আত্মজীবনীমূলক লেখাও আছে। তাঁর রচিত উপন্যাসের পাশাপাশি এই আত্মজীবনীও অনেক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

তাঁর লেখা ‘হোটেল গ্রেভার ইন’ আমেরিকায় পিএইচডিরত সময় নিয়ে লেখা হয়। এরপর ‘মে ফ্লাওয়ার’, ‘এই আমি’, ‘কাঠপেন্সিল’, ‘বলপয়েন্ট’, ‘ফাউন্টেনপেন’ ইত্যাদি বইতে তিনি নিজের সম্পর্কে তুলে ধরেন।

তাঁর রচিত উপন্যাসে লেখনশৈলীর পাশাপাশি আছে গল্পের ভিন্ন প্লট, যা সচরাচর নব্বই দশকে নতুন ছিল। তিনি সহজ ভাষায় লিখতেন। তাঁর সহজ ভাষার লেখা তাঁকে জনপ্রিয় হতে বেশ সাহায্য করেছে।

উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ গল্প বলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব স্টাইলে। সেই স্টাইল অনুযায়ী তিনি তাঁর বিশ্বাসের জগৎ আমাদের সামনে মেলে ধরেন। এমনটাই তিনি তাঁর ‘কালো যাদুকর’ বইয়ে বলেছেন — তিনি বিশ্বাসের বাইরে কিছু লিখতে পারেন না।

হুমায়ূন আহমেদ সরল ভঙ্গিতে বাস্তবতার সাথে সাথে প্রকৃতির অনেক বৈচিত্র‍্যপূর্ণ আচরণ তুলে ধরতেন। যেমন, প্রকৃতিতে কাকতালীয় ব্যাপারগুলো মাঝে মধ্যে আমাদের এতই চমকে দেয় যে, আমরা সেগুলোকে শুধু কাকতালীয় ভাবতে অপারগ থাকি। এরকম কিছু প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হুমায়ূন আহমেদ তুলে ধরতে পারতেন।

এটি ছিল তাঁর বিশেষ গুণ।

লেখক হিসেবে তিনি যেমন জনপ্রিয় ছিলেন, তেমনি পাশাপাশি গীতিকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা হয়েও প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তাঁর বানানো চলচ্চিত্র ‘শ্যামল ছায়া’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘আমার আছে জল’ ইত্যাদি মধ্যবিত্ত দর্শকদের সিনেমা দেখতে হলমুখী করেছিল।

» আরও পড়ুন: গল্প লেখার নিয়ম — প্রবন্ধ

জনপ্রিয় সৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্র

হুমায়ূন আহমেদ তাঁর লেখায় তিনটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের চরিত্র নির্মাণ করেছিলেন। এরা হলো — হিমু, মিসির আলি ও শুভ্র। মৃন্ময়ী নামেও একটা কাল্পনিক মেয়ে চরিত্রকে নিয়ে তিনি কিছু উপন্যাস লিখেছিলেন।

তবে তাঁর প্রথম সৃষ্ট চরিত্র মিসির আলি।

মিসির আলি চরিত্রটি সম্পূর্ণই তৈরি হয়েছে লজিকের ওপর নির্ভর করে। মিসির আলি লজিক বা যুক্তির বাইরে কিছু ভাবেন না।

অপরদিকে হিমু তার বিপরীত। অর্থাৎ হিমু অ্যান্টি লজিক নির্ভর চরিত্র। এখান থেকেই বোঝা যায় দুজনেই ভিন্ন চরিত্র, একেবারেই স্বতন্ত্র। তবে শুভ্র চরিত্রটি তার নামের মতোই ভিন্ন।

শুভ্র সবসময় নিষ্কলুষ অনুভূতির মাঝে থাকে, সে নিষ্পাপ।

হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিজীবন

ব্যক্তিজীবনে হুমায়ূন আহমেদ নিজেও কম বৈচিত্র্যপূর্ণ না। তাঁর সৃষ্ট হিমু চরিত্র যেন তাঁকেই স্মরণ করিয়ে দেয় সবসময়। হুমায়ূন আহমেদ যখন সাহিত্যে সম্ভাবনাময় হয়ে ওঠেন তখন অধ্যাপনা ছেড়ে দেন।

এরপর লিখে চলেন একটানা গল্প-উপন্যাস।

সেইসাথে টেলিভিশনের জন্য নাটকও লিখতে থাকেন। তাঁর নাটকগুলোর মধ্যে আছে ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’, ‘অয়োময়’ ইত্যাদি।

হুমায়ূন আহমেদ ঢাকার গাজীপুরে নির্মাণ করেছিলেন তাঁর একান্ত শৌখিন জায়গা নুহাশপল্লী। বেশিরভাগ সময় তিনি সেখানেই থাকতেন। তাঁকে নিয়ে একটা সময় জাপানের টিভি শো ‘হু ইজ হু ইন এশিয়া’তে একটা ডকুমেন্টরি প্রকাশ করা হয়েছিল।

» আরও পড়ুন: প্রেমের মতো — ভালোবাসার গল্প

হুমায়ূন আহমেদের বই নিয়ে আলোচনা

একজন লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ অনেক শক্তিশালী থাকলেও তিনি তাঁর শক্তিকে কি পুরোপুরি ব্যবহার করেছিলেন? এই প্রশ্ন রয়েই যায়। এমনকি তাঁর একনিষ্ঠ পাঠকেরাও তাঁর লেখার গতানুগতিক ধারার সমালোচনা করতে বাদ্ধ হয়।

অনেক পাঠকশ্রেণীর অভিযোগ তিনি একই চরিত্র বহু উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন।

এছাড়া পাঠক সমাজের বাইরেও অনেকে অনেক কথায় বলেন। হিমু চরিত্রটি স্বভাবতই শুরু হয়েছিল আধ্যাত্মিক একটা আবেশ নিয়ে। পাঠক সমাজ শুরু থেকে অর্থাৎ ‘ময়ুরাক্ষী’, ‘দরজার ওপাশে’ কিংবা ‘হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম’ পড়ে যখন অভ্যস্ত তখন তারায় আবার ‘হলুদ হিমু কালো র‍্যাব’, ‘হিমু রিমান্ডে’, ‘হিমুর নীল জোছনা’ প্রভৃতি বইয়ে অতিরিক্ত সহজ ভাষার অভ্যন্তরে কমার্শিয়াল লেখার আবরণ মিশে থাকতে দেখে অত্যন্ত বিরক্ত হন।

এ প্রসঙ্গে একবার লেখক রাহাত খান হুমায়ূন আহমেদকে সরাসরি কঠিন রসিকতার সাথে বলেছিলেন যে, হুমায়ূন আহমেদের লেখার ধার তরবারির মতো হলেও তিনি সেই তরবারি শুধু পেন্সিল কাটতেই ব্যবহার করে গেছেন। এছাড়াও হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর লেখক স্যার আনিসুজ্জামানও তাঁকে নিয়ে দৈনিক সমকাল নামক জাতীয় পত্রিকায় কলাম লিখেন, যেখানে স্পষ্ট বলা ছিল — হুমায়ূন আহমেদ গল্পের বাইরে কখনও কিছু বলার চেষ্টা করেনি।

তারপরও তিনি একজন সম্মানিত লেখক। তাঁর সম্পর্কে সত্যিই অনেক নেতিবাচকতা থাকলেও সাহিত্যে তাঁর অবদানও কম নয়। একটা গোটা জেনারেশনকে বইমুখী করে তোলা সহজ ব্যাপার নয়। তবে তিনি আরও ভালোভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারতেন — এই আক্ষেপ যেন কিছু মানুষের রয়ে যাবে।

পরিশেষে

হুমায়ূন আহমেদ একজন জাদুবাস্তবতার লেখক ছিলেন, যার লেখনীর যাদুতে মূগ্ধ হয়নি এমন পাঠক কমই আছে। সহজপাঠ্য বই হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের একটা বড়ো অংশ পাঠকের তালিকায় যুক্ত হয়েছিল। তাঁর লেখা জনপ্রিয় হলেও কতটা ছাপ রাখবার যোগ্যতা রাখে এ নিয়ে অনেকে দ্বিমত পোষণ করেন।

লেখক জীবনে তিনি লিখেছেন তিন শতাধিক বই। যার মধ্যে উপন্যাসই বেশি। তাঁর লেখা উপন্যাসে জীবনের বাস্তব রূপের সাথে সাথে অনেক মজার কল্পনাও উঠে আসে, যা পাঠককেও আজও আনন্দ দেয়।

১৯ জুলাই, ২০১২ সালে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন। মানুষ হিসেবে তাঁকে তাঁরই সৃষ্ট চরিত্র হিমু কিংবা মিসির আলির থেকে কম মনে করা হতো না।


প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও প্রবন্ধ পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top