ঐশীর জন্য — অভিমানী প্রেমের গল্প

ঐশীর জন্য — অভিমানী প্রেমের গল্প

‘ঐশীর জন্য’ — অভিমানী প্রেমের গল্প। গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। এটি একটি প্রেমের গল্প জনরার গল্প।

গল্পে নীলের বন্ধু ঐশী। ‘ঐশীর জন্য’ গল্পে ঐশী মনে মনে নীলকে বেস্টফ্রেন্ড ভাবলেও নীল কি তা মনে করে? নীল যেন ঐশীকে তেমন পাত্তা দেয় না — মনে হয় ঐশীর। কিন্তু সত্যিটা লুকিয়ে আছে ‘ঐশীর জন্য’ গল্পটিতে।

চলুন, এক পলকে পড়ে নিই ‘ঐশীর জন্য’ গল্পটি।

ঐশীর জন্য | বাপ্পী মাহমুদ

এক.

আইসক্রিমে কামড় বসিয়ে ঐশী বলল নীলকে, “আমি ইদানীং খুব অল্পতেই আবেগী হয়ে যায়।”

ঐশী লক্ষ্য করলো নীল তার কথা না শোনার ভান করছে। একটু যেন বিরক্তও হলো সে। ঐশীর মন খারাপ হয়ে যায়। নীল তার কাছে বেস্টফ্রেন্ডের চেয়েও বেশি। সেই নীল আজকাল অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে।

বিকেল গড়াচ্ছিল। নীল বলে, “চলো উঠি।”
“এখনই?” ঐশী অবাক হয়, “মাত্রই এলাম তো!”
“তাতে কী? টিউশনি আমার জন্য বসে থাকবে ভেবেছো?”
“এই পড়ন্ত বিকেলে টিউশনি পড়ানোর কী দরকার? বিকেলে বাচ্চারা খেলবে।”
“তর্ক করতে ভালো লাগছে না। তুমি না হয় থাকো। আমি গেলাম।”

ঐশী লক্ষ্য করলো নীল সত্যিই উঠে দাঁড়িয়েছে।

ঐশীর কাছে ব্যাপারটা এত নিষ্ঠুর মনে হলো যে, তার চোখে পানি পর্যন্ত চলে আসে। সে অন্যদিকে তাকায়। আর বলে, “তোমাকে আজকাল আমি বুঝতে পারি না!”

দুই.

নীল হাঁটছে। হাঁটতে ভালো লাগছে না। কিন্তু পকেটে টাকা অল্প। যা আছে বুঝেশুনে খরচ করতে হবে। আজকাল সময়টা ভালো যাচ্ছে না তার। আগে পাঁচটা টিউশনি পড়াতো। এখন হাতে গুনে মাত্র তিনটা। এরমধ্যে একটা ছাত্র আবার খুবই একগুঁয়ে। যত শাসন করা হয়, তত পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায়।

রাস্তার দূরত্ব অনেক।

এখন প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ হাঁটতে হবে। এরমধ্যেই হঠাৎ একজন ভিখারি গোত্রের মানুষ এসে হাত পাতলো। নীল জানে তার টাকার স্বল্পতা। তবু মানিব্যাগ বের করলো।

ভাগ্যিস মানিব্যাগ বের করেছিলো। নইলে এই দৃশ্য দেখা হতো না। সে দেখলো মানিব্যাগের ভেতর তিন তিনটা এক হাজার টাকার নোট! নীল অজান্তেই হেসে ফেললো। তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো যে, ঐশী এই কাজটি করেছে।

কিন্তু ঐশী ছাড়া আর কারোরই এটা করার সম্ভাবনা নেই।

ভিখারিকে খুচরো কুড়ি টাকা দিয়ে বিদায় করে সে হাঁটছে। তার মনের আকাশে এখন আর কোনো মেঘ নেই। আর থাকলেও সেটা শ্বেত শুভ্র সূর্যের আলো মাখা ঝকঝকে মেঘ।

মন ভালো হবার সাথে সাথে তার ঐশীর প্রতি একটু খারাপ লাগাও কাজ করলো। বেচারি অন্য কোনোদিন কিছু চায় না। আজ কেন জানি এসেই বলল আইসক্রিম খাবে। নীলের তখন থেকেই মেজাজ খারাপ হলো।

ঐশী বেছে বেছে দামি আইসক্রিমটাই নেয়।

নীল মানিব্যাগ বের করে তখন টাকা দিতে যাবে, সেসময় কেউ একজন তাকে ডাকলো — তার এক ছাত্রের বাবা। এই ছাত্রটিই পড়াশোনা করে না। নীল পাংশুবর্ণ মুখে উঠে যায়। দুশ্চিন্তায় সে মানিব্যাগ ফেলে রেখে উঠে পড়ে।

আর তখনই ঐশী টাকাগুলো মানিব্যাগে গুজে দিয়েছে — সে বুঝতে পারে।

» আরও পড়ুন: সবই ছিল খেলা — থ্রিলার গল্প

তিন.

সন্ধ্যার পর আজ নীলের কোনো কাজ নেই।

সেসময় ঐশীকে ফোন করা যাবে। তাকে সরি বলতে হবে। মনে মনে আরও অনেক কথা গুছিয়ে নিচ্ছিলো নীল। এখন সে একজন ছাত্রকে পড়াচ্ছে। এসময়ই ঐশীর ফোন এলো। সে লাইন কেটে দেয়।

পাল্টা ম্যাসেজ দিয়ে জানায় — একটু পরই সে নিজে যোগাযোগ করবে। কিন্তু ঐশী সেই ম্যাসেজ দেখল কিনা কে জানে ফোন প্রায় সাথে সাথেই আবার বেজে ওঠে। নীল এবার কিছুটা বিরক্ত হয়। আর ফোন সুইচড অফ করে দেয়।

কিন্তু নীল জানতো না ফোনের ওপাশে কী ঘটে গেছে। সে যখন পড়ানোর পর বের হয়, তখন ফোনের সুইচ অন করে। তারপর ঐশীকে ফোন দেয়। কিন্তু ফোন ধরে অন্য কেউ — একটা অচেনা মেয়ে।

মেয়েটি বলল, “আপনি কি নীল আহসান?”
“জ্বী বলছি!”
“দ্রুত পায়রা চত্ত্বর এলাকায় আসুন প্লীজ!”
“পায়রা চত্ত্বরের কোথায়?”
“স্বর্ণপট্টির গলিতে। আমি বাসার অ্যাড্রেস টেক্সট করে দিচ্ছি।”

নীলের বুকটা কেমন করতে থাকে। কারণ মেয়েটা কথা বলছে কান্নার স্বরে। নীল কিছু বলতে চাইলো কিন্তু ততক্ষণে মেয়েটি লাইন কেটে দিয়েছে। আর সাথে সাথে মেসেজ টোন বাজে ফোনে — অ্যাড্রেস ইনবক্স করা হয়েছে। নীল দ্রুতই পৌঁছায়।

ঐশী স্বর্ণপট্টি এলাকার লেডিস হোস্টেলে থাকে। এটা নীল জানতো না। ঐশী চাকরি সূত্রে এখানে থাকতে বাধ্য। নীল এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু ঐশীর তাতে কিছু যায় আসে না।

কারণ সে এখন অজ্ঞান হয়ে আছে!

চার.

ঐশীকে হাসপাতালে নেবার পথেই তার জ্ঞান ফিরল। সে নীলকে দেখে ফ্যাকাশে হাসি হাসে। তারা তখন একটা অটোরিকশাতে বসে আছে। সাথে ঐশীর সেই নাম না জানা বান্ধবীও আছে। নীল প্রচন্ড ক্লান্ত অনুভব করে।

আর ঐশী?

সে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। নীল এ কারণে অভিমান করে। যদিও সে জানে অভিমানের সময় এখন না।

“ব্যাপারটা হাস্যকর,” নীল গম্ভীর স্বরে বলে, “কারণ তুমি হাতে ছুরি নিয়ে কব্জির শিরা কাটতে চেয়েছিলে। কিন্তু ছুরির অল্প আচড়েই জ্ঞান হারালে।”

বলেই নীল অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

ঐশী তার হাতের দিকে তাকায়। সেখানে ইনজুরি টেপ লাগানো হয়েছে। অটোরিকশাও তার জ্ঞান ফিরতেই হোস্টেলের দিকে যেতে শুরু করলো।

“আমি বাধ্য হয়েছিলাম,” ঐশীর কথা শুনে ঘুরে তাকায় নীল। আর ঐশীও তাকিয়ে থাকে নীলের চোখে। ঐশীর এখন অনেক কিছু বলবার আছে।

» আরও পড়ুন: শূন্যতায় খুঁজি তোমায় — নতুন রোমান্টিক গল্প

পাঁচ.

“আমি যেখানে চাকরি করি সেখানে অফিসের বস খুবই স্ট্রিক্ট,” বলল ঐশী, “এরমধ্যে বসের এক আত্মীয় এই চাকরিতে জয়েন করবে। আমার পোস্টে তার জয়নিং হবে, তাই বস আমায় ডেকে পাঠান তার রুমে। আমি যেতেই তিনি বলেন, তোমার চাকরি বাঁচানোর একটা উপায় আছে।

“আমি জানতে চাই, কীভাবে স্যার?
“স্যার বললেন যে, তার সাথে একরাত বেড শেয়ার করতে হবে। এটা শুনেই আমি স্তব্ধ হয়ে যায়। আর তাকে যা ইচ্ছে গালাগাল করে চাকরি ছাড়ি। কিন্তু আমার বিপদ যে আমি নিজেই তা জানতাম না!”

নীল অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
ঐশী দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আর বলে, “চাকরি ছাড়ার পর আমার বাবা খুব রাগারাগি করছেন। বলছেন, আমি যেন বাসায় না ফিরি। আমার বাবা রোজ মদ খান। নিম্ন মধ্যবিত্ত এই বাবাকে সামলানোর জন্য মা নেই। আমার মা ছোটবেলা থেকেই পরপারে।”

ঐশী চোখ মোছে। আর ঐশীর ব্যথায় কাতর হয় নীল। ঐশী এবার অভিমানী চোখে তাকায়। বলে, “বাবাকে কীভাবে বলব বাজে প্রস্তাবের জন্য চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছি? আর বললেও তার কী আসে যায়? তার তো প্রয়োজন নেশার বস্তু!”

নীল হাত বাড়ায়, ছুঁতে চায় ঐশীর চোখের পানি। কিন্তু নাগাল পাবার আগেই ঐশী এক ঝটকায় হাত সরিয়ে দেয়। বলে, “আমি আজ সমস্ত পুরুষ সমাজকেই ঘৃণা করি!”

ছয়.

নীল আরও বেদনা অনুভব করে। নিজের জন্য নয়, ঐশীর জন্য। আহা, মেয়েটা এ কেমন বিপদে পড়ল! নীল অস্ফুট স্বরে বলে, “আমি তোমার রাগের যোগ্য নই ঐশী!”

ঐশী তাকায়। বলে, “তবু তোমার ওপরেও আমার আকাশ সমান অভিমান। সুইসাইড অ্যাটেম্পটের আগে তোমার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম। নিজের দুঃখগুলো শেয়ার করে হাল্কা হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি বাস্তবতা ছাড়া আর কিছুই বুঝো না। ঐসময় নিশ্চয়ই ঘুরেফিরে আমার দোষই বার করতে তুমি। তাই আমি এই পথ বেছে নিয়েছি।”

ঐশী কাঁদতে থাকে। শব্দ করে কাঁদে। তবে তার কথা তখনও শেষ হয়নি। সে আরও বলল, “আমি কোনো সাহায্য চাইবার উদ্দেশ্যে তোমায় ফোন করিনি। শুধু জানাতে চেয়েছিলাম — আমি খুব অসহায়।”

অটোরিকশা গন্তব্যে এসে থেমেছে।

ঐশী কান্না থামায়। বান্ধবীকে নিয়ে নামে আর নীলকে ফিরে যেতে অনুরোধ জানায়। বলে, “আমার জন্য সাহায্যের হাত বাড়ানোর জন্য থ্যাংকস। তবে আমি চাই, এই বন্ধুত্ব এখানেই শেষ হোক।”

নীল স্তব্ধ হয়ে গেল। তার অনেক কিছু বলার ছিল। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না। সে নীরবে ঘুরে দাঁড়ায়। বারবার পেছন ফিরে ঐশীকে দেখতে মন চাইছিল। কিন্তু সে জানে এখন ফিরে আসা অনর্থক।

» আরও পড়ুন: তখন শেষ বিকেল — গভীর ভালোবাসার গল্প

সাত.

আজ বহুদিন পর নীলকে ফোন করলো ঐশী। নীল চমকে ফোন রিসিভ করে। ওপাশ থেকে আওয়াজ আসে, “সরি!”

নীল আহ্লাদী অভিমানে ভেসে আছে তখন। বলল, “শুধু সরিতে কাজ হবে না। আমি তোমায় একটা আবদার করতে চায়। তুমি তাতে রাজি হলেই সব দোষ ভুলে যাব।”

“আবদার?” ঐশী অবাক হয়, “তোমার আবদার?”
“হুম। আমি তোমায় এই ক’দিন অনেক মিস করেছি। তাই আমি চাই তুমি আমার সাথে দেখা করো।”
হেসে ফেললো ঐশী। নীল মূগ্ধ হয় সে হাসিতে। আর নিজ অজান্তেই বলে, “আমরা কি শুধুই বন্ধু?”

“এই, কী বললে?” ঐশী যেন মিষ্টি শাসন নিয়ে জিজ্ঞেস করে।
আঁতকে ওঠে নীল, বলে, “কিছু না!”
“ভীতু একটা!” ঐশী অভিমান করে, “মনের কথা জানাতে এত ভয় করা উচিত না!”

নীল অবাক হয়। গাঢ় ভালো লাগা নিয়ে বলে, “তুমিও কি…”
“হ্যা,” ঐশী এক নিঃশ্বাসে বলে, “আমিও তোমায় ভালোবাসি। অনেক আগে থেকেই তোমায় ভালোবাসি!”

নীল উদাস বোধ করে। এক মুহূর্তের জন্য বদলে যায় তার পৃথিবী। আর তার উদাসীনতায় ছিল ভালো লাগা এবং ভালোবাসার রঙিন ছোঁয়া। যে ভালোবাসা লেখা আছে শুধু ঐশীর জন্য, শুধুই ঐশীর জন্য!


গল্প: ঐশীর জন্য

লেখা: বাপ্পী মাহমুদ 

প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top