পারাপার — বই রিভিউ

পারাপার — বই রিভিউ

বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের অবদান অনেক। আজ তার সৃষ্ট চরিত্র হিমুর পারাপার উপন্যাস নিয়ে আমি হাজির হয়েছি বই রিভিউ লিখতে। হিমু চরিত্রকে কমবেশি সবাই চিনেন। তবু কেউ না চিনলেও ক্ষতি নেই — আমি বই রিভিউটি এমনভাবে লিখেছি, যাতে সবারই বুঝতে সুবিধা হয়।

পারাপার — বই রিভিউ

হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্র হিমু। তাকে নিয়ে লেখা বইয়ের নাম পারাপার। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৫ সালে। হিমুর বিশেষত্ব অনুযায়ী এই বইয়ে অনেক বিচিত্র ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

হিমু বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর একটি।

হুমায়ূন আহমেদ এর সেরা বই সমূহ অনুযায়ী এই বইয়ে হিমুকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি উপন্যাস লেখা হয়েছে। উপন্যাসে একজন বৃদ্ধের বাঁচার আকুতি শুনে ছুটে যায় হিমু। অচেনা সেই বৃদ্ধ জটিল রোগে আক্রান্ত। হিমুকে তিনি সবই বলেন। আরও বলেন, তাকে বাঁচিয়ে দিলে হিমুকে তিনি খুশি করে দিবেন। অর্থাৎ হিমু যা চাইবে তিনি দিবেন।

কিন্তু হিমু কী ভাবছিলো? হিমুর আচরণ এখানে সহজ ছিল, স্বাভাবিক ছিল না। তিনি লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার আপনার বয়স কত?”
লোকটি জানালেন — ৫৮ কিংবা ৫৯।

হিমু বলল, “অনেকদিনই তো বাঁচলেন।”

হিমুর এমন কথায় ভদ্রলোক যেন আহত হন। তবে হিমুর এমন আচরণ নতুন নয়। তারপরও উপন্যাস এগিয়েছে বৃদ্ধ লোকটির রোগ মুক্তির অভিযান নিয়ে। হিমু চেষ্টা করে গেছে বৃদ্ধের পরিকল্পনা অনুযায়ী।

» আরও পড়ুন: অন্ধকার পেরিয়ে — শিক্ষনীয় গল্প

পাঠ প্রতিক্রিয়া

ভদ্রলোকের নাম ইয়াকুব আলি। বই পাঠের সুবিধার্তে তার রোগটি এখানে স্পেসিফিক্যালি না বলি। তিনি থাকেন পুরনো ঢাকায়। হিমুর ধারণা ছিল বিত্তশালীরা সবসময় ঢাকার ধানমন্ডি কিংবা গুলশান থাকেন।

তার ধারণা ভুল প্রমাণ করে গলি তস্য গলি পেরিয়ে যে বিশাল বাড়ি চোখের সামনে এলো তা ইংল্যান্ডে সহজেই ক্যাসেল বলে চালিয়ে দেয়া যায় বলে হিমুর ধারণা।

আমার মতামত অনুযায়ী, এই উপন্যাসে হিমুর আচরণ অন্যান্য বইয়ের মতই একইসাথে সহজ এবং অদ্ভুত ছিল। তবে কিছু জায়গায় হিমুর অদ্ভুত আচরণ বইয়ের মূল গল্পের সাথে প্রাসঙ্গিক ছিল বলে মনে হয় না।

যেমন, একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে হিমু চাইলো টেলিফোনে রূপার সাথে কথা বলবে। রূপা সেই মানবী যে হিমুকে খুব করে চাইলেও হিমু ধরা দেয় না। টেলিফোনে কথা বলতে হিমু কাগজে একটা স্লিপের মত লিখলো।

দোকানদার অবাক হয়ে টেলিফোন এগিয়ে দেয়।

তবে এর ব্যতিক্রম ঘটনাও আছে, যা উপন্যাসের সাথে প্রাসঙ্গিক এবং খুবই রোমাঞ্চকর। উপন্যাসে ইয়াকুব আলির মেয়ের নাম মিতু। অত্যন্ত রূপবতী এই মেয়েটির আচরণ হিমুর প্রতি খুবই রূঢ়। প্রথম সাক্ষাতেই সে কথার ইঙ্গিতে হিমুকে বোঝায় ইয়াকুব আলির অসুস্থতার সুযোগ নিচ্ছে হিমু।

একজন অসুস্থ মানুষ বাঁচার আকুতি নিয়ে সব কিছু দিয়ে দিতে পারেন। হিমু সেই সুযোগটাই নিচ্ছে। মিতুর কথায় হিমুর ভাবান্তর হয় না। তবে সে জানায়, আধ্যাত্মিকতা পৃথিবীতে আছে এবং তা সে বিশ্বাস করে। প্রমাণ স্বরূপ সে একটা ভবিষ্যদ্বাণী করে। আর তা মিলেও যায়।

বইয়ে হিমুর কার্যপ্রণালী জটিল ছিল না। আবার এতটা প্রকাশিতও ছিল না যে, মানুষ বুঝবে সে সহজ স্বাভাবিক চরিত্র।

পারাপার উপন্যাসের ইতিবাচক দিকগুলি

উপন্যাসটি প্রাণবন্ত। প্রথম পাঠেই পাঠককে বইটি সহজ ভাষার আঙ্গিকে গভীরে নিয়ে যাবে। বইটিতে হিমুর চিন্তাভাবনা ও কার্যপ্রণালী বেশ গভীর ছিল। সে যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন তা এই বইয়ে প্রকাশ পেয়েছে।

যেমন, ইয়াকুব আলির ম্যানেজার মইন খান বললেন যে, সিঁড়িতে যাবার সময় শব্দ না করতে। হিমু তখন জানায়, তাকে কোলে করে ঘরে নিয়ে গেলেই ভালো হবে। মইন খান এই রসিকতায় অপমানিত হলেন না।

হিমু যুবক বয়সী মইন খানের প্রতি তাই মূগ্ধ হলো। আর সিঁড়িতে কার্পেট দেয়া, সে চেষ্টা করেও শব্দ করতে পারলো না। এদিকে ইয়াকুব আলির ঘরে ইয়াকুব আলি এতটাই নিষ্প্রাণ হয়ে শুয়ে আছেন বিছানায়, যা দেখে মনে চাপ সৃষ্টি হয়।

ন্যাপথলিন আর অডিকোলনের মিশ্র গন্ধ হিমুর ভালো লাগছিলো না।

এই ডিটেইলগুলি প্রমাণ করে হিমু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন। তার ভাবাবেগ অনেক ম্যাচিউর। সেইসাথে সে জটিল বিষয়কে সহজভাবে প্রকাশ করার দারুণ নিদর্শনও দেখিয়েছে। যেমন, ইয়াকুব আলিকে বাঁচানোর স্বার্থেই সে একটা অভিযানে নেমেছে।

সেই অভিযান অনুযায়ী সে ভালো মানুষ খুঁজছে। তার মেস বাড়ির মনোয়ার উদ্দিন প্রাথমিক দৃষ্টিতে ভালো মানুষ। হিমুকে দেখলে সহজভাবে কথা বলেন। মেসে ভালো রান্না হলে আন্তরিকতার সাথে উদ্যোগ নেন। একদিন আবার হিমুকে বললেন যে, মেসের রান্নার জন্য চাঁদা দিতে।

হিমু যখন বলে তার পকেট শূন্য তিনি তখন মানিব্যাগ দেখতে চান। সহজ গলায় বলেন, এত সুন্দর মানিব্যাগ খালি রেখে ঘুরতে খারাপ লাগে না?

এরকম সহজ আচরণের মানুষকে শেষ অবধি হিমু ভালো মানুষের কাতারে রাখেনি। কারণ লোকটি হিমুর ভাষায় তরল স্বভাবের। মেসে কাজের বুয়া ময়নার মায়ের সাথে তার প্রায়ই কাছাকাছি বসতে দেখা যায়। সকলের অগোচরে এই বসতে চাওয়াটা অসামাজিকতার প্রকাশ।

হিমু এই ব্যাপারগুলো লক্ষ্য করে। খুব তীক্ষ্ণভাবে লক্ষ্য করে। যা থেকে বোঝা যায় উপন্যাসে হিমু একইসাথে বিশেষ ও মূল চরিত্র।

» আরও পড়ুন: অচেনা আতংক — শিক্ষনীয় থ্রিলার গল্প

পারাপার উপন্যাসের নেতিবাচক দিকগুলি

প্রত্যেক বইয়েই ভালো লাগা মন্দলাগা থাকে। এই বইটাও তার ব্যতিক্রম নয়। বইটিতে কিছু জিনিস দৃষ্টিকটু ও অর্বাচীন লেগেছে আমার। তাই বলে আমি আমার দৃষ্টিভঙ্গি কারও ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি না। কিন্তু কনসিডারের নিজ দায়িত্ব সবারই।

বইয়ে হিমু শেষ পর্যন্ত তার পরিকল্পনা অনুযায়ী কীভাবে সফল হলো বা ব্যর্থ হলো তা সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করা নেই। বিস্তর ফাঁক রয়ে গেছে এই অংশে। আবার ইয়াকুব আলির ম্যানেজার হিমুকে শুরু থেকেই ভন্ড ভেবে আসছেন৷ ইয়াকুব আলির মেয়ে মিতুর দৃষ্টিভঙ্গিও তাই।

কিন্তু তাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তারা হিমুর ওপর যথেষ্ট কঠোর হতে পারতো।

হিমু অদ্ভুত চরিত্র। তার কাজকর্ম অগোছালো হলেও বইয়ের ভাষাশৈলী ও গল্পের আদলে তা যেন রূপকথা। তবু উপন্যাসের শুরুতে পাখি রহস্য নিয়ে লেখা এগুলেও পরবর্তীতে এর কোনো সংযোগ ছিল না মূল উপন্যাসে।

কিন্তু এইটুকু ছাড়া পুরো উপন্যাসই আমার কাছে দারুণ মনে হয়েছে।

পারাপার উপন্যাসের শক্তিশালী চিন্তাভাবনা

হিমু জটিল চিন্তার মানুষ না। সে সহজভাবে জটিল চিন্তাকে গ্রহণ করে৷ তার প্রশ্ন, তার ইঙ্গিত আর মনোভাবে এক রহস্য তাই সর্বদা লক্ষ্যণীয়।

বইয়ের একটি অংশে একজন কেরানী যখন বলেন জমির নামজারিতে ভণ্ডামি করে টাকা কামানো যায়, তবে তাতে অনেক সময় লাগে। তখনই হিমু বলে যে, নামজারিতে শুধু একজনের নাম লিখলেই তো হয়। তাতে বছরের পর বছর কাজ পেন্ডিং থাকে না।

লোকটি অবাক হয়ে জানতে চান — কার কথা বলছেন? হিমু তখন সরাসরি সৃষ্টিকর্তার নাম বলেন। কারণ জমির ওপর তাঁরই সর্বাধিক অধিকার। সত্যি বলতে হিমুর এই দৃষ্টিকোণ অনেক শক্তিশালী ছিল।

তবে হিমুর বইতে হিমু একাই যে সবকিছু বলে যায়, করে যায় তা কিন্তু না। যেমন, হিমু আর একজন ওসি সাহেবের আলাপ হচ্ছিলো। ওসি ভদ্রলোক যখন শুনলেন হিমু পবিত্র মানুষের সন্ধান করছে তখন বললেন, এই কাজটি বাদ দিন৷ পবিত্র মানুষ কেউ না। আমি আমার জীবনে সবচেয়ে পবিত্র মানুষ দেখেছি আমার বাবাকে। তাকে দেখলে লোকের দিন ভালো যেতো। সেই বাবার কাজ ছিল কাজের মেয়েদের প্রেগন্যান্ট করে ফেলা। পবিত্র হবার থেকে সাধারণ মানুষ হওয়ায় ভালো।

সত্যি বলতে মানুষের ভেতরের আলো ও অন্ধকার দিক একইসাথে এত সাবলীলভাবে দেখানোটাও একটা বিশেষ ব্যাপার। হিমুর বইয়ে এই বিশেষ ব্যাপারগুলো সবসময়ই থাকে।

» আরও পড়ুন: রিলেশনশিপ — এক অদ্ভুত ভালোবাসার গল্প

পারাপার নিয়ে আমার একান্ত মতামত

হুমায়ূন আহমেদ একজন শক্তিশালী লেখক। তা অস্বীকার করবার উপায় নেই। তার লেখা পড়ে শেষ করলে আজও আমি রোমাঞ্চিত হই। পারাপার তেমনই একটা বই। বিশেষ করে হিমু সিরিজের শুরুর দিককার বইগুলোর মাঝে একটা ফ্যাসিনেটিং টোন ছিল।

পারাপার বইটিকে যদি রেটিং করতে বলা হয় তবে আমি দেব ৮.৫/১০।

আর তাছাড়া এই বইয়ে বিশেষভাবে হিমুর কর্মকান্ডে তাকে নিরপেক্ষ বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। যা ছিল প্রাসঙ্গিক। হিমু এই উপন্যাসে ইয়াকুব আলিকে প্রাধান্য দিয়ে তার কাজ করে গেছে। বিনিময়ে নিজের স্বার্থ দেখেনি।

কিন্তু আধ্যাত্মিকভাবে হিমুর সকল প্রচেষ্টা ঠিকই মিলে যায়। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়াল লক্ষ্য করতে হিমু সর্বদায় সিদ্ধহস্ত। এই বইয়েও একেবারেই তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

পবিত্র মানুষের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ রূপ একইসাথে প্রকাশ করাটা ভীষণ রকমের শক্তিশালী আর্টিস্টের কাজ। হুমায়ূন আহমেদ এই কাজটি হিমুকে দিয়ে ঠিকই আদায় করে নিয়েছেন৷ উপন্যাস তাই এগিয়েছে তার সাবলীল গতিতে।

পরিশেষে

হিমু চরিত্র আমাদের সকলেরই কমবেশি পছন্দের। তার ভেতরে সত্যকে খোঁজার একটা চেষ্টা আছে। সেইসাথে সত্যকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার ও সত্য প্রকাশের সৎ সাহসও তার আছে। এইসবের বিশেষ প্রমাণ পারাপার বইটি।

বইয়ে অনেকভাবেই প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালকে ম্যানিপুলেট রূপে প্রকাশ করা হয়েছে।

যা প্রমাণ করে হিমু প্রকৃতির এক বিশেষ নিদর্শন। হিমুর এন্টি লজিক ক্ষমতা যেন প্রকৃতির দেয়া বিশেষ উপহার। যার মধ্য দিয়ে যেন হিমুর উপন্যাসে প্রকৃতি নিজেকেই প্রকাশ করেছে।


প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও বই রিভিউ পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top