সাদাত হোসাইন এর বই রিভিউ — ‘তোমার নামে সন্ধ্যা নামে’। বইটির প্রকাশকাল একুশে বইমেলা ২০২১ সাল। প্রকাশনী হলো অন্যপ্রকাশ। বইটির মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ২২৪টি। কভার মূল্য ৫০০ টাকা।
তোমার নামে সন্ধ্যা নামে — বই রিভিউ
এই বইয়ে সাধারণ চরিত্রদেরকে অসাধারণভাবে তুলে ধরার একটা সুন্দর কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। বইটি সরাসরি থ্রিলিং ফিল না দিলেও অনেক সাসপেন্স ড্রামা আপনাকে আকৃষ্ট করবে।
বিশেষ করে ফজলু মিয়ার চরিত্র আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে। কখনও কখনও মনে হবে উপন্যাসের মূল চরিত্র সে-ই।
শুরুর অংশ
সাদাত হোসাইন রচিত এই বইটি হলো একটি উপন্যাস। উপন্যাসের গল্পটি সহজ ভাষায় রচিত হয়েছে। শুরুতে আমরা একটি মেয়ের অসহায় মুহূর্ত লক্ষ্য করি। মেয়েটির চারপাশে কিছু বখাটে যুবকের চোখ ঘুরছে।
আর মেয়েটি রাতের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হাইওয়ের নির্জন সেতু দিয়ে হাঁটছিল। সেতুর নিচে কালো কুচকুচে জল। নারী সুলভ প্রবৃত্তি অনুযায়ী মেয়েটি বখাটেদের দেখে বিপদ বুঝতে পেরেছিল।
বই এর শুরুর এ অংশে আমরা দেখি বখাটেরা তার নীল পাড়ের সাদা শাড়ির আঁচল ধরেছে।
মেয়েটি ভয় পায়। কিন্তু তার চোখেমুখে ভয়ের তেমন উদ্রেক দেখা যায় না, যতটা দেখা যাওয়া উচিত। এজন্য ডিরেক্টর ‘কাট’ বলে ওঠে। হ্যাঁ, এতক্ষণ যা ঘটেছে সবই শুটিং ছিল।
নাটকের শুটিং অনুযায়ী ডিরেক্টর রায়হান দৃশ্যটি সম্পর্কে নায়িকা নদীকে জানায় — তার চোখে ভয়টা তেমন ফুটে ওঠেনি। এদিকে নদী একই দৃশ্যে বারবার অভিনয় করেছে, তার এখন বাড়ি যাওয়া জরুরি।
» আরও পড়ুন: অভিমান নিয়ে ৫টি কবিতা
উপন্যাসের সিনোপসিস
উপন্যাসের গল্পটি শুরু হয় বইটির নায়িকা নদীকে দিয়ে। নদী একজন নাটকের অভিনয় শিল্পী। একদিন নাটকের ব্যাপারে কথা প্রসঙ্গে ডিরেক্টর রায়হান প্রযোজকের প্রসঙ্গ আনে। বই থেকে আমরা তখনই সরাসরি প্রযোজকের নাম জানতে পারি না।
তবে সে যে পেশায় সদরঘাটের মাছ ব্যবসায়ী তা জানা যায়। নদী লক্ষ্য করেছে ইদানীং রায়হান নারীদের শ্লীলতাহানি ঘটবার গল্প নিয়ে নাটক নির্মাণ করছে। সে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছিল বলেই প্রযোজকের প্রসঙ্গ আনে রায়হান।
কারণ প্রযোজক ফজলু মিয়ায় এ ধরনের গল্প মুখে বলে শোনাতো, আর রায়হান গল্পগুলো স্ক্রিপ্ট আকারে সাজাতো। এবার আসা যাক নদী প্রসঙ্গে। সে একজন মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে, ছোটোবেলা থেকেই থিয়েটার অভিনয় করে তার প্যাশন বা ভালো লাগার কাজের প্রতি ডেডিকেশন দেখিয়ে আসছে।
সেই নদীর বাবা হঠাৎ মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে রক্তক্ষরণের কারণে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন কিছুদিন। কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয়নি। মাঝখান থেকে তার প্যারালাইজড অবস্থা দেখা দেয়।
বলা বাহুল্য, নদী এখন পরিবারের সবচেয়ে দায়িত্বশীল নারী। সে একাই নিজের খরচে বাবার চিকিৎসা খরচ বহন করে। নদীর ছোটো বোন নিতু। নিতু একসময় তার সহপাঠী অন্তুর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, অতঃপর তার প্রেগন্যান্সির খবর উঠে আসে।
এখান থেকেই শুরু হয় গল্পের ট্র্যাজেডি।
তবে গল্পের মূল টুইস্ট আর ড্রামা ছিল ফজলু মিয়া। যে ফজলু মিয়ার কারণে নদী আর ডিরেক্টর রায়হানের প্রেমের সম্পর্কে ফাটল ধরে। পরে অবশ্য নদী আরেক অভিনয়শিল্পী সজলের সাথে সম্পর্কে জড়ায়।
তবে ফজলু মিয়ার চরিত্রটি বুঝিয়ে দেয় — তার ভেতর ভালো গুণের চেয়ে খারাপ গুণ বেশি হওয়ায় তাকে বিপদে পড়তে হয়েছে। বইটিতে আরও দেখা যায় শায়লা বেগম, হেলাল, খলিফা আকিব এবং শশধরের মতো স্বতন্ত্র চরিত্রদের।
সবমিলিয়ে উপন্যাসটি বেশ প্রশংসিত। তবে ব্যক্তিগতভাবে উপন্যাসটি আরও গোছানো হতে পারতো বলে আমার ধারণা।
» আরও পড়ুন: বদলে যাবার দিনে — মুক্তগদ্য
উপন্যাসটি কাদের জন্য
বইটি অনেক সহজ ভাষার উপন্যাস। এটাই সবার আগে চোখে পড়ে। সুতরাং যারা নতুন বই পড়া শুরু করেছেন তাদের এটি ভালো লাগবে। বিশেষ করে বইটির ড্রামা ও সাসপেনশন অনুযায়ী এটি টিনএজারদের প্রিয় হয়ে উঠবে।
আর সবচেয়ে বড় কথা বইটি প্রিয়জনদের গিফট দেবার ক্ষেত্রে অনেক রেকমেন্ডেড।
বই এ কিছু কবিতা আছে, যা কবিতাপ্রেমীদেরও আকৃষ্ট করবে। তাই সব মিলিয়ে বইটি সহজ, সুন্দর ও আগ্রহ ধরে রাখার মতো ড্রামাটিক। উপন্যাসের শুরুটাও হয়েছে ড্রামা দিয়ে, যা পাঠক ধরে রাখার জন্য উপযুক্ত।
এছাড়াও উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রেরই আলাদা আলাদা গল্প রয়েছে, যা ভালো লাগার উন্মেষ তৈরি করে। সংগ্রামী মধ্যবিত্ত নারীদের জন্য উপন্যাসটি ভালো লাগার ও অনুপ্রেরণার। বইটিতে একটা নারী চরিত্রের স্বপ্নে বাধা প্রদান করা হয়। তারপর পরে সেই নারীর স্বপ্নই হয়ে ওঠে তার পরিবারের দায়িত্ব।
এরকম আরও উপন্যাসে বেশকিছু এলিমেন্টস আছে, যা পাঠকদের মূগ্ধ করবে।
নিজস্ব পাঠ প্রতিক্রিয়া
আমার কাছে উপন্যাসটি বেশ ভালো লেগেছে। বই এর চরিত্র বিন্যাস কৌশল, একে-অপরের প্রতি স্বতন্ত্র অনুভূতি বেশ স্পর্শকাতর ছিল। নদীর সাথে ফজলু মিয়ার সম্পর্ক নিয়ে রায়হানের সাথে নদীর ভুল বোঝাবুঝি পাঠক হিসেবে বেশ স্পর্শ করে।
সেইসাথে সজলের মতো সৃষ্টিশীল চরিত্রকে পেয়ে নদীর জীবন ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া — এটাও যেন বই এর টার্নিং পয়েন্ট। তবে বইটির সবচেয়ে ভালো লাগার চরিত্র নদী মেয়েটি। তার চরিত্রের বিশেষ দিক দায়বদ্ধতা ও সরলতা। মেয়েটি সরল মনের হলেও অনেক কঠিন পরিস্থিতি তাকে মোকাবিলা করতে হয়।
তবে মূল উপন্যাসে নিতুর ট্র্যাজেডি আপনার মনকে নদীর থেকে হঠাৎ ডাইভার্ট করে নেবার ক্ষমতা রাখে। আর নিতুর জীবন ও তার সরল মনের ভুল আপনাকে বুঝিয়ে দেবে তার বোকামির কারণ যেন সে নিজেই।
সবমিলিয়ে উপন্যাস হিসেবে সাদাত হোসাইন তার গল্প বলার সর্বোচ্চ কৌশল এই বই এ ব্যবহার করেছেন। যদিও কিছু জায়গায় কিছু ঘটনার উদ্দেশ্য ও চালচিত্র খাপছাড়া মনে হয়েছে। এছাড়া উপন্যাসের আর কোনো নেতিবাচক দিক ছিল না তেমন।
» আরও পড়ুন: হুমায়ূন আহমেদ — শুধুই কি জনপ্রিয়?
উপন্যাসের বিশেষ উক্তি
বইটাতে বিশেষ কিছু উক্তি ছিল, যা বিশেষভাবে স্পর্শ করে। তন্মধ্যে উপন্যাসের একটা পর্যায়ে নদীর বলা কথা হৃদয়ে একইসাথে আবেগী ও সুচিন্তায় স্পর্শ করে। যেমন, বই এ নদী সম্পর্ক নিয়ে একটা বিশেষ উক্তি বলে। উক্তিটা ছিল যে, কে কাকে কতখানি ভালোবাসে তার ওপর সম্পর্ক নির্ধারিত হয় না। সম্পর্ক নির্ধারিত হয় শ্রদ্ধার ওপর। ভালোবাসাহীন সম্পর্ক শ্রদ্ধার কারণে টিকে যেতেও পারে। কিন্তু শ্রদ্ধাহীন ভালোবাসার সম্পর্ক টিকতে পারে না।
ব্যক্তিগতভাবে এই উক্তিটি আমায় শুধু স্পর্শই করেনি, বরং একইসাথে আমার চিন্তাশক্তিকেও স্পর্শ করেছে। সেইসাথে মনে হয়েছে এই একটি উক্তিতেই বুঝি সমগ্র উপন্যাসের সিনোপসিস উঠে এসেছে।
উপসংহার
সাদাত হোসাইন এর ‘তোমার নামে সন্ধ্যা নামে’ বইটি পড়বার জন্য একটি বিশেষ বই। এখানে সাধারণ ও অসাধারণ চরিত্র মিলিয়ে একটা স্বতন্ত্র গল্প বলা হয়েছে। যে গল্পে সাহিত্য অনুরাগী মানুষেরা ড্রামা ও সাসপেন্স খুঁজে পাবেন।
উপন্যাসে নদী চরিত্রের জন্য যেমন মায়া তৈরি হবে, একইসাথে ফজলু মিয়া, রায়হান ও নিতুর জন্যও স্বাতন্ত্র্যবোধ তৈরি হবে।
প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও বই রিভিউ পড়তে শব্দশৈলী পোর্টাল ও ফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।



