প্রেমের মতো — ভালোবাসার গল্প

প্রেমের মতো — ভালোবাসার গল্প

প্রেমের মতো — ভালোবাসার গল্প। গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। ‘প্রেমের মতো’ গল্পটি ভালোবাসার গল্প জনরার একটি গল্প।

এই গল্পে রোহান একটি ভাবুক হৃদয়ের বেখেয়ালি ছেলে। যার অন্তরে আছে শ্রাবণীর প্রতি প্রেমের মতো ভালোবাসা। কিন্তু শ্রাবণীর অবজ্ঞা অপমান সে সহ্য করতে পারে না। প্রেমের মতো ভালোবাসা থাকলেও রাগ হয় তার নিজের ওপর।

এতকিছুর পরও সে হাল ছাড়ে না। তাই প্রেমের মতো একটি রোমান্টিক প্রেমের গল্প।

প্রেমের মতো | বাপ্পী মাহমুদ

এক.

শ্রাবণী একটা অবজ্ঞা মিশ্রিত হাসিতে তাকালো রোহানের দিকে।

রোহান তখনই পাশে থাকা চেইন গ্রোসারি শপের সাজিয়ে রাখা কোল্ডড্রিংকসের কাঁচের বোতলগুলো সব নিচে ফেলে দেয়। ঝনঝন শব্দে কানে তালা লাগার উপক্রম। শ্রাবণী হাসি ভুলে অবাক চোখে তাকায়।

সেই চাহনিতে রাগও ছিল শ্রাবণীর — টের পায় রোহান। কিন্তু ওর এখন কিছুতেই কিছু যায় আসে না। রোহান আরও কতক বোতল ভাঙতে যাচ্ছিল, তখন তার বন্ধু নিখিল ছুটে এসে সামলায়। আর শপের ভেতর থেকে একজন এসে রোহানকে একহাত নিতেই যাচ্ছিল। ততক্ষণে নিখিল, রোহানকে নিয়ে চলে যেতে শুরু করেছে।

রোহানের আরেক বন্ধু সানি ওখানেই থেকে যায়। গম্ভীর স্বরে নিখিলকে বলে, “আমি সেলসম্যানের সাথে কথা বলে দেখি কত টাকার ক্ষতি হলো। ক্ষতিপূরণ দিয়েই আসছি। তোরা দুজন সুমনের গাড়িতে গিয়ে বস।”

সুমন অদূরেই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। রোহানকে নিখিল একরকম ধরে বেধে আনছে দেখে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই রোহান ছেলেটা যেখানে যায় ঝামেলা পাকায়।

দুই.

শ্রাবণী গম্ভীর স্বরে বলল, “ওর এত রাগ আমার ওপর? রোহান কি জানে না আমি কতবড় বিজনেসম্যানের মেয়ে?”

“ছাড়ো না,” সানি সহজ স্বরে সামলায়, “তুমি যা বলেছো রোহান সেটা টলারেট করতে পারেনি।”
“তুমি এখন নিজের বন্ধুর হয়ে কথা বলছো?”
“রোহান আমার বন্ধু বলে বলছি না।”
“আমার এসব জেনে কাজ নেই। শোনো, রোহানের চেহারাও আমি আর দেখতে চাই না।”
“কেন?” সানি একদৃষ্টিতে তাকায় শ্রাবণীর দিকে, “ও তোমায় ভালোবাসে সেজন্য?”

শ্রাবণী জবাব দেয় না।

রাগে ক্ষোভে উল্টো পথে হাঁটা দেয়। সানিও সেলসম্যানকে পাওনা টাকা দিয়ে হাঁটা ধরে। তারা সবাই মিলে ঘুরতে এসেছিল — সিলেটের জাফলং। সুমনের প্রাইভেট কারে তারা ছেলেরা চারজন এসেছে। আর মেয়েরা এসেছে দুজন, তাদের গাড়ি ড্রাইভার চালিয়েছে।

শ্রাবণী এসে দেখে ড্রাইভার সিগারেট টানছে। তাকে দেখে ব্যস্ত হয়ে সিগারেট ফেলে দিলো।

“রফিক ভাই,” শ্রাবণী ঠান্ডা গলায় বলে, “তোমায় বলেছিলাম আমার মাথায় সবসময় ছাতা নিয়ে ঘুরতে যাতে আমার গায়ে রোদ না লাগে। ছাতা কই?”

ড্রাইভার ব্যস্ত হয়ে ছুটে এলো। মেলে ধরল মাথার ওপর ছাতা।

» আরও পড়ুন: তোমায় পাইনি ছুঁতে — মুক্তগদ্য

তিন.

সানি ফিরেই রোহানকে পর পর দুটা থাপ্পড় দিলো কষে। রোহান চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সুমনকে বলল, “তুই গাড়ি স্টার্ট কর!”

সুমন গাড়ি স্টার্টের তাড়া দেখালো না। সে সিগারেটের প্যাকেট রোহানের দিকে বাড়িয়ে দেয়। রোহান একটা স্টিক নিলো। টান দিয়ে খুকখুক করে কাশলো। বাকি তিনজন বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে থাকে।

“এজন্যই তোকে নিয়ে কোনো প্রোগ্রাম করতে ইচ্ছে করে না,” রাগে ফেটে পড়ে নিখিল, “তোর কোনো আইডিয়া আছে শ্রাবণী একবার রেগে গেলে ওর বাবার ক্ষমতায় তুই জেলে যেতে পারিস?”
রোহান সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলে, “আমি তো তার কোনো ক্ষতি করিনি, জেলে কেন দিবে?”

গাড়ি স্টার্ট দেওয়া হলো। সুমন অধৈর্য্য হয়ে গাড়ির গিয়ার বদলায়। আর বলে, “আরে তোরা বেকার এর সাথে কেন বকবক করছিস? শালাকে পারলে জামাকাপড় খুলে মার নয়তো গাড়িতে বস সবাই। দেরি হচ্ছে!”

সকলেই গাড়িতে বসলো। সত্যিই দেরি হচ্ছে — সুমন ভুল বলেনি। কত দ্রুতই সন্ধ্যা মিলিয়ে এলো। ঢাকা ফিরতে ফিরতে গভীর রাত, ভেবেই সুমনের মনে পড়ে রাতে তার দ্রুত ঘুমানোর শিডিউল চলছে ক’দিন। আজকের ঝামেলার কারণে সে ডিসিপ্লিনের বাইরে ছিটকে পড়েছে।

“শালার রোহান!” বিরক্তিতে মনে মনে বলল সুমন।

চার.

শ্রাবণী তার বাবাকে ফোনে পেল না। চলন্ত গাড়িতে শ্রাবণীর পাশ থাকা তার বান্ধবী রিমি বলল, “বাদ দে দোস্ত, রোহান জাস্ট লেইম পারসন — এটা ভেবে কুল হয়ে যা।”

“আমি কুলই আছি,” শ্রাবণী বলল, “রোহানকে ঠান্ডা মাথায় শিক্ষা দিব।”
রিমি হাল ছাড়ে। শ্রাবণীও চুপ। আপাতত বাবাকে সে আর ফোন করছে না।

জাফলং এসে সবাই যখন মিলেছে তখনকার ঘটনা — ট্রাভেল এজেন্সি তাদের রিসিভ করতে আসেনি। ফোন দিলে জানায় এক্ষুণি আসছে। সেই ‘এক্ষুণি’ হয়ে গেল এক ঘন্টা। এরমধ্যেই ঘটনা যা ঘটবার ঘটে গেছে।

শ্রাবণী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বোর হচ্ছিল।

তখন চড়ের শব্দ। সবাই অবাক হয়ে দেখে শ্রাবণীর ড্রাইভারকে রোহান থাপ্পড় দিলো।
“হোয়াটস রং?” শ্রাবণী ছুটে আসে।

রোহান তখন ড্রাইভারের হাত থেকে ছাতা নিয়ে শ্রাবণীর মাথায় মেলে ধরে। তারা একই ডিপার্টমেন্টে ইউনীভার্সিটির স্টুডেন্ট সবাই। রোহান দেখেছে, অতিরিক্ত গরমে ড্রাইভারকে তার মাথায় সবসময় ছাতা মেলে রাখতে।

শ্রাবণী অবাক চোখে তাকালো। রোহান বলল, “আই লভ ইউ!”
শ্রাবণী কথাটা শুনে সবার সামনে এতটাই বিচলিত হয় যে, এক মুহূর্তের জন্য রাগ করতেও ভুলে যায়। আর রোহান? সে আবার বলল, “তুমিও বলো প্লীজ!”

» আরও পড়ুন: গাজরের হালুয়া — ছোট গল্প

পাঁচ.

কিন্তু শ্রাবণী জবাব দেয়নি।

রোহানকে সে থাপ্পড় দেয় সরাসরি। আর অপমান করে বলে, “তোর সাথে আমার স্ট্যাটাস মিলে না। যা ভাগ!”
রোহান অবাক হয় না এটা শুনে। যেন সে জানতো এমনটাই ঘটবে। রোহান একটা রেস্তোরাঁয় পার্ট টাইম জব করে। সে জানে স্ট্যাটাসের অনেক ব্যবধান তাদের মধ্যে।

চেইন গ্রোসারি শপে রোহান ভাঙচুর করেছে কেবল নিজের ওপর রাগ করে। ছেলেটা নিজেকে যেন দোষারোপ করতে ব্যস্ত।

সানির পাশে বসে আছে এখন রোহান। সানির মায়া হলো হঠাৎ। সে বলে, “এত চুপচাপ বসে না থেকে কিছু বল।”
রোহান বলল, “শ্রাবণীকে একটা ফোন কর তো। আমার ফোনে সে ব্লক দিয়ে রেখেছে।”

বাকি তিনজন কথা শুনে আবারও অবাক হয়, হৈচৈ শুরু করে। কিন্তু রোহান নির্বিকার। সে বলল, “তোরা যদি আমার ভালো চাস, তবে শ্রাবণীর সাথে আমার রিলেশনকে মেনে নিতেই হবে।”

কেউ কোনো কথা বলে না, অধৈর্য্য হয়ে যায় সবাই।

আর তখনই সানির ফোনে ফোন আসে। যদিও ফোনটা করেছে রিমি — শ্রাবণীর বান্ধবী। সানি ফোন রেখে সুমনকে গাড়ি ইউটার্নে ঘোরাতে বলে। শ্রাবণীদের গাড়িতে প্রায় তিন কিলোমিটার পেছনে টায়ার পাংচার হয়েছে। তাদের দুজনের লিফট প্রয়োজন।

“পাগল হয়েছিস?” সুমন রোহানের দিকে তাকায়, “এই শালা থাকতে ওদেরকে গাড়িতে বসাবো?”
সানি বলল, “তাহলে আর কী করার আছে?”

সুমন এবার কিছু বলল না। আসলেও তাই। কিছুই করার নেই। তবে তারা রোহানকে অনুরোধ করলো এবার ঝামেলা না করতে। রোহান তখন পাগলের মতো একা একা হাসছে। আসলে তার একটা স্মৃতি মনে পড়ে গেছে।

ছয়.

রোহান তখন সদ্য অনার্সে ভর্তি হয়েছে। তার বন্ধুরা মানে সানি, নিখিল আর সুমন তাকে পাত্তা দিতো না। রোহান খুবই ভাবুক আর উদ্ভট হওয়ায় সেও ওদের সাথে মিশতে পারতো না।

কিন্তু একদিন পার্কে সানির সাথে সে সুন্দরী এক মেয়েকে দেখল। সেই মেয়েই শ্রাবণী। রোহান কী মনে করে সানির সামনে এলো। সেদিন সানির বার্থডে, পার্কে সেলিব্রেট করা হচ্ছে। রোহান গিয়ে সানিকে উইশ করলো। আর মন ভরে দেখে নিলো শ্রাবণীকে।

তারপর চলে আসার সময় কেউ একজন ওর কাঁধে হাত রাখে।

রোহান ঘুরে তাকায়। দেখে, একটা অচেনা ছেলে। ছেলেটা বলে, “হাই, আমি হিমেল।”
“ও আচ্ছা,” রোহান হাসে, “দেখলাম পার্টিতে। সানির বন্ধু তুমি?”
“হ্যা। তুমি?”
“বন্ধু ঠিক বলা যায় না!”
“মানে? ভার্সিটিতে একইসাথেই স্টাডি করো না তোমরা?”
“হুম। কিন্তু আমাকে ওরা বন্ধু হিসেবে দেখে না।”

ছেলেটা হাসে।

আর তারপর কোনো কথা হয়নি। কিন্তু সানির কানে কথাটি যায় — রোহান বলেছে ওরা তাকে বন্ধু হিসেবে দেখে না।

সানি তখন ভার্সিটিতে রোহানকে দেখে বলে, “তুই সবসময় এত মন মরা থাকিস কেন?”
“এম্নিই,” রোহান বলে, “গার্লফ্রেন্ড নেই, তাই।”
“তাহলে গার্লফ্রেন্ড বানিয়ে নে। শ্রাবণীর দিকে তো সেদিন এক পলকের জন্যও চোখ ফেরাসনি। ওকেই প্রপোজ করে দেখ।”

সানি মজার ছলে কথাটি বললেও রোহান সিরিয়াস হয়ে যায়।

» আরও পড়ুন: পারাপার — বই রিভিউ

সাত.

রোহান আবারও একদিন পার্কে আসে। আর দেখে শ্রাবণী একা দাঁড়িয়ে। সে গিয়ে পাশে দাঁড়ায়। বলে, “এক্সকিউজ মী!”

শ্রাবণী অবজ্ঞার চোখে তাকায়। বলে, “আমাকে বলছেন?”
“জ্বী,” রোহান হাসে, “আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।”
“আপনি প্লীজ যান, আমার আপনার সাথে কথা নেই।”
“কেন?”

প্রশ্ন শুনেই রেগে যায় শ্রাবণী। বলে, “তোকে ফারদার এক্সপ্লেইন করতে হবে?”
রোহান চমকালেও মুখে হাসি ধরে রাখে। কিছু একটা বলতে যাবে, তখন হিমেল নামের ছেলেটি আসে। শ্রাবণীর বয়ফ্রেন্ড হিমেল। সে বলে, “কী হয়েছে শ্রাবণী? ডিস্টার্ব করছে?”

শ্রাবণী একবার ‘হ্যা’ বলতেই হিমেল রোহানের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে।

প্রচুর মার খায় রোহান। আর মারের কারণে তার ঠোঁটের কোণ ঘেষে রক্ত পড়ে। কিন্তু হিমেল আরও মারতে চাইছিল। শ্রাবণী পাবলিক প্লেস দেখে তাকে সামলায়।

আট.

স্মৃতি থেকে বের হলো রোহান।

সুমন গাড়ি থামিয়েছে। অদূরেই দাঁড়িয়ে শ্রাবণীর গাড়িটা। তারা দুই বান্ধবী সুমনের গাড়িতে ওঠে। আর শ্রাবণী বসে ঠিক রোহানের পাশে। রোহান ভীত চোখে তাকায়। আশ্চর্য, শ্রাবণীও তাকিয়ে আছে। ঐ চোখে আর রাগ নেই কেন?

শ্রাবণী বলল, “সরি!”
রোহানের মনে হলো সে ভুল শুনছে। সে আস্তে করে বলে, “ইটস ওকে।”

যদিও রোহানের মনে হলো সরিটা তারই বলা উচিত ছিল। আর সেইসাথে সে আরও অনুভব করে প্রেমের মতো কিঞ্চিৎ সুখের অনুভূতি।

শ্রাবণী এবার প্রসঙ্গ বদলায়। সে আহত গলায় বলে, “আমি এখন মেন্টালি সিক আছি।”
“কেন?” ব্যাকুল হয় রোহান, “কী হয়েছে?”
“হিমেলের সাথে আমার ব্রেকআপ হয়ে গেছে।”
“এটা তো সুখবর!”
রোহান নিজ অজান্তেই কথাটা বলে লজ্জায় পড়ে যায়।

আর শ্রাবণী? সে দেখে, ছেলেটা লজ্জায় পড়লে তার ফর্সা গাল কেমন লাল হয়ে ওঠে। শ্রাবণীও তখন প্রেমের মতো অনুভবে হারিয়ে যায়, সে অল্প হেসে বলে, “আমি ভেবে দেখেছি — লাইফে পারফেক্ট কেউ না থাকুক, কিন্তু পারমানেন্ট কেউ অবশ্যই থাকুক।”

রোহান আবারও আস্তে করে বলে, “আমি কি সেই পারমানেন্ট কেউ?”
“হ্যা,” শ্রাবণী হাত বাড়ায়, “তুমিই!”

শ্রাবণীর বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে আচ্ছন্নের মতো তাকিয়ে থাকে রোহান। আর দুজনেই অনুভব করে প্রেমের মতো শীতল অনুভূতি, যা অনেক দামি!


গল্প: প্রেমের মতো

লেখা: বাপ্পী মাহমুদ 

প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top