বদলে যাবার দিনে — মুক্তগদ্য। মুক্তগদ্যটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। মূল লেখায় রচিত লেখকের দৃঢ় সংকল্প ফুটে উঠেছে রূপকের টানে গদ্য হয়ে, যে গদ্যে মিশে আছে সূর্যের আলো। নতুন সূর্যের গল্প।
বদলে যাবার দিনে | বাপ্পী মাহমুদ
এক.
খুব সুন্দর করে জগতের অসুন্দরকে চিনছি আমি।
আমার বদলে যাবার দিনে কেউ আমার পাশে নেই। অসহায় চাহনি খেলে যায় আমার মুখে। আমি কি তবে অসুন্দরের সমারোহে হারিয়ে যাব? কিন্তু বদলে যাবার দিনে এই অপ্রাপ্তি আমি মেনে নিতে চাই না!
প্রত্যেক বদলে যাওয়ার মাঝেই সৌন্দর্য থাকা উচিত — একদা আমি ভেবেছিলাম। আমার বদলে যাওয়ার স্বাদেও ছিল সৌন্দর্যের ছোঁয়া। তবু কি আমি হারিয়ে যাব? হারিয়ে যাওয়া মানেই তো হেরে যাওয়া। সবাই দেখছে, সবাই জানছে। তবু কেউ এগিয়ে এসে বলছে না, “দৌড়াও! তোমার মাইলফলক স্পর্শের আগে থেমো না!”
সবাই চাইছে আমার হার। কিন্তু আমি এই ব্যত্যয়ের মাঝেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসে। চোখ বুজলেই দেখি স্বপ্ন। বুঝতে পারি কেন আমায় বদলে যাবার দিনে পৌঁছতে হবে। অসুন্দরের বিরুদ্ধে আমার লড়াই।
আমি চাই সৌন্দর্যকে ছুঁতে!
» আরও পড়ুন: হুমায়ূন আহমেদ — শুধুই কি জনপ্রিয়?
দুই.
জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত সত্যগুলো আমায় আগুনের মত স্পর্শ করেছিল। আমি কিন্তু পুড়ে যাইনি। যে ব্যক্তি সৌন্দর্যকে সত্যের মাঝে খুঁজে চলে, সে যে নিজেই আগুনের তৈরি সূর্য। সে কেন পুড়বে?
আমার কন্ঠে তবু বিষাদ ছিল। কিন্তু হতাশা ছিল না। আমার কন্ঠের বিষাদে তাই উড়ে চলে গিয়েছিল অনাকাঙ্ক্ষিত সত্যগুলো। যাবার আগে সেই সত্য আমায় জানিয়েছিল — আমি লক্ষ্য নিয়ে বেশিদূর যেতে পারব না। কিন্তু আমার বিশ্বাস জানিয়েছিল — বদলে যাবার দিনে পা বাড়ালে অনাকাঙ্ক্ষিত সত্যগুলোও বদলে ফেলা সম্ভব।
আর আমি জানতাম এ ভাবনা সত্যি।
অন্ধকার আমি আর দেখি না। আমার চারপাশ আলোকিত। আর আলোকিত দুনিয়ার মাঝে আমিই হলাম সূর্য। আমাকে অনেকদূর যেতে হবে। বদলে যাবার দিনে আমি আরও শক্তিশালী হতে চাই।
এভাবেই দিন গড়াচ্ছিল। আমার চারপাশের অসুন্দর গল্পগুলোতে মেখে ছিল কলুষিত অন্ধকার। তাদের সামনে আমি দাঁড়ালাম। আমাকে তারা মেনে নিবে না। কিন্তু আলোর পথে অন্ধকার মাথা উঁচু করতে পারে না — নিয়ম নেই।
আমি তাই গাঢ় আত্মবিশ্বাসে দাঁড়াই অন্ধকারের সামনে। আর বলি, “এবার আমার নিজের নিয়মে একটা গল্প হোক!”
» আরও পড়ুন: রূপকথার রাজপুত্র হ্যান্স অ্যান্ডারসন — প্রবন্ধ
তিন.
সব গল্প সহজভাবে শেষ হয় না। আর যে গল্পে যত বেশি জটিলতা সে গল্প তত বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়। আমার গল্পটিও সেরকম। আমি সহজে জিতে যেতে পারিনি।
অন্ধকার শুধু কলুষিতই ছিল না — ছিল আরও গভীর, ছিল কৃষ্ণগহ্বর। সেই কৃষ্ণগহ্বর শুষে নেয় আমার সূর্য সত্তার আলো। আমি হাঁটুভেঙে পড়ি। আমার শক্তি ফুরিয়ে আসতে থাকে। তাকিয়ে দেখি অন্ধকার আমায় শুষে নিয়ে আরও গভীর হচ্ছে। আমি ভয় পাই — অসুন্দরের দল এত ভারী কেন?
আমার মনে হয়েছিল — উঠে না দাঁড়ালে বদলে যাবার দিনে পরাজয় স্বীকার করতে হবে। কিন্তু শরীর, মন ও আত্মা আমার বিরুদ্ধে চলে যেতে চাইছে। আমি কীভাবে উঠে দাঁড়াব?
আমি সুযোগ চাই!
কিন্তু কার কাছে সুযোগ চাইব? সবখানে কৃষ্ণগহ্বরের মুখ, কৃষ্ণগহ্বরের তাচ্ছিল্য ভরা হাসি। আমি কি ভয় পাচ্ছি? নিজের দু’হাত তুলে নিলাম। তাকালাম অতীতে। আর দেখলাম আমার হাতে অতীতের পৃষ্ঠা এসে জড় হয়েছে। আমি গর্বিত হয়ে দেখছি অতীতের আমিটাকে।
চার.
সুন্দর স্বপ্ন মানুষকে সুন্দর করে তোলে। আমি সুন্দর স্বপ্ন দেখেছিলাম যখন আকাশের নীল রঙ ভালো লাগে তখন। আর সেসময় মানুষের মুখের হাসিতেও দেখি ব্যথার নীল ঢেকে রাখবার সাহস।
সেই সাহসই আমায় অতীত গল্পে বলেছিল, “একজন সৎ সুন্দর মানুষ একাই যথেষ্ট!”
কৃষ্ণগহ্বর থেমে নেই।
সে শুষছে আমার সমস্ত আলো, আমি নিভে যাচ্ছি। আমার আত্মা ক্ষয়ে যাচ্ছে। আমার ব্যথার নীল আকাশের নীলকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অতীত গল্পের অনুপ্রেরণা আমায় উন্মাদের মত সামনে তাকাতে সাহস দিলো।
আমার চোখে তখন উজ্জ্বল আলো! আমি তাকাতেই কৃষ্ণগহ্বর আর্তনাদ করে ওঠে। কৃষ্ণগহ্বরের মানুষেরা তাদের নিভৃত অন্ধকার নিয়ে বিপদে পড়ে। আর আমি দেখতে পাই — অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে বদলে যাবার দিন। বদলে যাবার দিনে আমি লিখতে চলেছি নতুন কিছু — সাক্ষী মহাকাল!
কিন্তু আমি বলেছিলাম — সব গল্প সহজভাবে শেষ হয় না।
অন্ধকারের কৃষ্ণগহ্বর আমার তুলনায় ছিল বিশাল। আমার আলো অতদূর পৌঁছায়নি। “সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে তারপর এসো!” — কৃষ্ণগহ্বর থেকে তাচ্ছিল্য করে বলল কেউ। আমি মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছি।
কিন্তু পিছনে তাকাইনি। আর সফল হবার জন্য এটাই ছিল সঠিক পদক্ষেপ।
» আরও পড়ুন: গল্প লেখার নিয়ম — প্রবন্ধ
পাঁচ.
আমাকে পা বাড়াতে হবে। সামনে অন্ধকার বাড়ছে, তবু। আমি পা বাড়ালাম। আর আমার শক্তি হ্রাস পেল তখনই। কৃষ্ণগহ্বর থেকে ভয়াল দর্শন কোনো অসুর জাতের কেউ ছুটে এলো। ধাক্কা দিলো আমায়, মাটিতে ফেলে নির্মমভাবে গলা চাপলো। আর আমার চোখের আলোও নিভে গেল।
“আবারও বলছি তোকে সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে তারপর আয়!” — অসুরের মত ভয়ংকর শক্তিশালী মানুষটি হুংকার ছাড়লো। আমার আত্মার ভেতর ভয়ের সঞ্চার ঘটে। কিন্তু হাল ছাড়বার ইচ্ছা আমার ছিল না।
মানুষটি গলা চিপে আমার সমস্ত আলোকে মোমের জ্বলন্ত বিন্দুতে রূপান্তরিত করলো। আমি তখনও হার মানিনি। সম্পূর্ণ নিভে যাবার আগে আমি লড়ে যেতে চাই। আমার দম বন্ধ হয়ে এলেও আমি ছটফট করছিলাম না।
এই অপরাজিত মনোভাব পছন্দ করে নিলেন শক্তিশালী কোনো উজ্জ্বল সূর্য। এগিয়ে এসে কৃষ্ণগহ্বরের সামনে দাঁড়ালেন। তীব্র আলোর মহাসমারোহে আমি শুধু ধবল শ্বেতশুভ্র আলোই দেখছিলাম।
তবে গল্পের ইতি টানলেন সেই সূর্যই। কোথায় কৃষ্ণগহ্বর, কোথায় মানুষরূপী অসুর? সবাইকে ধ্বংস করে সূর্যটি আমার দিকে চেয়ে হাসলো। যে হাসিটির পেছনে কেউ লিখছিল বদলে যাবার দিনে নামক ভিন্ন যাত্রার গল্প।
আর সূর্য বললেন আমায়, “দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাবের কাছে সকল অপশক্তিই হার মানতে বাধ্য!”
মুক্তগদ্য: বদলে যাবার দিনে
লেখা: বাপ্পী মাহমুদ
প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও মুক্তগদ্য পড়তে শব্দশৈলী পোর্টাল ও ফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।



