‘অচেনা আতংক’ — শিক্ষনীয় থ্রিলার গল্প। গল্পটি লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। এটি একটি থ্রিলার জনরার গল্প।
গল্পে অনিক নামের এক টিনএজ ছেলের বিপদে অসহায় মুহূর্তগুলো তুলে ধরা হয়েছে। অচেনা আতংক ছেলেটির পিছু তাড়া করে। এই বয়সে একটা ছেলে যেকোনো রকম সাধারণ ভুলের কারণে অনেক বড়ো বিপদে পড়তে পারে — এই গল্পে তাই প্রকাশ পেয়েছে।
গল্পটি যদিও থ্রিলার জনরার, তবু এখানে শিক্ষনীয় বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। চলুন, শুরু করা যাক ‘অচেনা আতংক’ গল্পটি।
অচেনা আতংক | বাপ্পী মাহমুদ
এক.
রেলস্টেশনে বসে ছিল অনিক।
গরম হাওয়া বইছে। প্ল্যাটফর্মে একটু আগেও রমরমা ভীড়ে সেই গরম আরও বাড়ছিল। অনিক একটা সফট ড্রিংকস কিনেছে। কেনাটা ঠিক হয়নি, আজিজ ভাই এলেই ফেলে দিতে বলবেন। আজিজ ভাইয়ের আসবার সময় হয়েছে।
অনিকের মেন্টর আজিজ। অনিকের সমস্ত কিছুতেই পরামর্শ আর উপদেশ দেন তিনি। আজ অনিকের জন্মদিন। জন্মদিনে কিছু স্বাধীনতা থাকা উচিত। তাই সে সফটড্রিংকস গিলছে। তার ভালো লাগছে।
আজিজ ভাই এলেন তখনই। তিনি যেন হাতে ধরা বোতল দেখতেই পেলেন না। চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, “এখানে নয়, চল অন্যখানে যাই।”
অনিক জিজ্ঞেস করতে চাইলো যে, কোথায় যাবে? আর কেনই বা যাবে?
কিন্তু হঠাৎ পরিকল্পনা বাতিল হওয়ায় সে দ্বিধান্বিত। দ্বিধার সময় সরাসরি প্রশ্ন মাথায় এলেও মুখে আসে না। সে নীরবে উঠে দাঁড়ায়। বয়সে ত্রিশ পেরিয়ে যাওয়া আজিজ ভাই বলেন, “বোতলটা এখনো খালি হয়নি? আমায় দে, শেষ করি।”
বলতে না বলতেই আজিজ ভাই বোতল এক চুমুকে নামিয়ে দেন। অবাক হয় অনিক। ডিসিপ্লিনের বাইরে কখনো যেতে দেখেনি সে আজিজ ভাইকে।
দুই.
ট্রেন চলে এসেছে। অনিক আর আজিজ প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাবার সময় ট্রেন ছাড়লো। অনিক দ্বিধান্বিত। সময় ভর দুপুর। তার বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে। সে জানে না আজিজ ভাই আজ কেন তাকে নিয়ে বের হয়েছে।
অনিক এখনো তাই দ্বিধান্বিত।
আজিজ সিগারেট ধরায়। এই ব্যাপারটাও নতুন — ডিসিপ্লিনের বাইরে। অনিক অবাক হয়। তার কাছে সবকিছু এলোমেলো লাগছে। টিনএজের প্রায় শেষপ্রান্ত ছোঁয়া সতেরো বছরের ছেলেটি বলতে চাইলো, “আমি বাড়ি যাব!”
কিন্তু তার গলার ফুটো দিয়ে আওয়াজ বের হলো না।
“আমরা প্রথমে ভূতের গলিতে যাব। ঠিক আছে?” আজিজ ভাই যেন আস্তে ধীরে তার পরিকল্পনা শোনাচ্ছেন — মনে হয় অনিকের।
অনিক ক্ষীণ স্বরে জবাব দেয়, “আচ্ছা!”
“ভূতের গলিতে একটা মজার জিনিস দেখাবো তোকে!”
“কী জিনিস?”
“বললাম তো মজার জিনিস,” আজিজ ভাই বিরক্ত হন, “আগে আগে বললে মজা নষ্ট হবে।”
অনিক চুপ করলো। তার আবারো বাসার দিকে মন চলে যাচ্ছে। হঠাৎ তার মনে হলো শুধু শুধুই সে বাড়ি থেকে পালিয়েছে।
» আরও পড়ুন: চান্নিপ্রহর রাত
তিন.
আজিজ।
পেশায় একজন জিম ট্রেইনার। অনিকের সাথে তার পরিচয় জিম সেন্টারে। অনিক লেখাপড়ায় শুরু থেকেই অমনোযোগী। সেজন্যই সে জীবনকে শুধু বাহ্যিক বিনোদনের উপকরণে খোঁজার চেষ্টা করেছে।
তার সেই চেষ্টায় আজ প্রথম সন্দেহ দানা বাধছে।
“অনিক!”
অনিক চমকে তাকায়। সে এখনো বাড়ি যাবার কথা ভাবছিল। আজিজ বলল তাকে, “তোর লাইফ আমি সুন্দর করে দেবো। সারাজীবনের জন্য তুই হবি স্বাধীন!”
অনিকের তবু মন কেমন করতে থাকে। সে প্রায় নিজ অজান্তেই বলল, “আমি বাড়ি যাব!”
আজিজ হুংকার দেয়, “কী বললি?”
“বাড়ি যাব,” অনিক জড়সড় হয়ে দাঁড়ায়, “আমার এখানে ভাল লাগছে না।”
আজিজ কিছু বলে না। এক মুহূর্ত সে ভাবল — এখন মাথা গরম করার সময় নয়। আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে কাজ কারবার তো আজকের নয়। সে থেমে থেমে বলল, “এখন বাসায় গেলে তোর বাবা বকবে না? আর তাকে জবাবে কী বলবি? যদি জিজ্ঞেস করে কোথায় ছিলি — বলতে পারবি?”
অনিক চুপ রইল। এটা সে ভাবেনি। আজিজ বলে, “বাচ্চাদের মতো করিস না। তুই এখন যথেষ্ট ম্যাচিউর।”
চার.
আজিজের পরিকল্পনায় সমস্যা হয়েছে। প্রথমে কথা ছিল লোক এই কমলাপুর রেলস্টেশনে আসবে, তারপর অনিককে নিয়ে যাবে। কিন্তু এখন বলছে কোনো এক ঝামেলার কারণে কেউ আসতে পারবে না। অনিককে নিয়ে ভূতের গলির মাজারে যেতে বলছে।
ভূতের গলিতে সদ্যই এক মাজার হয়েছে। জায়গাটা স্পেসিফিক্যালি আল হেরা মসজিদের কাছাকাছি। অনিককে সেখানে সে বিক্রি করে দিবে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকায়। রেলস্টেশন থেকে ভূতের গলি যাবার জন্য পার্টি তাকে আরও দশ হাজার বেশি দিবে বলেছে।
তাই আজিজের আর আপত্তি নেই।
অনিককেও মজার জিনিস দেখানোর মিথ্যে আশ্বাসে ভূতের গলি নিয়ে যাওয়া যাবে। ছেলেটা অনেক বোকা, আজিজ জানে ওকে বিক্রি করে দেয়া অনেক সহজ। আজিজের চোখ লোভে চকচক করে ওঠে — টাকার লোভ।
অনিক চুপচাপ হাঁটছে তার সাথে। তার মনে অচেনা আতংক বাসা বেধেছে। বাসায় আজ সকালে তার মা বলেছিলেন যে, পায়েস রান্না করবেন। অনিকের প্রতি জন্মদিনেই পায়েস রান্না হয়। ঠিক এই মুহূর্তে তার মনটা কেমন পায়েসের মিষ্টি স্বাদের জন্য উন্মুখ হয়।
আবার ভাবে, বাসায় থাকলে বাবা সারাক্ষণ শাসনে রাখতেন। পড়ো, পড়ো এবং পড়ো বলে তার ওপর সারাক্ষণ রাগ দেখাতেন। অনিক ভেবেছিল, কমলাপুর রেলস্টেশন এসে তার মন ভালো হবে। স্থির হবে।
কিন্তু তা হয়নি। আজিজ কিছুদূর গিয়ে একটা রিকশা নিলো। রিকশায় বসে দুজনেই চুপচাপ। মাথার ওপর রোদটা বাড়ছে। রিকশার হুড তোলা হয়নি। অনিকের কেমন কান্না পাচ্ছে।
» আরও পড়ুন: মধ্যবিত্ত জীবন নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ এর সেরা ৫ বই সমূহ
পাঁচ.
মাজার এলাকায় পৌঁছে অনিক স্তব্ধ হয়ে গেল। সে আবারও অচেনা আতংক নিয়ে লক্ষ্য করলো জায়গাটায় পচা দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কীসের দুর্গন্ধ জানা নেই, জায়গাটায় থাকা যাচ্ছে না। এলোমেলো লম্বা গোফদাঁড়ির ময়লা পোশাক পরিহিত কিছু লোক পড়ে আছে মাজারের যত্রতত্র।
অনিক ভীত চোখে আজিজের দিকে তাকায়।
কিন্তু আজিজের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। আজিজ এখানে অনিককে পাচার করতে এসেছে। সে এই কাজের এজেন্ট মাত্র। একজন লোক এগিয়ে আসছে। আজিজের মুখে আনন্দের হাসি ফুটল — লোকটার হাতে নগদ টাকার ব্যাগ!
অনিক তখনো জানে না কী ঘটছে। কিন্তু সে টের পাচ্ছে যা ঘটছে তা ভালো কিছু নয়। আজিজ ভাই হঠাৎ তার হাত শক্ত করে ধরলেন। আর আগত লোকটি তখন তাকিয়ে অনিকের দিকে।
অনিক ক্ষীণ স্বরে জানতে চায়, “এই লোকটি কে?”
আজিজ বিরক্ত হয়ে তাকায়, বলে, “চুপ, কোনো কথা না!”
অনিক হাত ছাড়াবার চেষ্টা করলো। কিন্তু আজিজের হাত পেশিবহুল আর ব্যায়ামে শক্ত সমর্থ। অনিক তাই ব্যর্থ হলো।
আর আগত লোকটি?
সে বলল, “ছেলেটার হাত ছাড়ি দাও। এখানে ওর পালাবার পথ নাই!”
অনিক হতভম্ব হয়ে তাকায়। আর আজিজ সত্যিই হাত ছাড়ে। ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে অনিক বুঝতে পারে সত্যিই আর কিছুতে কিছু যায় আসে না।
ছয়.
আশেপাশে সাধারণ মানুষের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। মাজারের লোকটি খুবই নোংরা পোশাক পরে আছে। নেশার বস্তু টানায় তার চোখ কেমন বুজে এসেছে।
মাজারের লোকগুলো বেশ কয়েকটা জটিল অপরাধে জড়িয়ে আছে। শহুরে উঠতি গ্যাং এর অপভ্রংশ তৈরি হয়েছে এই মাজারেই। অনিকের মতো অনেক ছেলের অপরাধ জীবনের চর্চা শুরু হয়েছে এখানেই। অনিক এখনো পুরো ব্যাপারটা বুঝেনি।
তবে যতটুকু বুঝেছে তাতে তার শ্বাস বন্ধ হবার জোগাড়।
সে অনুনয় করে আজিজকে বলল, “আমাকে ছেড়ে দেন আজিজ ভাই, আমি বাসায় যাব!”
আজিজ হেসে ফেলে। এ যে সাক্ষাৎ শয়তানের হাসি!
আজিজ বলে, “মজার জিনিস দেখাবো বলেছিলাম। এখনই তোকে বিক্রি করব। আর নগদ টাকা পাব। নগদ টাকার চেয়ে মজার জিনিস আর কী হতে পারে?”
অনিক ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়। কী ভয়ংকর কথা!
কিন্তু সৌভাগ্য তখনো সময়ের অপেক্ষা মাত্র। কে জানতো এরমধ্যেই খেলা ঘুরে যাবে? হঠাৎ-ই আজিজের সামনে দাঁড়ানো লোকটার ফোন আসে। সে ভুরু কুঁচকে শুধু ফোন কানে নিয়ে শুনে যায়। তারপর ফোন রেখে শুষ্ক গলায় বলে, “ডিল ক্যান্সেল।”
আজিজ হতাশ গলায় বলে, “কী বলেন ভাই? আপনি না বলছিলেন মেজর কন্ডিশন? এখনই একটা কিশোর বয়সী ছেলে লাগবে? আপনি বুঝছেন না ও অনেক তেজি ছেলে। ওকে নিলে —”
লোকটি কথার প্যাচে পড়তে চাইলো না, সরাসরি বন্দুক বার করলো। আজিজের দিকে সেটা তাক করে বলল, “তুই শালা বহুত ড্যামেজ আছস! এর আগে ভুলভাল অনেক কাজ করছস! এরপরও গলার আওয়াজ বাইর করলে বন্দুকের আওয়াজে মিলাইয়া যাবি কইলাম।”
আজিজ তবু অবুঝ, কিন্তু এবার শান্ত স্বরে বলে, “এখন এই বাচ্চাকে নিয়ে কী করি?”
“বাসায় দিয়ে আয়,” লোকটি যেন সহজ সমাধান দিলো, “কোনো পুলিশ কেইস হইলে আমরা ব্যাকআপ নিব!”
“নিবেন তো ভাই?”
লোকটি জবাব না দিয়ে ঘুরে চলে যায়। সঙ্গে টাকার ব্যাগও হতাশা রেখে বিদায় নেয় আজিজের চোখের সামনে থেকে।
সাত.
তারা ফিরে যাচ্ছে। আজিজের মুখ পাংশুবর্ণ। অনিক ভয়ে কোনো কথা বলছে না। কিন্তু সে এখন অনেক শান্তি পাচ্ছে। কারণ তাকে বাসার দিকে নেয়া হচ্ছে। রিকশা চলতে চলতে আবার কমলাপুর রেলস্টেশনে আসে। আজিজ রিকশা দাঁড় করায়।
কমলাপুর রেলস্টেশনের কাছেই অনিকের বাসা।
বাসার কাছাকাছি এসে আনন্দে তার মন ভরে যায়। আজিজ গম্ভীর স্বরে বলে, “যা হইছে কাউকে বলিস না।”
“ঠিক আছে,” অনিক মাথা নাড়ে, “আমি কাউকেই বলব না।”
যদিও অনিক মনেপ্রাণে চাইছিল আজিজের শাস্তি হোক। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় — সবটাই বাবা-মাকে বলবে। একইসাথে তার নিজের ওপরও রাগ হচ্ছিল। সে কেন বোকার মতো আজিজকে বিশ্বাস করতে গেল?
অনিকের বাসার কাছাকাছি এসে আজিজ বিদায় নেয়।
অনিক বাসার ভেতর ঢোকে ভয়ে ভয়ে। বিকেলের আলো শেষ পর্যায়ে তখন। অনিককে প্রথম দেখে তার মা। তিনি কান্না মিশ্রিত আনন্দে ছেলের দিকে ছুটে এলেন। তার কান্না শুনে ছুটে আসেন অনিকের বাবাও।
» আরও পড়ুন: রিলেশনশিপ — এক অদ্ভুত ভালোবাসার গল্প
আট.
অনিককে দেখে তারা প্রশ্ন করেন, “বাবা, কোথায় ছিলি তুই?”
অনিক পুরো ঘটনাটা খুলে বলে। সব শুনে তার বাবা-মা স্তম্ভিত। ছেলেকে তারা জড়িয়ে ধরে বারবার আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে থাকেন। আর অনিকও সাবধান হয়ে যায় যখন তার বাবা বলেন, “কখনোই না জেনে কোনো মানুষের সাথে কোথাও যাবে না। আজকের বিপদ থেকে শিক্ষা নাও। তোমার জন্মদিনে এই শিক্ষাটার দরকার ছিল।”
অনিক মাথা নাড়ে — সে বুঝেছে।
ঘরের ভেতর থেকে তখন আসছে মিষ্টি পায়েসের ঘ্রাণ। অনিকের মা এক বাটি পায়েস নিয়ে হাজির হলেন। ছেলেকে তিনি নিজ হাতে পায়েস খাইয়ে দিবেন।
পরিশেষে
অনিকের মতো আমরাও কখনো কখনো জীবনে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করি। তখন আমাদের মনেও অনিকের মতো ‘অচেনা আতংক’ ভর করে। এই অচেনা আতংক নিয়ে পথ চলা কঠিন।
তাই অচেনা আতংক থেকে দূরে থাকতে আমাদের উচিত সবসময় মানুষ বুঝে চলাফেরার সিদ্ধান্ত নেয়া। যে সিদ্ধান্তে বাস্তবতা থাকবে, অচেনা আতংক নয়!
গল্প: অচেনা আতংক
লেখা: বাপ্পী মাহমুদ
প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টাল ও ফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।



