চান্নিপ্রহর রাত নিয়ে গদ্য কবিতা। এই কবিতায় কোনো গতানুগতিক ছন্দ ব্যবহার করা হয়নি। এটি মূলত গদ্যছন্দে রচিত একটা কবিতা। এই কবিতায়, চান্নিপ্রহর রাতের প্রাকৃতিক বর্ণনার সাথে বিভিন্ন বৈষয়িক ব্যাপারের মেলবন্ধন ঘটনো হয়েছে। চলুন কবিতাটি পড়া যাক।
কবিতা: চান্নিপ্রহর রাত
চান্নিপ্রহর রাতের কোলজুড়ে যে নীরবতা নামে, সে নীরবতা কখনও পাখির সেকালের গান নয়, না কোনো মেঘের কাঁপুনি—এটি এক বদরের মতো সমুদ্র, লম্বা, অচেনা, হৃদয়বিন্দুর ওপরে ভাসমান। রাস্তার ঢেউগুলো নিঃশব্দে গোধূলি স্মৃতির নীল রঙ চেলে আনে; বাড়িগুলোর জানালা গিলে খায় রাতে ঢোকারা বালকীর কল্পনা। আমি হেঁটে যাই — পায়ের নীচে জমে থাকা ধুলো যেন ঢেউয়ের পেছনে ছুটে চলে; প্রতিটি ধূলিকণা একটি গল্প বলে, শুষ্ক, গরম, চেনা একটি গল্প — কিন্তু রাতটি চায় আরেকটি ভাষা, চায় বেমানান সুর, চায় চাঁদের গরম হাতে লুকোনো এক অদৃশ্য…
» আরও পড়ুন: মধ্যবিত্ত জীবন নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ এর সেরা ৫ বই সমূহ
চান্নি — ছোটো একটা শব্দ, চোখের পলকের আদি-অন্তরীণ ধ্বনি; প্রহর — নিঃশেষ বিভাজন, সময়ের সঙ্গে মিশে থাকা হোয়াইটনয়েস। ঘুমের খোলস ভেঙে পড়ছে, ছাদে বুনন করা স্মৃতি কুঁচকে যাচ্ছে; দূরে কোনো কচ্ছপের মতো সময় ধীরভাতে হাঁটছে, আর আমি দাঁড়িয়ে আছি নদীর তীরে, যেখানে আলো ও অন্ধকার মিশে গেছে, জানি না কি-ইবা বলতে হবে। কোনো পুরোনো ঘড়ির টিকটিক করে তলপারি; কাঁচের সঙ্গে বাতাসের এক অদ্ভুত আলাপ ঘটে—আমার কণ্ঠে ওরা গোপনে ঢুকে পড়ে।
কোনোদিন এক বোঝা ছিল — নামটি ছিল অনামা। সেই পাতায় মাটির গন্ধ, পুরোনো প্রেমের অল্পশব্দ, আর ছায়াময় বিস্মৃতির ছোট্ট রক্তচিহ্ন। রাতগুলো বলে দিলো, “তুমি পারো না”, এবং আমি তাদের কাঁধে রাখা চেয়ে থাকি। কিন্তু এই চান্নিপ্রহর রাত জানে আগামীর কাগজে কী লেখা আছে না জানার মতোই সে জানে; সে জানে যে প্রতিটি নিশ্বাসে এক নতুন ছবি খসে পড়ে, আর প্রতিটি ছবির পেছনে থাকে একটা নিরুপায় হাসি, যা কখনো মুখপটে উঠে আসে না।
» আরও পড়ুন: তখন শেষ বিকেল — গভীর ভালোবাসার গল্প
চাঁদ দুলে ওঠে, ছায়ার ধার সোজা করে, গাছগুলো করে শ্রদ্ধার ভঙ্গি। পোকারা ক্ষুদ্র রডে বসে আছে, তাদের কণ্ঠ যেন দূরের জিজ্ঞাসা; আমি তাদের কথা শুনি, তাদের মৃত্তিকা-মুলক কণ্ঠে ছায়াময় কবিতা বাজে। এই কবিতাগুলো কোনো বক্তৃতার নয়; এগুলো তারা বলে যেন শিশুরা শুয়ে থাকা শাঁখি হাতে নেচে পড়ে। আমি খুঁজে পাই শব্দের মধ্যে ভরা ছবি — একটি পুরোনো টুপি, বায়ুতে ভাসমান চিঠি, আর এক বালিকার চাহনি, যার পিছনে লুকায়িত আছে নদীর বাঁকের শেষ নাম।
রাত বাড়ে; শহরের দূরেকার আলো এসে আমার পিঠে সূক্ষ্ম কাঁটা দেয়; আমি দেখি—তার আলোয় শহর গড়ে তোলে নিজের ভুলগুলোকে। এই ভুলগুলোই হয়তো একদিন কবিতায় পরিণত হবে, কিন্তু আজ শুধু ছিন্ন শব্দ বাজছে। মনে হয়, রাতটি নিজেই একজন পথিক, যে কাঁধে নিয়ে এসেছে ভাঙা গল্প, এবং ওরা আমার কানের কাছে হেসে বলে—শুনো, শুনো, তুমিই শুনবে তো?
» আরও পড়ুন: রিলেশনশিপ — এক অদ্ভুত ভালোবাসার গল্প
চান্নিপ্রহর রাত আমার হাতে দেয় কিছু অসমাপ্ত বৃত্ত; আমি এগুলো আঁকি নীল রঙে, লাল ছায়ায়, এবং যখন চাঁদ উপুড় হয়ে হাসে, তখন মনে হয় অতীতের দরজা ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। আমি ঢুকে পড়ি সেই ঘরে, যেখানে বাতি মশাল জ্বলে না, কিন্তু গন্ধ আছে—কাগজের গন্ধ, পুরোনো কবিতার গন্ধ। আমি বলি কিছুই নেই, কিন্তু রাত জানে, রাতে সবই আছে—দুয়েকটা হারানো নাম, কিছু আমাকে ভাঙা কণা, এবং একটি স্তব্ধ প্রতিজ্ঞা যে আগামীকাল হয়ত ফিরে পাবে তাদের।
ঘোলাটে সকাল হলে হয়তো সব কিছু ফিরবে, আকাশে পাখিরা পুরোনো সুর ছাড়বে, দোকান খুলবে, কিন্তু আমি জানবো রাতে যে ছেঁড়া ছবি দিয়ে আমি চলেছি, ওগুলো আমায় ছাড়া দেবে না। আর আমি ফিরে আসি একলা পথে, হাতে নীরবতা ধরে, বুকের কোণে চাঁদ রেখে—চান্নিপ্রহর রাতের মুখমণ্ডল আমার সাথে, এবং আমি জানি, সবই ছিল খেলা, সবই ছিল স্বপ্ন, কিন্তু রাতটি কিছুটা বেশি সত্য ছিল, তাই তো তার স্মৃতি আজও গলে পড়ে আমার শব্দগুলোর মধ্যে।
*****
প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও কবিতা পড়তে শব্দশৈলী পোর্টাল ও ফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।


