হিমু রিমান্ডে — বই রিভিউ

হিমু রিমান্ডে — বই রিভিউ

হিমু রিমান্ডে — বই রিভিউ। হিমু রিমান্ডে লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ। এটি একটি উপন্যাস। বইয়ের মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮৮। দাম ২৪১ টাকা। অন্যপ্রকাশ প্রকাশনী।

হিমু রিমান্ডে বইয়ে বিনোদনের সব ফর্মূলায় যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। উপন্যাসের শুরুই হয়েছে পুলিশের ইন্টারোগেশন থেকে। হিমু রিমান্ডে পড়বার সময় আপনি খুব কাছ থেকে হিমুকে দেখতে পারবেন, হিমুর অভিযান অনুভব করতে পারবেন।

মূল উপন্যাসে হিমুর সাথে পুলিশের এক ধরনের হাস্যোরসাত্মক ক্রাইম থ্রিলিং খেলা চলে, যা উপভোগ্য। হিমু রিমান্ডে নিঃসন্দেহে হাসির গল্প। চলুন, পুরো বইটি সম্পর্কে বিশেষ স্পয়লার ছাড়া জানা যাক!

হিমু রিমান্ডে — বই রিভিউ

হিমু! বাংলা সাহিত্যে একইসাথে দর্শনপ্রিয় এবং বিনোদনধর্মী চরিত্র। হিমুকে আপনি যাতে খুব কাছ থেকে অনুভব করতে পারেন, তার জন্য লেখক হুমায়ূন আহমেদ হিমুকে সাদাসিধা লাইফস্টাইলেই প্রকাশ করেছেন।

হিমু থাকে একটি মেসবাড়িতে।

আর তার কোনো পেশা নেই। সে শুধু হাঁটে। তাও আবার খালি পায়ে। অদ্ভুত না? অদ্ভুত আরও একটা এলিমেন্ট বাকি আছে। হিমুর পোশাক কী জানেন? হিমুর পোশাক হলুদ পাঞ্জাবি।

উপরোক্ত এই কয়টি এলিমেন্টস ছাড়াও হিমুকে লোকেট করা যায় তার বিশেষ ক্ষমতা অ্যান্টিলজিকের মাধ্যমে। সে অনুমানে যা বলে তাই হয়। লেখকের ইন্টেনশন অনুযায়ী হিমুর এই ক্ষমতা প্রকৃতি প্রদত্ত। কিন্তু আসলেও কি তাই?

হ্যাঁ, লেখক সবসময় সরাসরি না বললেও এটা স্পষ্ট যে, হিমু প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়ালের নাম। হিমুর বাবা চেয়েছিলেন তার ছেলে মহাপুরুষ হবে। কিন্তু হিমু কী চেয়েছিল?

সে প্রশ্নের উত্তর লেখক খুব সূক্ষ্মভাবে এড়িয়ে গেছেন।

হিমু রিমান্ডে বইয়ের প্রাথমিক অংশ

রিমান্ড খুবই সংক্রামক একটি শব্দ, শুনলে যে কারও ভয়ের উদ্রেক হয়। কিন্তু হিমু কি ভয় পায়? না! হিমু রিমান্ডে বইটির শুরুটা পড়লে আপনি বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন — হিমু সবকিছুতেই মজা খোঁজে। এমনকি ভয়ংকর রিমান্ডেও।

হিমু রিমান্ডে বইটিতে একজন পুলিশ হিমুকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকেন। জিজ্ঞাসাবাদে হিমুর নাম জানতে চাওয়া হয়। ভালো নাম হিমালয় জেনে পুলিশটি বলেন, হিমালয়ের আগেপিছে কিছু আছে।

হিমু জানায়, হিমালয় এমন এক বস্তু যার আগেপিছে কিছু থাকে না।

পুলিশের নাম কবীর। রিমান্ড বলতে হিমু যত ভয়ংকর ব্যাপার শুনে এসেছে বাস্তবে তার কাছে তেমন মনে হচ্ছে না। ইন্টারোগেশন রুমে জানালা আছে, কোয়েল পাখি থেকে শুরু করে বড়ো মাঝারি ধরনের পাখির ডিম রাখা আছে, সময়মত তা কাজে লাগানো হবে। কোথা থেকে ফুলের সুবাসও আসছে।

অবশ্য সেটা কবীরের পরনে থাকা শার্টের পারফিউমের ঘ্রাণও হতে পারে। কবীর হাফ হাতা শার্ট পরায় তার হাতঘড়ি দেখা যাচ্ছে। মানুষ হাতঘড়ি বামহাতে পরলেও কবীর পরেছে ডানহাতে। এরকম কেন সেটা জানার জন্য হিমুর কিঞ্চিৎ কৌতূহল হলো।

তার মনে হলো তার জায়গায় মিসির আলি সাহেব থাকলে রহস্য বের করে ফেলতেন।

» আরও পড়ুন: গভীর রাতের নোটিফিকেশন — হাসির গল্প

হিমুকে কেন ধরা হয়েছে?

হিমু রিমান্ডে বইয়ে হিমুকে কেন ধরা হয়েছে — এটা বইয়ের এক অনন্য টুইস্ট। হিমু নিজেও জানে না তার অপরাধ কী। সে জেল থেকে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পালাতে পারে কি? সেটা বলব না!

বইয়ে হিমু অনেক অভিযানের মুখোমুখি হয়।

কখনও রাস্তার এক কুকুরের সাথে গড়ে ওঠে তার সখ্যতা। কুকুরটার প্রসঙ্গ একটি বিশেষ কারণে উঠে এসেছে। হিমুর খালু বিপদে পড়ে হিমুকে দিয়ে একটা কাজ আদায় করে নেন। যে কাজের মূল আয়না মজিদ। কে এই আয়না মজিদ? হিমু কি তাকে চিনে?

কাজ শেষে হিমুকে খুব অপমান করে চলে যেতে বলা হয়। হিমু চলে যায়। তখনই কুকুরটি হিমুর প্রস্থানে প্রতিশোধ নিতে পাকড়াও করে হিমুর খালুর বাড়ির সবাইকে। প্রত্যেকে ছাদে এসে জড়ো হয়। ঘটনা এতদূর গড়ায় যে, হেলিকপ্টার পর্যন্ত উড়ে আসে ছাদের ওপর।

আয়না মজিদ চরিত্র

চলন্ত গাড়ির কাঁচ ভেঙে ফেলায় মজিদের নাম হয়ে যায় আয়না মজিদ। সে একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। তবে হিমুর সাথে আয়না মজিদের প্রসঙ্গের যোগসূত্র কোথায়?

হিমু আয়না মজিদকে সত্যিই চিনে না।

আর আয়না মজিদও তাকে চিনে না। কিন্তু প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে হিমু রিমান্ডে বইটিতে দুজনের প্রাসঙ্গিক অবস্থা বোঝা যায়। আর এটাই বইটির মূল টুইস্ট, যা এখানে উল্লেখ করছি না।

আয়না মজিদ চরিত্রটি ভয়ংকর হলেও বেশ মজার। রাস্তার এক দায়িত্বশীল পুলিশ সাধারণ এক পাবলিককে রাস্তা পার করিয়ে দিতেই পাবলিকটি জানায় সে আয়না মজিদ। আর তাকে সেসময় ধরিয়ে দিতে পারলে লোভনীয় পুরস্কার ঘোষণাও হয়েছিল।

পুলিশ উত্তেজনায় একসময় লক্ষ্য করে আয়না মজিদ ভীড়ের মাঝে হারিয়ে গেছে। আর হিমু? হিমু আয়না মজিদ সম্পর্কে এসব ঘটনা পত্র পত্রিকা পড়ে জেনেছিল।

আয়না মজিদ সাধারণ কেউ না।

আবার তার চরিত্রে কিছু ইতিবাচক গুণও ছিল — তা হলো বই পড়া। হিমুকে একদিন আয়না মজিদ ফোনে ডেকে জানায়, আজই তোমার সাথে আমার শেষ দেখা।

কিন্তু উপন্যাসের শেষে হিমু রিমান্ডে বইয়ে হিমু তার হিমুগিরি দেখিয়ে দেয় খুব ভালোভাবেই। পড়ে মনে হবে হেরে গেছে আয়না মজিদ।

» আরও পড়ুন: তোমার নামে সন্ধ্যা নামে — বই রিভিউ

বইটি কাদের জন্য?

হিমু রিমান্ডে সম্পূর্ণ বিনোদন ভিত্তিক একটি বই। যারা হিমুকে শুধু দর্শনের লক্ষ্যে পড়তে পছন্দ করেন, তাদেরকে বইটি হয়তো হতাশ করবে।

কিন্তু বইটিতে বিনোদনের কমতি নেই। হিমুর হঠাৎ রিমান্ডে যাওয়া, কবীর সাহেবের স্ত্রীর সাথে হিমুর সাক্ষাৎ, কুকুরের ট্র‍্যাজেডি আর বিখ্যাত সন্ত্রাসী আয়না মজিদ — সবই আপনাকে বইটি এক নিঃশ্বাসে শেষ করতে বাধ্য করবে। বিনোদন হিসেবে যেকোনো বয়সের মানুষ বইটি পড়তে পারেন।

হিমু রিমান্ডে উপন্যাসে হিমুর প্রাণ চঞ্চলতা আর মজার সব কান্ড আপনাকে হাসাবে, হিমু হঠাৎ মানুষকে বিভ্রান্ত করে আপনাকে চমকেও দিবে। যেমনটি করেছিল আয়না মজিদের সাথে।

যারা নতুন নতুন হুমায়ূন আহমেদ এর উপন্যাস পড়ছেন, তাদের জন্য হাইলি রিকমেন্ডেড একটি বই। কিন্তু প্রেমের উপন্যাস যদি পড়তে চান তাহলে জানিয়ে রাখি এখানে হিমুর বান্ধবী রূপা সম্পূর্ণই অনুপস্থিত।

বইটি আমার কেন ভালো লেগেছে?

হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্যকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, সেখানে সহজভাবে সাহিত্যকে উপভোগ করা যেকোনো ধরনের পাঠকের পক্ষেই সম্ভব। হিমু রিমান্ডে বইটি আমি প্রথম পড়ি যখন ক্লাস নাইন অথবা টেনের ছাত্র তখন।

বইয়ে হিমুর কর্মকান্ডে না হেসে থাকতে পারিনি। আর হিমুর অন্যান্য অভিযান ভিত্তিক বই যেমন, ‘হলুদ হিমু কালো র‍্যাব’, ‘হিমুর নীল জোছনা’, ‘তোমাদের এই নগরে’ বইগুলোর থেকেও হিমু রিমান্ডে বইটিতে তাকে অনেক বেশি মজার মনে হয়েছে।

বইয়ের বিশেষ চরিত্র আয়না মজিদ ছিল বইয়ের আরও একটি সারপ্রাইজ। হিমুর সাথে তার টক্কর যেন চলছিলই। আয়না মজিদ এত সিরিয়াস সন্ত্রাসী হয়েও হিমুকে বুঝতে পারেনি। শেষমেশ তাই সিদ্ধান্ত নিলো হিমুকে সে মেরে ফেলবে।

হিমু তার অ্যান্টিলজিক দিয়ে বেশ কিছু চমকও উপহার দিয়েছে বইয়ে।

» আরও পড়ুন: অভিমান নিয়ে ৫টি কবিতা

হিমু রিমান্ডে বইয়ের বিশেষ উক্তি

বইটির শেষ প্রান্তে এসে আমরা দেখি হিমু আর আয়না মজিদ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আরও আছে আয়না মজিদের ডানহাত লম্বু খোকন ও হিমুর কুকুরটি। হিমু সেসময় মজিদকে একটা বিশেষ কথা বলে, যা বইয়ের বিশেষ কোটেশন বা উক্তি হিসেবে অভিহিত হবার মতো।

বইটির শেষ প্রান্তে হিমু জানায় যে, দু’ধরনের রিমান্ড আছে — পুলিশের রিমান্ড আর প্রকৃতির রিমান্ড। পুলিশের রিমান্ড থেকে পালানো গেলেও প্রকৃতির রিমান্ড থেকে পালানো যায় না। আয়না মজিদ প্রকৃতির রিমান্ডে পড়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে হিমুর প্রতি আমার ভালো লাগা কৈশোর থেকেই।

আর হিমুর প্রতিটি বইয়েই সে খুবই স্বতন্ত্র। তার ভেতরের সত্তা মানুষকে চমকে দেয়, হাসায় আবার ভাবায়ও। যার দরুন হিমু সকলের অগোচরেই হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় চরিত্র। হিমু তাই নিঃসন্দেহেই একটি শক্তিশালী চরিত্র।

উপসংহার

পুলিশের ইন্টারোগেশন থেকে হিমু রিমান্ডে বইয়ের শুরু। তারপর হিমুর পালানোর চেষ্টা, পুলিশের বাড়িতে আশ্রয়, আয়না মজিদ রহস্য — সবকিছুই হিমু রিমান্ডে উপন্যাসকে যেন জীবন্ত করে রেখেছে। হিমু রিমান্ডে যথেষ্ট বিনোদন ভিত্তিক একটি বই।

যে বইটি পড়ে আপনি না হেসে পারবেন না। একইসাথে রোমাঞ্চিত বোধও হবে। বইটি সত্যিকার অর্থেই দারুণ!


প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও বই রিভিউ পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top