গভীর রাতের নোটিফিকেশন — হাসির গল্প

গভীর রাতের নোটিফিকেশন — হাসির গল্প

গভীর রাতের নোটিফিকেশন — হাসির গল্প। এটি একটি রম্য রচিত বাংলা হাসির গল্প, লিখেছেন বাপ্পী মাহমুদ। নতুন হাসির গল্প হিসেবে গল্পটি আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে। চলুন, শুরু করা যাক!

গভীর রাতের নোটিফিকেশন | বাপ্পী মাহমুদ

এক.

আমি খুবই শান্ত একটা ছেলে। সবসময় চুপচাপ থাকি, কারও সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না। কিন্তু ফেসবুকে আমার প্রায় আড়াই হাজার ফলোয়ার। এত ফলোয়ার থাকার পরও আমি বিষণ্ণ।

কারণ এই ফলোয়ারগুলো আমার ফেসবুক পোস্টে কখনোই রিএক্ট কমেন্ট করে না।

আমি মন খারাপ করি। তবু চেষ্টা থামে না। ফেসবুকে অনবরত পোস্ট দিতেই থাকি, দিতেই থাকি। কারও তাতে কোনো মাথাব্যথা নেই। একদিন নিজের একটা ছবি পোস্ট করলাম — ক্যাপশনে অভিমান করে লিখলাম — সবাই ভুলে গেছে আমায়।

সেই ছবিতে একজন কমেন্ট করলো, আপনাকে কেউ মনে রাখলে তো ভুলে যাবে। রাগে দুঃখে সেদিন পোস্টটাই দিলাম ডিলিট করে। পরে মনে পড়ল কমেন্ট ডিলিট করলেই যথেষ্ট ছিল, পোস্ট ডিলিটের প্রয়োজন ছিল না। তাছাড়া ছবিতে মোটামুটি ভালোই রিএক্ট এসেছিল — গুণে গুণে পনেরোটা রিএক্ট।

আমি জানি, আড়াই হাজার ফলোয়ার নিয়ে পনেরোটা রিএক্ট গর্ব করার মতো না। কিন্তু সত্যি বলতে এটাই আমার সর্বোচ্চ রিএক্ট পাওয়া পোস্ট ছিল।

দুই.

ইদানীং ফেসবুকে বেশিই সময় দিচ্ছি। অফিসে বসেও ফেসবুক চালাই। অফিসে আমার পোস্ট সিনিয়র এক্সিকিউটিভ গ্রাফিক ডিজাইনার। ফেসবুকিং করতে করতে কম্পিউটারে ডিজাইন করাটা কষ্টসাধ্য। প্রায়ই ডিজাইন থেকে ফোকাস নড়ে যায়।

আমার তাতে মাথাব্যথা নেই।

ফেসবুকে আমি ফেমাস হতে চাই। যে করেই হোক, ফেসবুকে ফেমাস হতে হবে আমায়। অফিসে বসে নিজের একটা ছবি পোস্ট করলাম। আর তখনই অ্যাসিস্ট্যান্ট আর্ট ডিরেক্টর এসে আমার কাজগুলো চেক করতে থাকলেন।

আমি তো ভয়ে ঘেমেই গেলাম। তিনি বললেন, “কাজ করতে করতে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করছেন দেখলাম। রঙে আছেন ভালোই!”
আমি অল্প হাসার চেষ্টা করে ভয়ে ভয়ে বলি, “সরি স্যার।”

তিনি আরও কিছুক্ষণ আমার কাজ দেখে বললেন, “শোনেন, এখন পর্যন্ত যত টেম্পলেট ডিজাইন করছেন সব মুছেন। নতুন কিছু এলিমেন্টস দিচ্ছি, ওগুলো নিয়ে আবার টেম্পলেট বানান। আর কাস্টম আইকন, ফন্টস ব্যবহার করেন। আপনি কমন আইকন, ফন্টস বারবার ব্যবহার করছেন কেন?”

আমি শুকনো মুখে সব শুনে গেলাম। এতক্ষণ ধরে সাজানো ডিজাইন মুছতে হবে শুনে কান্না পাচ্ছিল, কান্না চেপে আবার কম্পিউটারে বসলাম। তখনই মোবাইলে টুং করে নোটিফিকেশন বাজলো — মোবাইলটা সাথে সাথেই হাতে নিলাম। আর সেসময় চোখ গেল অ্যাসিস্ট্যান্ট আর্ট ডিরেক্টরের দিকে।

তিনি আমাকে তাকাতে দেখে হাসলেন। আমিও হাসি ফেরত দিয়ে ফোন যেখানে ছিল রেখে দিলাম। এদিকে কাজের প্রেশার সামলাতে সামলাতে বিকেল গড়িয়ে গেল।

» আরও পড়ুন: তোমার নামে সন্ধ্যা নামে — বই রিভিউ

তিন.

অফিস থেকে বের হতে হতে রাত আটটা বাজলো।

অতিরিক্ত গরম পড়ছে, গরম হাওয়া বইছে চারিদিক। এসময় বাস ছাউনিতে বসে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। গরমে বাসে করে যেতে হবে ভেবে আরও ঘেমে যাচ্ছিলাম।

বাস আসতেও দেরি হচ্ছে। মোবাইলটা বার করলাম। নতুন কোনো নোটিফিকেশন আসেনি, ফটোতে একটা মাত্র রিএক্ট — তাও আবার হাহা! কারণ কী?

কমেন্টবক্সে গিয়ে প্রশ্নের উত্তর পেলাম। একজন মেয়ে কমেন্ট করেছে — এত ঘাম নিয়ে ছবি তুলেছেন কেন? অফিসে এসি নেই?

আমি উদাস মনে কমেন্টের রিপ্লাই দিলাম, এসি নষ্ট হয়ে গেছে।

আর তার পর পরই দু’বার নোটিফিকেশনের টুংটাং আওয়াজ পেলাম। ঢুকে দেখি আমার কমেন্টের রিপ্লাইটিতে দুইটা হাহা রিএক্ট পড়েছে। রাগে দুঃখে আমি প্রায় অন্ধ হয়ে গেলাম — ফটোতে রিএক্ট একটা। অথচ ফটোর কমেন্টের রিপ্লাইয়ে রিএক্ট দুইটা। What a shame!

তখনই বাস এলো। আমি বাসে উঠে বসে ফেসবুক স্ক্রল ডাউন করছি। দেখে দেখে কয়টা মিউচুয়াল আইডিতে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট দিলাম।

চার.

বাসায় এসে বড্ড ক্লান্ত লাগছিল। কেমন ঘুম ঘুম পাচ্ছে, ভাবলাম খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু খাওয়ার পর আর ঘুম আসে না। এদিকে রাত বেড়েই চলেছে।

আমি বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসলাম।

একটা সিগারেট ধরানো যেতে পারে। সারাদিনের ব্যস্ততায় একটাও সিগারেট টানিনি ভেবে নিকোটিনের প্রতি স্পৃহা বেড়ে গেল। আমি সিগারেট ধরালাম।

গভীর রাতে সিগারেট ধরিয়েছি — ফেসবুকে এখন এটা লিখে পোস্ট দিতে ইচ্ছে করছে। পোস্ট কি দেব? হয়তো গভীর রাতের নোটিফিকেশন পেয়ে মনটা ভালো হয়ে যাবে।

আমি লিখলাম — দিনের শেষে সিগারেট ধরিয়েছি। শান্তি! পোস্ট দেবার এক মিনিটও হয়নি গভীর রাতের নোটিফিকেশন এলো। আমি দ্রুত নোটিফিকেশন খুলে দেখলাম। গভীর রাতের নোটিফিকেশন — উত্তেজনায় আমার হাত কাঁপলো।

কিন্তু একী? এটা কেমন নোটিফিকেশন এসেছে?

আমার মুখের চামড়া গভীর রাতের নোটিফিকেশন দেখে শক্ত হয়ে গেল। আমি বিরক্ত চোখে নোটিফিকেশনের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার প্রচন্ড রাগ হচ্ছে!

» আরও পড়ুন: অভিমান নিয়ে ৫টি কবিতা

পাঁচ.

রাগ হবে না কেন? গভীর রাতের নোটিফিকেশন হওয়া উচিত গভীর ভালো লাগার। তা নয়, নোটিফিকেশন এসেছে — একজন আমায় তার প্রোফাইলে ট্যাগ করেছে।

আমি দ্রুত তাকে আনফ্রেন্ড করব বলে ঠিক করলাম।

নোটিফিকেশনে ক্লিক করে তার প্রোফাইলে গেলাম। আর তখনই আমার ইচ্ছা বদলে গেল — এ যে একটা ললনার আইডি! দেখতে কী সুন্দর! আমার মন দ্রবীভূত হয়ে গেল।

আমি আনফ্রেন্ড করার বদলে তাকে ইনবক্স করব বলে ভাবলাম। কিন্তু এখন অনেক রাত। তাই পোক দিলাম। ফেসবুকের পোক অপশন বহুদিন ধরেই দেখছি, কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার আজ জানলাম।

আমার মন ভালো হয়ে গেল।

কিন্তু মেয়েটি পোক ব্যাক দিলো না। আমি তবু অপেক্ষায় রইলাম। অপেক্ষা করতে করতে মেঘ না চাইতে জলের মতো ইনবক্সে মেসেজ এলো। আমি দ্রুত মেসেজ খুললাম, দেখি — মেয়েটিই মেসেজ করেছে। লিখেছে — পোকে নয়, ট্যাগেই প্রকৃত সুখ।

কথাটা কেমন চেনা চেনা লাগলো। ভাবতেই মনে পড়ল — ছোটবেলার ভাব-সম্প্রসারণ — ‘ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ’।

ছয়.

মেয়েটি নিজে থেকে মেসেজ দেবে তা কে জানতো। আমি খুশিতে খুশিতে তার ইনবক্সে লিখি, “আপনি দেখতে অনেক সুন্দর!”
মেয়েটি লিখল, “এক্সকিউজ মি!”
আমি আবার লিখি, “জি, অনেক সুন্দর আপনি দেখতে!”
সে আবার লিখল, “এক্সকিউজ মি!”

এবার আমি এলোমেলো বোধ করলাম।

গভীর রাতের নোটিফিকেশন থেকে কোথায় রোমাঞ্চকর মুহূর্ত ঘটবে, তা হলো না। আমি হতাশ হয়ে আর কী লেখা যায় ভাবছি, তখন সে লিখল, “আপনি কি ট্যাগ করায় রাগ করেছেন?”
“জি না,” আমি আবার খুশি হলাম, “আপনি মেসেজ দেয়ায় সব রাগ পানি হয়ে গেছে।”
“কেন?”
“আপনি দেখতে অনেক কিউট, তাই!”
“বারবার আমার চেহারার প্রশংসা করবেন না তো, প্রোফাইল পিকচারের পিকটা আমার নয়।”
“তবে কার?”
“সেলিব্রেটির। শবনম ফারিয়া।”

আমি হতাশ হয়ে গেলাম। তবু জানতে ইচ্ছে হল, মেয়েটি প্রকৃতপক্ষে রূপবতী কিনা। কিন্তু তা কি আর সরাসরি জিজ্ঞেস করা যায়? তাও ইনিয়ে বিনিয়ে লিখলাম, “আপনি বোধহয় শবনম ফারিয়ার মতোই দেখতে, তাই তার ফটো দিয়েছেন।”
(নো রিপ্লাই)

আমি আবার লিখলাম, “আপনি কি রাগ হলেন?”
(নো রিপ্লাই)

আমি হতাশ হলাম। তখনই সে লিখলো, “আপনি বেশি ফ্লার্ট করেন।”
“তাই?”
“জ্বী। বেশি ফ্লার্ট করা লোক আমার পছন্দ না!”

» আরও পড়ুন: বদলে যাবার দিনে — মুক্তগদ্য

সাত.

মেয়েটির নাম — আফরোজা খান। কিন্তু আইডির নাম স্পার্ক্লিং অ্যাঞ্জেল। আমার তার সাথে আজকাল বেশিই কথা হয়। সেদিন গভীর রাতের নোটিফিকেশন পাবার পর থেকেই আজ প্রায় এক সপ্তাহ হলো আমরা ইনবক্সে কথা বলি।

বেশি কথা বলায় অফিসে আমার কাজে গতি আরও কমে যাচ্ছে।

তবে তাতে কী? আফরোজা আমাকে অনেক পছন্দ করে — এটা আমি বুঝে গেছি। আমি তাকে অনেক আদর করে অ্যাঞ্জেল ডাকি। কিন্তু তার একটাই কথা — সে ফেসবুকে ফেমাস ছেলেদের পছন্দ করে।

আমার মাথায় তাই ভূত চাপলো — ফেমাস হবার। আর আমি জানি ফেমাস হতে হলে ফেসবুকে ফেমাস লোকেদের অ্যাড দিতে হয়। আমি ইতিমধ্যেই প্রায় একশো জনকে অ্যাড দিয়েছি। কিন্তু তেমন কেউই অ্যাক্সেপ্ট করেনি।

এরইমধ্যে একজন সেলিব্রেটির পোস্ট এলো র‍্যান্ডমলি নিউজফিডে। কেন জানি তার পোস্টটা পড়লাম। আর সেখানে লেখা ছিল অনেক কথা। যার সারাংশ হলো — তার পুরনো আইডিতে দশ হাজার ফ্রেন্ডস ফলোয়ার ছিল। আইডিটা নষ্ট হবার পর একই নামে তিনি আইডি খুলেছেন। অনেকেই তাকে ইনবক্সে জিজ্ঞেস করছে, ভাই কি আমায় আনফ্রেন্ড করে দিছেন?

লোকটি সবাইকে বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত এটা তার নতুন আইডি। তাই তিনি পোস্ট দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিলেন ব্যাপারটা।

আমার মাথায় তখন দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। আমিও তার ইনবক্সে গিয়ে লিখলাম, ভাই কি আমায় আনফ্রেন্ড করে দিছেন?
তিনি ‘না’ বলে আমায় নিজ থেকেই ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট দিলেন। আমি দ্রুত অ্যাক্সেপ্ট করে নিলাম। আর ভাবলাম — এরকম একজন সেলিব্রেটি আমার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকলে আমার ফেমাস হওয়া আটকায় কে?

আট.

সেদিনও গভীর রাত। আফরোজার সাথে অনেক কথা হচ্ছে। এদিকে আমার প্রোফাইলেও মোটামুটি রিচ পেতে শুরু করেছে। আমি এখন প্রায় সেলিব্রেটি। গতদিন একটা ফটো আপলোড দিয়েছি — তাতে একশো রিএক্ট পড়েছে।

আমার খুশি আর ঠেকায় কে?

কিন্তু এতকিছুর পরও আফরোজাকে পাওয়া হলো না। কেন বলছি এ কথা? Well, let me explain.

আমি আফরোজাকে সেদিন রাতে মেসেজ দিলাম। লিখলাম, “তোমায় ভীষণ দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে।”
“তাই?” আফরোজা অবাক, “হঠাৎ দেখতে চাও কেন?”
আমি নিজের মনের কথা বলার ভঙ্গিতে বলি, “হয়তো তোমায় পছন্দ করি।”
“Good!” আফরোজা লিখল, “ফ্লার্ট যারা একদমই করে না তাদের থাপড়িয়ে দাঁত ফেলে দিই!”

হতভম্ব আমি বুঝতে পারলাম না সে প্রশংসা করলো নাকি রাগ করলো। তবু লিখলাম, “প্লিজ!”
“ওয়েট, একটু পরই ছবি দিচ্ছি।”

আমি খুশি হলাম। উত্তেজনায় হাতের তালু ঘেমে গেল। আর তারপরই মেসেজ টোন বাজলো মেসেঞ্জারে। দ্রুত মেসেজ খুলে দেখলাম — কিন্তু একী!

এটা যে একটা মাঝবয়সী মহিলার ছবি।

আমি লিখলাম, “এটা কে? তোমার মা?”
“বোকা নাকি? এটা আমি!”

আমার তখন আর রিপ্লাই দেবার মানসিক শক্তি ছিল না। আর আমার ওই মানসিক ধাক্কার মুহূর্তেই আবারও গভীর রাতের নোটিফিকেশন বেজে উঠল। নোটিফিকেশন খুলে দেখি — সেখানে আফরোজা আমার সাথে রিলেশনশিপের স্ট্যাটাস দিয়েছে।

আর আমি? আমি তখনো জানি না গভীর রাতের নোটিফিকেশন অনুযায়ী ভালোবাসার গল্পটা কতটুকু গভীর ছিল!


গল্প: গভীর রাতের নোটিফিকেশন

লেখা: বাপ্পী মাহমুদ 

প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও গল্প পড়তে শব্দশৈলী পোর্টালফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।

Share This:

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top