জীবন মানে হলো অর্থপূর্ণ কিছু রঙের সমষ্টি। আমাদের চারপাশে তাই অনেক জীবন নিয়ে উক্তি আছে। আমরা জীবনকে যখনই অর্থপূর্ণ করে তুলি, তখনই জীবন আমাদের কাছে প্রকাশিত হয়ে ওঠে।
জীবন নিয়ে উক্তি প্রবন্ধে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিদের জীবনের প্রতি মনোভাব ও চিন্তা তুলে ধরা হবে। মূল লেখায় আশা করছি আপনাদের জীবনের প্রতি বিশেষ টান অনুভূত হবে।
চলুন, জীবন নিয়ে উক্তি প্রবন্ধটি শুরু করা যাক।
জীবন নিয়ে উক্তি ও পর্যালোচনা — প্রবন্ধ
জীবন নিয়ে উক্তি শুরু করবার আগে একটা ছোটো প্রাসঙ্গিক গল্প বলি। রাসেল নামের এক তরুণ ভীষণ তাড়াহুড়া করে কমলাপুর রেলস্টেশনে হাজির হলো। কিন্তু প্ল্যাটফর্মে অনেক লোকের ভিড়।
রাসেল ভেবে পায় না, এত ভিড়ে সে টিকিট কীভাবে কাটবে।
সে কিছুক্ষণ চেষ্টা করে টিকিট কাটার, তারপর হাল ছেড়ে দেয়। কী ভাবছেন? রাসেল টিকিট না কেটে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে? না, মোটেও সেরকম নয়। বরং তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি এলো — টিকিট না কেটেই ট্রেনে উঠবার।
রাসেল টিকিট না কেটে ট্রেনে উঠতে যাবে, তখনই কোথা থেকে এক বৃদ্ধ এসে বলেন, “বাবা, তুমি টিকিট ছাড়া ট্রেনে উঠছো কেন?”
রাসেল হকচকিয়ে যায়। সে বলে, “আপনি কেন আমায় এ প্রশ্নটি করলেন?”
বৃদ্ধ একটা গভীর শ্বাস নিলেন। আর বললেন, “জীবনটা ট্রেনের মতো। টিকিট ছাড়া ওঠা যায়। কিন্তু টিকিটের হিসাব একটা সময় দিতেই হয়।”
রাসেল তখন বাধ্য হয়ে টিকিট কাটে। আর তারপর বৃদ্ধকে কোথাও খুঁজে পায় না। সে বুঝতে পারে — সততা হলো জীবন নামক ট্রেনের টিকিট, যেটা ছাড়া গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না।
জীবনকে উপভোগ করতে নিজের কাজকে ভালোবাসুন
“যদি সারাজীবনের জন্য সুখী হতে চাও, তবে নিজের আপন কাজকে ভালোবাসো”
— বিল গেটস
জীবন নিয়ে বিশেষ ব্যক্তিদের বিশেষ উপলব্ধি বিদ্যমান। তেমনি বিল গেটসেরও একটি বিশেষ উপলব্ধি হলো আপন কাজকে ভালোবাসা।
বিল গেটস তার জীবনবোধ অনুযায়ী ছোটোবেলা থেকেই তার আপন কাজকে ভালোবেসে গেছেন। তিনি যখন স্কুলে পড়তেন, তখন থেকেই গড়ে ওঠে কম্পিউটারের সাথে সখ্যতা। তিনি কম্পিউটারে বিশেষ দক্ষতায় পারদর্শী হয়ে পরবর্তীতে মাইক্রোসফট কোম্পানি আবিষ্কার করেন।
» আরও পড়ুন: হিমু রিমান্ডে — বই রিভিউ
বিল গেটসের জীবন নিয়ে উক্তি পর্যালোচনা
জীবন নিয়ে উক্তি দেবার ক্ষেত্রে বিল গেটসের আপন কাজকে ভালোবাসার উপলব্ধিটা সত্যিই অসাধারণ। তিনি তার জীবনবোধ থেকেই এই উক্তিটি দিয়েছেন।
কাজের প্রতি তার ছিল অপরিসীম কৌতূহল।
তিনি তার কাজের দৃষ্টিকোণ থেকে এতটাই নিবেদিত ছিলেন যে, ছোটোবেলায় স্কুলের কম্পিউটারে গভীরভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন। মাইক্রোসফটের কাজে তিনি বিশেষ পারদর্শীতা দেখিয়েছেন। তিনি যে সত্যিই নিজের আপন কাজের মধ্যে জীবনকে খুঁজে পেতেন, তার প্রমাণ হলো — একটা সময় তিনিই ছিলেন বিশ্বের সর্বোচ্চ ধনী ব্যক্তি।
বিল গেটস বিশ্বের সবচেয়ে ধনী হলেও তার জীবনবোধ অনুযায়ী তিনি অতিরঞ্জিত কিছুই সচরাচর পছন্দ করেন না। জীবনকে উপভোগ করতে তিনি সর্বদায় সচেষ্ট। তাই আজ জীবনের এ পর্যায়ে এসেও তিনি প্রচুর বই পড়েন। তার চোখে জ্ঞান আহরণ জীবনের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া।
জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সবসময় চলতে হবে
“জীবন হলো সাইকেল চালানোর মতো, ভারসাম্য বজায় রাখতে তোমাকে শুধু চলতে হবে”
— আলবার্ট আইনস্টাইন
আলবার্ট আইনস্টাইনকে বিশ্বের সবচেয়ে বুদ্ধিমান বলে মনে করেন অনেকে। তিনি বিজ্ঞানী হিসেবে সফল হলেও তার ভেতরেও ছিল জীবন দর্শন। জীবনকে নিয়ে তিনি অনেক কিছুই উপলব্ধি করেছেন। এমনকি তিনি জীবনবোধ থেকে বলেছেন, ‘জ্ঞানের থেকে কল্পনা বড়ো’।
আইনস্টাইন তার জীবনকে চিন্তাশীলতার মাঝে সমর্পণ করে দিয়েছিলেন। তিনি জটিল সব বৈজ্ঞানিক চিন্তা করতে পছন্দ করতেন, যা তাকে বিশ্বের কাছে সমাদরে পৌঁছে দিয়েছে।
আইনস্টাইন জানতেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ। আর তিনি জীবনবোধকে এগিয়ে রাখতে জ্ঞানের থেকে কল্পনাকে বেশি প্রশ্রয় দিতেন। তার মতে বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ জ্ঞান নয়, কল্পনা।
» আরও পড়ুন: গভীর রাতের নোটিফিকেশন — হাসির গল্প
আইনস্টাইনের জীবন নিয়ে উক্তি পর্যালোচনা
জীবন সবসময় একরকম থাকে না। এটা কখনো কঠিন তো কখনো সহজ। তবে কঠিন সময়ে ঘাবড়ে যাওয়া যাবে না, আর সহজ সময়েও অলস হওয়া যাবে না।
বরং কঠিন ও সহজ উভয় সময়েই একটু হলেও চলতে হবে। যাতে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়। যারা জীবনে চলার পথে থেমে যায়, তারাই ব্যর্থতার শিকার হয়।
তাই জীবনের পথে চলতে ধৈর্য্য ও অধ্যবসায় জরুরি। সাইকেল চালানোর মতোই জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজন ধৈর্য্য ও অধ্যবসায়। জীবনের রাস্তা সব সময় সমান হয় না। কখনো উঁচু, কখনো নিচু থাকে।
জীবনের এই জার্নির অসম যাত্রাকে মেনে নিয়ে প্রস্তুতি রাখা জরুরি। সময়মতো ঝুঁকি নেওয়া জরুরি।
জীবন হলো চকলেটের বাক্সের মতো
“জীবন হলো চকলেটের বাক্সের মতো। বাক্স খোলা না অবধি তুমি জানো না ভেতরে কী আছে”
— ফরেস্ট গাম্প
যদিও ফরেস্ট গাম্প একটি কাল্পনিক চরিত্র। তবে ফরেস্ট গাম্প মুভির শুরুতে তার এই কথাটি ছিল মনোমূগ্ধকর। ফরেস্ট গাম্প এই কথায় পুরো জীবনের সারাংশ তুলে ধরেছেন। একটা চকলেটের বাক্স বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ মনে হয়।
কিন্তু বাক্সের ভেতর মিষ্টি স্বাদের চকলেট আমাদের মোহিত করে, এটা আমরা বাক্স না খুললে বুঝতে পারি না। জীবনটাও তাই। জীবনের পথে যাত্রা না করলে আমরা বুঝি না, আরও কত চমক রয়েছে।
» আরও পড়ুন: তোমার নামে সন্ধ্যা নামে — বই রিভিউ
ফরেস্ট গাম্পের জীবন নিয়ে উক্তি পর্যালোচনা
চকলেটের বাক্সের ভেতর যেমন ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের চকলেট থাকে, জীবনটাও তেমনি সময়ের পরিক্রমায় ভিন্নধর্মী হয়ে ওঠে। জীবনে অনিশ্চয়তা থাকবেই। তবে অনিশ্চয়তাই চকলেটের মতো জীবনের সবচেয়ে বড়ো চমক।
তাই জীবনে নতুন অভিজ্ঞতাকে ভয় নয়, বরং সুচিন্তার মাধ্যমে গ্রহণ করলেই জীবন সহজ হয়ে ওঠে। প্রত্যাশার বাইরেও জীবন সুন্দর হতে পারে। অপ্রত্যাশিত সবকিছুই অসুন্দর নয়। আবার প্রত্যাশিত সবকিছুই জীবনে সুন্দর নয়।
এগুলো বিবেচনা করলেই জীবনের গভীরতা বোঝা সম্ভব।
স্বপ্ন সেটাই যেটা তোমাকে ঘুমুতে দেয় না
“স্বপ্ন সেটা নয় যেটা তুমি ঘুমিয়ে দেখো। স্বপ্ন সেটাই যেটা তোমাকে ঘুমুতে দেয় না”
— এপিজে আব্দুল কালাম
জীবনে স্বপ্ন দেখাটা জরুরি বিষয়। আপনি কতখানি জীবনবোধকে এগিয়ে রাখেন তার প্রমাণ আপনার স্বপ্ন। একটা নির্ধারিত লক্ষ্যের পথে ছুটে চলায় হলো আপনার স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ।
যারা জীবনে উন্নতি করতে চায়, তারাই স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন গড়েও।
» আরও পড়ুন: অভিমান নিয়ে ৫টি কবিতা
এপিজে আব্দুল কালামের জীবন নিয়ে উক্তি পর্যালোচনা
বাস্তবে যে চিন্তা আপনার লক্ষ্যকে সবার আগে রাখে, সেটিই আপনার স্বপ্ন। এটি কল্পনা নয়, বরং লক্ষ্য পূরণ করবার পথে এক নির্ধারিত সত্য। যারা স্বপ্ন দেখে তারাই কিছু না কিছু কাজ করতে থাকে। কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া মানুষ জীবন থেকে কখনোই পিছিয়ে পড়ে না।
আর জীবন নিয়ে উক্তি তারাই দেয়, যারা স্বপ্ন পূরণ করেছে। লক্ষ্যকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। তাই আমাদের উচিত জীবনের সঠিক লক্ষ্যটাকে খুঁজে বের করা।
যে লক্ষ্য আমাদের সঠিক পথ বলে দেবে। আমাদের জীবনের অর্থকে সংজ্ঞায়িত করবে। তাই জীবনে স্বপ্ন দেখাটা অপরিহার্য।
উপসংহার
জীবনকে নিয়ে গুণী ব্যক্তিদের বিশেষ বিশেষ মতাদর্শ ও জীবনবোধ রয়েছে। জীবন নিয়ে উক্তি ও পর্যালোচনার মাধ্যমে তারা জীবনকে আমাদের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন। জীবনে অনিশ্চয়তা থাকে, পাশাপাশি থাকে স্বপ্নও।
আমাদের বুঝতে হবে — জীবনের অনিশ্চয়তার মাঝেও রয়েছে সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্যকে যারা উপলব্ধি করতে পেরেছে তারাই জীবনে এগিয়ে গেছে।
প্রিয় পাঠক, নিয়মিত এই ধরনের আরও প্রবন্ধ পড়তে শব্দশৈলী পোর্টাল ও ফেসবুক পেজে চোখ রাখুন। ধন্যবাদ।



